একদিন টিফিন পিরিয়ডে লাইব্রেরি ঘরে ছোকরা টিচারদের আড্ডা জমিয়া উঠিয়াছে। দপ্তরী কেশব ঘরের কোণে স্টোভ জ্বালিয়া চা বানাইয়া দুইটি বিস্কুটসহ সকলকে দিতেছে। মাঝে মাঝে দুএকজন ছাত্র আসিয়া কাজলের নিকট হইতে খাতা ফেরত লইয়া যাইতেছে। এমন সময় প্রেীঢ় ইতিহাসের শিক্ষক রামনাথবাবু দরজার কাছে দাঁড়াইয়া ভিতরে উঁকি দিলেন। ছোকরারা একটু সন্ত্রস্ত হইয়া গুঞ্জন বন্ধ করিল, যাহারা ধুমপান করিতেছিল তাহারা সিগারেট লুকাইয়া ফেলিল। বিশ্বেশ্বর ভট্টচার্য বলিল—কিছু বলবেন নাকি রামনাথদা? আসুন ভেতরে আসুন
-না, তোমরা বসো। এ ঘরে টিফিনের সময় আজ কদিন ধরে ছাত্ররা খুব যাতায়াত করছে, তাই দেখতে এলাম কী ব্যাপার–
উত্তরে কেহ কিছু বলিল না। রামনাথবাবু আর একবার দৃষ্টিপাত করিয়া চলিয়া গেলেন।
পরদিন থার্ড পিরিয়ড অফ থাকায় কাজল বসিয়া ক্লাস নাইনে হোম-টাস্কের খাতা দেখিতেছে, রামনাথবাবু আবার আসিলেন।
-কী হে, অমিতাভ, কী করছো?
কাজল দাঁড়াইয়া বলিল—আসুন রামদা। এই একটু খাতা দেখছি আর কি–
-খাতা? কিসের খাতা? প্রাইভেট টিউশনির?
–আজ্ঞে না। উঁচু ক্লাসগুলোয় একটু স্পেশাল কোচিং দেবার চেষ্টা করি, যাতে রেজাল্টটা— এবার ইয়ারলি পরীক্ষার অবস্থা দেখেছেন তো?
রামনাথবাবু কোনো কথা না বলিয়া কিছুক্ষণ টেবিলের উপর স্তুপীকৃত খাতার দিকে তাকাইয়া থাকিলেন, তারপর বলিলেন–বাঃ, বেশ ভালো! নিজের সময় নষ্ট করে ছেলেদের উপকার এসব আজকাল আর দেখা যায় না—
—না দাদা, আসলে নিজের চর্চাটাও থাকে, ছাত্রদেরও কাজ এগোয়—
—ভালোই তো। চালিয়ে যাও। একটা মহৎ দৃষ্টান্ত–
রামনাথবাবু চলিয়া গেলেন বটে, কিন্তু কাজলের আর কাজে মন বসিল না। পরপর দুইদিন ভদ্রলোকের আসাটা কেমন যেন সন্দেহজনক। এমনিতে সিনিয়র টিচাররা লাইব্রেরি ঘরে বড়ো একটা আসেন না। ব্যাপার কী?
ব্যাপার কয়েকদিন বাদেই পরিষ্কার হইয়া গেল।
ফিফথ পিরিয়ডে কাজল আর রমাপদ দুইজনেরই একসঙ্গে অফ পড়িয়াছে। কাজল খুসিডিডিস-এর পেলোপনেশিয়ান ওয়ার পড়িতেছিল, রমাপদ একটা সিগারেট ধরাইয়া উমুখে ধোয়া হাড়িয়া বলিল–বই রাখুন, আপনার সঙ্গে একটা কথা আছে। নিন একটা সিগারেট ধরান আগে
সিগারেট ধরাইয়া কাজল বলিল—কী কথা?
–রামনাথদা কাল দুপুরে এসেছিলেন এ ঘরে?
-হ্যাঁ, কেন বলো তো?
—আপনি তখন কী করছিলেন?
ছাত্রদের হোম-টাঙ্কের খাতা দেখছিলাম। কেন, কী হয়েছে তাতে?
রমাপদ ধোয়ার রিং করিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিতে করিতে বলিল—হয়েছে অনেক কিছু। রামনাথদা সবাইকে বলে বেড়াচ্ছেন এটা প্রকৃতপক্ষে প্রাইভেট টিউশনি জোগাড় করার জন্য আপনার একটা কায়দা–
কাজল স্তম্ভিত হইয়া গেল। তাহার কোন সৎ প্রচেষ্টার যে এইরূপ ব্যাখ্যা হইতে পারে তাহা সে আদৌ ভাবে নাই। সে বলিল—কী বলছো তুমি? রামনাথদা এই কথা রটাচ্ছেন? প্রাইভেট টিউশনি আমি চেষ্টা করলে তো এখুনি দশটা নিতে পারি কত ছেলে আমার বাড়ি গিয়ে সাধাসাধি করে। কিন্তু আমার সময় কোথায় বলো তো? টিউশনি করতে গেলে আমার লেখাপড়ার সময় আর থাকে না। সেজন্যই তো স্কুলে বসে অফ পিরিয়ডে ছেলেদের খাতা দেখি–
রমাপদ বলিল—আমার কাছে আপনার সাফাই গাইতে হবে না, আমি তো জানি আপনি কী ধরনের লোক। ভুলটা আপনিই করেছেন অমিতাভদা–
—কী রকম?
—এসব ছাত্রকল্যাণমূলক কাজকর্ম শুরু করে ভালো কবেন নি। বাইরে থেকে শিক্ষকতা বেশ একটা মহৎ ব্রত বলে মনে হয়, এব ভেতরে যে কত ঈর্ষা আর গোলমাল রয়েছে তা আপনি জানেন না। স্কুলের প্রায় কেউই আপনার এই কাজ ভালো চোখে দেখছে না–
কাজল জিজ্ঞাসা করিল–কালিদাসবাবুও?
জিভ কাটিয়া রমাপদ বলিল—উনি বাদে। কালিদাসবাবু অন্যরকম লোক—
কাজল জিজ্ঞাসা করিল—এ নিয়ে রামনাথদার সঙ্গে একবার কথা বলব নাকি? উনি যদি ভুল বুঝে থাকেন, সেটা ভেঙে দেওয়াও তো উচিত।
-পাগল নাকি? আপনি নিজে কিছুই শোনেননি, রামদা প্রথমেই জিজ্ঞাসা করবেন একথা আপনাকে কে বলেছে? উনি যাদেব বলেছেন তারাও কেউ আপনার কাছে স্বীকার করবে না। মাঝ থেকে আপনি ফেঁসে যাবেন। তাছাড়া রামদা মোটেই ভুল বোঝেন নি, রাগে উনি অমন বলছেন—
—রাগ কিসের?
-বলা কঠিন। নিজের যে কাজ করা উচিত অথচ করতে পারছি না, অন্যে তা করছে—এটা থেকে অকারণ রাগ আসতে পারে। প্রফেশনাল জেলাসি হতে পারে
কাজল আশ্চর্য হইয়া বলিল—কী রকম?
—আপনি বিনাপয়সায় এরকম পরোপকার করে বেড়ালে ওঁদের টিউশনি কমে যাবে। অন্তত ওঁরা ছাত্রদের কাছে হেয় হবেন। যে কাজ ওঁরা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে করে থাকেন, সেটা আপনি বিনাপয়সায় করে দিলে ছাত্রদের কাছে ওঁদের দর কমে যাবে
বাহিরের জগৎটা সম্পর্কে কাজলের ধারণা বাবার বই পড়িয়া গড়িয়া উঠিয়াছিল। পৃথিবীর মানুষ মোটর উপর সবাই ভালো, বিশ্বসৃষ্টির ভিতর দিয়া প্রবাহিত একটা শুভাক্তি সমাজ-সংসারকে চালিত করিতেছে—এই বিশ্বাস তাহাকে এতদিন নানা বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও আশাবদী রাখিয়াছিল। আজ প্রথম সেই বিশ্বাসটায় বোরকমের ধাক্কা খাইল।
কিন্তু অনেক রাতে নিজের ঘরে বিছানায় শুইয়া হথর্নের স্কারলেট লেটার পড়িতে পড়িতে তাহার হতাশার বোধটা কাটিয়া গেল। নতুন অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়াই জীবনের প্রকৃত ভিত্তি স্থাপিত হয়। মানিয়া লইতে যতই কষ্ট হউক, তবু বাস্তবকে স্বীকার করিতেই হইবে।
কত রাত এখন? বারোটা? একটা? গত পাঁচ-ছয়দিন সে কিছু লেখে নাই, উপন্যাসখানি কিছুদূর অগ্রসর হইয়া থামিয়া রহিয়াছে। আচ্ছা, আজ বাকি রাতটুকু সে যদি না ঘুমাইয়া শুধু লেখে?
