টেবিলের উপর হইতে একটা মোটা খাতা লইয়া কালিদাসবাবু তাহাতে যথাস্থানে কাজলের নাম লিখিলেন, তাহার পর খাতাটা তাহার হাতে দিয়া বলিলেন—নে, সই কর—
কাজল নির্দিষ্ট খোপে জীবনে প্রথম চাকুরির হাজিরাজ্ঞাপক সই দিল।
-বোস না, দাঁড়িয়ে রইলি কেন?
ছাত্রজীবনে এই ঘরে বিভিন্ন কারণে অজস্রবার আসিতে হইয়াছে এবং শিক্ষকদের সামনে তটস্থ হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিতে হইয়াছে, কেহ বসিতে বলেন নাই। সেই মজ্জাগত অভ্যাস ও মনোভাব অকস্মাৎ ত্যাগ করা কঠিন। সে লজ্জিত গলায় সংকুচিত হইয়া বলিল—ঠিক আছে স্যার, আমি কেশ আছি–
কালিদাসবাবু হাসিয়া বলিলেন–বুঝেছি। আচ্ছা তুই এক কাজ কর, লাইব্রেরি ঘরে চলে যা। ছোকরা টিচাররা ওই ঘরটায় বসার ব্যবস্থা করেছে—তুইও যা। প্রেয়ারের ঘণ্টা পড়লে এসে প্রেয়ারে যোগ দিবি। তারপর দেখি তোকে কী ক্লাস দেওয়া যায়–
লাইব্রেরির জন্য নির্দিষ্ট ঘরটি বিশেষ বড়ো নহে। চারিদিকের দেওয়াল ঘেঁষিয়া কয়েকটি কাঁচের পাল্লা লাগানো আলমারি। মাঝখানে একটি লম্বা টেবিল, তাহার দুইদিকে দুইটি বেঞ্চি এবং এদিক ওদিক ছড়ানো কয়েকটি চেয়ার। আলমারিগুলিতে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শনশাস্ত্রের বেশ কিছু ভালো বই রহিয়াছে, কিন্তু সেগুলি পারতপক্ষে ছাত্রদের পড়িতে দেওয়ার কোন ব্যবস্থা নাই। ছাত্ররাও যে সকলেই বিশ্বসাহিত্য পড়িবার জন্য ভয়ানক উৎসাহী এমন নয়, তবু দুই-একজন ছেলে বই পড়িতে চাহিলে লাইব্রেরির ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক শিবলালবাবু দেশলাইয়ের কাঠি দিয়া অর্ধনিমীলিত চোখে কান খোঁচাইতে খোঁচাইতে উদাস গলায় বলেন–বই পড়বি? কিনে পড়গে যা—এসব দামি বিলিতি বই, হাতে হাতে বেশি ঘুরলে নোংরা হয়ে যাবে–
অত্যুৎসাহী কেহ বলে–নোংরা হবে না স্যার, মলাট দিয়ে পড়ব—
–তাই? বাঃ, ভালো কথা। বেশ, হেডমাস্টারমশাইকে বলে দেখ—
হেডমাস্টার! কী সর্বনাশ! সাধ করিয়া কে আত্মহত্যা করে?
কাজল গিয়া বসিতে বসিতেই একজন অল্পবয়েসী শিক্ষক ঘরে ঢুকিল। কাজলকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল–আপনি কী কাউকে খুঁজছেন?
-না, আমি—মানে আজ থেকে কালিদাসবাবু বললেন এখানে বসতে–
দশমিনিটের মধ্যেই দুইজনের পরিচয় বেশ গাঢ় হইয়া গেল। ছেলেটির নাম রমাপদ, বছর দেড়েক হইল বি.এ. পাশ করিয়া এখানে পড়াইতেছে। বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার কী একটা গ্রামে। একলা একটি ছোট ঘর ভাড়া করিয়া থাকে ও নিজে রান্না করিয়া খায়। সাহিত্যে বেশ উৎসাহ। কাজলের নাম শুনিয়াই সে বলিল—ও আপনি অপূর্ব রায়ের ছেলে, না? আপনি নিজেও তো লেখেন? আপনার লেখা আমি পড়েছি
এমন সময়ে প্রার্থনার ঘণ্টা পড়িল। রমাপদ বলিল–চলুন, প্রেয়ারে যাওয়া যাক। পরে জমিয়ে গল্প করা যাবে। আপনি কী কোনো ক্লাস পেয়েছেন?
না এখনও কালিদাসবাবু কিছু বলেন নি-–
–বেশ, যতক্ষণ হাল্কা থাকবেন ততক্ষণই ভালো। চলুন—
প্লেয়ারের পর সকল শিক্ষকেরাই টিচার্স রুমে আসিলেন। কালিদাসবাবু বলিলেন—অমিতাভ, তুমি সেভেন বি-র খাতাটা নিয়ে ক্লাসে যাও, ওটা দুলালবাবুর বাংলা গদ্যের রাস—তিনি এখনও আসেন নি। তারপর দেখি আর কী দেওয়া যায়–
শিক্ষকজীবন শুরু হইয়া গেল।
ইংরাজ শাসকের উদ্দেশ্য সফল হইল। স্বাধীনতা আসিয়া পড়িল বটে, কিন্তু দেশের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক অসন্তোষের আগুন জ্বলিয়া উঠিল। কাজল প্রথমে ব্যাপারটার গুরুত্ব ঠিকঠাক উপলব্ধি করিতে পারে নাই। খবরের কাগজে কলিকাতার নানা সংবাদ প্রকাশিত হইতেছিল বটে, কিন্তু সেই বিবরণ নিতান্তই গুটিকয়েক অক্ষরের সমষ্টি মাত্র। পৃথিবী এত সুন্দর, জীবন এত মধুর–এখানে খারাপ কিছু ঘটিতে পারে না। মানুষ কখনও মানুষের প্রতি এতটা নির্মম হইতে পারে না।
অথচ সে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ দেখিয়াছে, হিরোশিমার তাণ্ডব দেখিয়াছে, জার্মান কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদীদের উপর আইখম্যানের অমানবিক অত্যাচারের কথা সে জানে। মানুষের মানবিকতার উপর এই বিশ্বাস নিষ্ঠুর বাস্তবকে ভুলিয়া থাকিবার জন্য তাহার মনের একটা কারসাজি মাত্র। মানুষ সব মিলাইয়া মোটের উপর ভালোই, কারণ তাহার সভ্যতা অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করিয়াও আজ এত হাজার বছর টিকিয়া আছে। কিন্তু তাহারই মধ্যে মাঝে মাঝে এক-একটা উন্মত্ততার যুগ আসে, পৃথিবীব্যাপী অশান্তির অন্ধকার ঘনাইয়া আসে। কাজলের কেমন মনে হয়, আসলে দুই পক্ষের মানুষগুলি কেহই খারাপ নহে, অদৃশ্য এক তৃতীয়পক্ষ নিজেদের কূট স্বার্থ বজায় রাখিবার জন্য দুইজনকে লড়াইয়া দিয়াছে।
নানাবিধ গোলযোগের মধ্যে দেশ স্বাধীন হইল। স্বাধীনতা আনিতে যে রক্তপাতের প্রয়োজন হয় নাই, নিরর্থক ভ্রাতৃবিরোধে সেই রক্ত দেশের মাটিতে ঝরিয়া পড়িল। তবু তো এখন দেশ স্বাধীন। জাতীয় জীবনে নতুন একটা উদ্দীপনার জোয়ার আসিয়াছে। কেবল প্রভাত একদিন মির্জাপুর স্ট্রীটে তাহাদের পরিচিত চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে দিতে কাজলকে বলিল–স্বাধীন হয়ে সবাই খুব খুশি, কিন্তু ইট ইজ টু আর্লি টু রিজয়েস–
বিস্মিত কাজল জিজ্ঞাসা করিল—কেন?
-এতদিন সবকিছু অসুবিধের জন্য আমরা ইংরেজকে দায়ী করে এসেছি। এবার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের ঘাড়ে—সামনে অনেক সমস্যা অমিতাভ, সেখানে ব্যর্থ হলে কাকে দায়ী করব? এবারই আসল পরীক্ষা শুরু হল—
কাজল রাজনীতি বোঝে না, কিন্তু প্রভাতের কথাগুলি তাহার যথার্থ বলিয়া মনে হইল।
১২. এ বছর ঘোর বর্ষা নামিয়াছিল
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
