আউট অফ কেও কেম দি কসমস! বিশৃঙ্খলা হইতে, আদর্শ ভাঙিয়া যাইবার বেদনা হইতেই প্রকৃত সাহিত্য উঠিয়া আসে। অপূর্ণতার যন্ত্রণাই সমস্ত শিল্পের মূল কথা। সংসারে সবকিছু ঠিকঠাক চলিলে কে আর ছবি আঁকিয়া বা গান গাহিয়া ফাঁকটুকু পূরণ করিবার চেষ্টা করিত?
সারারাত জাগিয়া কাজল লিখিতে লাগিল।
১৪. বারান্দায় রোদ্দুরে বসিয়া
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
শীতের সকাল। বারান্দায় রোদ্দুরে বসিয়া কাজল খবরের কাগজ পড়িতেছে, এমন সময় হাসিমুখে নন্দলাল আসিয়া উপস্থিত হইল।
–এসো নন্দলাল। ভালো আছ? সত্যিই এলে তাহলে?
নন্দলালের সাজ একই। পরনে খাটো ধুতি, খালি গায়ের উপর নামাবলী জড়ানো, পায়ে সস্তা দামের চটি, হাতে পূজার উপকরণসহ পিতলের সাজিখানি। বারান্দার নিচে চটি ছাড়িয়া সে উপরে উঠিল এবং নিষেধ না শুনিয়া কাজলের পায়ের ধুলা লইল।
-তারপর খবর কী বলে?
নন্দলাল আকর্ণ হাসিয়া বলিল—আমাদের আর খবর কী থাকবে দাদা? ওই কেটে যাচ্ছে একরকম। সত্য খুব বাড়িয়েছে, বুঝলেন? বাবার সেই সেবাদাসী! গত জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন বাবা ডেকে বলল—নন্দ, আজ পুজোর দিনটা তুই বাড়িতেই খাবি। ইদানীং আর বাড়িতে খাই না, জানেন তো? তা খেতে খেতে দুটো ভাত চেয়েছি, সত্য বলল—আর ভাত নেই। তখনও আমার অর্ধেক খাওয়া হয়নি। বললুম—মানুষকে খেতে বললে একটু বেশি করেও তো চাল নিতে হয়। উত্তরে সৎমা কী বললে জানেন? বললে—তোমার ওই হাতির খোরাক জোগানো সম্ভব নয়। আরও চাল নিলে আরও চাল সেঁদিয়ে যেত। শুনে কেমন যেন রাগ হয়ে গেল, বললুম—আমার বাবার বাড়িতে বসে আমি ভাত খাচ্ছি, তুমি ফোপরদালালি করবার কে? তাতে সৎমা তেড়ে এসে লোহাব খুন্তি দিয়ে—এই দেখুন না, সামনের দাঁতের আধখানা ভেঙে গিয়েছে
কথা শেষ করিয়া নন্দ আবার হাসিল। হাসিটা তাহার স্বভাব। মনের বিষাদ বা হর্ষের সহিত ইহার কোনো সম্পর্ক নাই।
কাজল বলিল—বোসোনন্দ, মাকে তোমার কথা বলে আসি। দুপুবে আমার এখানেই খেযে যাবে, কেমন?
—জানি দাদা এই কথা বলবেন—সেজন্যেই তো সকাল সকাল এলুম। আপনাদের রান্না হয়ে গেলে অসুবিধে হত। কিছু জলখাবার হবে কী দাদা?
কাজল হাসিয়া বলিল–পরোটা আর কুমড়োর তরকারি চলবে?
-খুব, খুব! তবে দু-খানা বেশি করে বলবেন। আমরা গাঁয়ের মানুষ, বুঝলেন তো?
হৈমন্তী বরাবরই লোকজনকে খাওয়াইতে ভালোবাসে। নন্দলালের অন্নলোপ সারল্য, অর্থহীন আকর্ণ হাসি এবং অগোছালো চালচলন তাহার মাতৃত্বের কাছে গভীর আবেদন লইয়া উপস্থিত হইল। ভিতরের বারান্দায় আসন পাতিয়া হৈমন্তী নন্দলালকে যত্ন করিয়া জলখাবার খাওয়াইল। নন্দলালও সেই যত্নের উপযুক্ত মর্যাদা দিতে কুণ্ঠা প্রকাশ করিল না। তরকারি সহযোগে বাবোখানি বড়োবড়ো পরোটা খাইয়া ফেলিবার পর হৈমন্তীর প্রশ্নের উত্তরে সে বলিল—আরও দেবেন মা? আচ্ছা আপনি বলছেন যখন দিন গোটাচারেক, তবে তার বেশি নয়—সকালে একগাদা খেয়ে পেট ভরিয়ে ফেলা কোনো কাজের কথা না। তরকারি আর দেবেন না, বরং গুড় যদি থাকে–
সামান্য জলযোগ করিয়া নন্দলাল বাহিরের বারান্দায় রৌদ্রে পিঠ দিয়া বিশ্রাম করিতে গেল।
হৈমন্তী কাজলকে ডাকিয়া বলিল—হারে, লোকটা দুপুরে খাবে তো বললি এখনই ও যোলোখানা পরোটা খেল, আবার দুপুরে যেতে পারবে?
বুঝাইয়া বলিতে গেলে অনেক কথা বলিতে হয়। কাজল সংক্ষেপে বলিল–পারবে।
–পেট-টেট খারাপ করবে না তো?
কাজল হাসিয়া বলিল—কিচ্ছু হবে না মা, তুমি ওকে চেনো না–
বাস্তবিকই দুপুরে খাইবার সময় নন্দলাল ভেলকি দেখাইল। মাত্র ঘণ্টাদুই আগে খাওয়া যোলোখানি পরোটা সে জঠরের কোন দুর্গম গহনে পাচার করিল কে জানে! প্রথমদিকে হিং দেওয়া কলাইয়ের ডাল, পালংশাকের চচ্চড়ি আর পোস্তর বড়া দিয়া সে দুই থালা ভাত খাইয়া ফেলিল। কালোজিরা-কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়া ট্যাংরা মাছের ঝোল হইয়াছিল। মাছের ঝোল দিয়া আরও দুই থালা ভাত। মুখে পরিতৃপ্তির ছাপ লইয়া সে উঠিতেছিল, হৈমন্তী তাহাকে বলিল—একটু দুধ খাবে? ভালো পাটালি গুড় আছে, তাই দিয়ে খাও—
নন্দলাল আবার বসিয়া পড়িল। বলিল—দুধের মধ্যে অমনি দুটো ভাতও ফেলে দেবেন মা, শুধু দুধ যেন কেমন লাগে–
সন্ধ্যাবেলা যখন ঘরের ভিতর অন্ধকার ঘনাইয়া উঠিল, তখনও বারান্দার বেঞ্চির উপর শুইয়া নন্দলাল নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতেছে। সাড়ে-ছয়টা নাগাদ সে ঘুম ভাঙিয়া উঠিয়া অপ্রতিভমুখে বলিল—এঃ, বড্ড অন্ধকার হয়ে গেল। ডেকে দিলেন না কেন দাদা?
–তাই কী ডাকা যায়? একটা মানুষ ঘুমোচ্ছে—তুমি বরং আজকের রাতটা আমার এখানে থেকেই যাও, কেমন?
মাথা চুলকাইয়া নন্দলাল বলিল—আজ্ঞে তা যখন বলছেন—এত রাত্তিরে যাওয়াটাও–
-এবেলা মাংস খাবে নন্দ?
উৎসাহে নন্দলাল যেন কেমন হইয়া গেল। বলিল–মাংস? নিশ্চয়। আপনি খেলে আমিও একটু-মাংস খেতে আমি খুবই–বাবা প্রায়ই আনতেন। মধ্যে অনেকদিন—ওই সৎমা, বুঝলেন না?
মাংস কিনিতে হইলে চৌমাথার মোড়ের বাজারে যাইতে হয়। নন্দও কাজলের সঙ্গী হইল, ফিরিবার সময় তাহার বারণ না শুনিয়া বাজারের থলি বহিয়া দিল। বাড়ি ঢুকিবার সময় চুপিচুপি বলিল–দাদা, একটা কথা বলবো?
—কী?
—আপনারা কী রাত্তিরে রুটি খান? শহরের দিকে সবাই তাই খায়—
–কেন বলো তো? তুমি কী বুটি খাও না?
–খাবো না কেন দাদ? আমার এখন যা অবস্থা, সবই খাওয়া অভ্যেস করতে হয়েছে। তবে কী জানেন, রুটি জিনিসটা ঠিক পোষায় না। মাকে বলে দেবেন দুটো ভাত করতে?
