নিজের পাশের জন্য হরির লুটের নিমন্ত্রণ করিতে কাজলের লজ্জা করিতেছিল। কিন্তু মায়ের আগ্রহে পাড়াসুদ্ধ লোককে বলিয়া আসিতে হইল। সন্দেশ কিনিয়া বাড়ি ফিরিয়া দেখিল মা তখনও বসে নাই, সাধারণ শাড়ি ছাড়িয়া গরদের কাপড় পরিয়াছে এবং খাটের বাজু ধরিয়া দাঁড়াইয়া আছে। হৈমন্তীর মুখ দেখিয়া মনে হয়, ব্যথার জন্য তাহার দাঁড়াইতে বেশ কষ্ট হইতেছে। মায়ের জন্য কাজলের হঠাৎ খুব মমতা হইল। ঠাকুরমার ঝুলি হইতে আধুনিক সামাজিক উপন্যাস পর্যন্ত সর্বত্র সত্মায়ের যে রক্তশীতলকারী চিত্র আঁকা হইয়াছে, ইহার সহিত সে বিভীষিকার কোনই মিল নাই। পাষণ্ড লেখকগুলিকে ডাকিয়া তাহার মাকে দেখানো উচিত।
দিন-দুই বাদে একদিন পথে স্কুলের মাস্টারমশাই কালিদাসবাবুর সঙ্গে দেখা হইয়া গেল। ইনি সেকালের গ্র্যাজুয়েট, ইংরাজি হইতে বিজ্ঞান পর্যন্ত সব বিষয়েই প্রয়োজন হইলে ক্লাস লইতেন। শোনা যায় পিরিয়ড কামাই যাইতেছিল বলিয়া একবার ড্রইংয়ের ক্লাসেও বক আঁকিয়া কাজ চালাইয়া দিয়াছিলেন। শিক্ষকতাকে যাঁহারা বৃত্তি না ভাবিয়া ব্রত হিসাবে লইয়াছিলেন, সেই বিবল মানুষদের ইনি একজন শেষ প্রতিভূ। এই টাইপটাই ধীরে ধীরে শেষ হইয়া আসিতেছে। ক্লাসে কালিদাসবাবু যে কেবলমাত্র পাঠ্যবিষয় পড়াইতেন তাহা নয়, মুখে মুখে ইতিহাসের গল্প শোনাইতেন, মহাপুরুষদের জীবনের কাহিনী বলিতেন। ইহাতেই শেষ নয়, ছুটির পর উৎসাহী কিছু ছাত্রকে স্কুলের পিছনের মাঠে লইয়া গিয়া কুস্তির পঁাচ শিখাইতেন। জামা ও গেঞ্জি খুলিয়া ঘাসের উপর রাখিয়া মালকোচা মারিয়া নিজে ছাত্রদের সঙ্গে কুস্তি লড়িতেন। কাজলও উৎসাহে পড়িয়া কিছুদিন এই দলে ভিড়িয়াছিল। সে একবার কালিদাসবাবুকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল—স্যার, আপনি জুজুৎসু জানেন, না? আমরা শিখতে চাই–
কালিদাসবাবু হাসিয়া বলিয়াছিলেন-বাপু হে, ভারতীয় কুস্তির রীতিতে এমন অনেক প্যাঁচ আছে যার কাছে জাপানী জুজুৎসু লাগে না। আগে সেগুলো শেখো, তারপর জুজুৎসুর কথা ভাবা যাবে।
কাজল পায়ের ধূলা লইয়া প্রণাম করিয়া বলিল—ভালো আছেন স্যার?
—কে? অমিতাভ নাকি? অনেকদিন তোকে দেখি না–কী পড়ছিস এখন?
–আমি এবার এম.এ. পাশ করলাম স্যার, এই কদিন আগে রেজাল্ট বেরিয়েছে—
–বাঃ, খুব আনন্দের কথা। কী সাবজেকট যেন ছিল–ইংরিজি না?
–হ্যাঁ স্যার।
–কী করবি ভাবছিস এখন?
কাজল বলিল—কিছু ঠিক করিনি স্যার। এই তো সবে ফল বেরুল–
কালিদাসবাবু বলিলেন—তুই তো আজকাল কাগজে গন-টন লিখছিস। তোর দুটো গল্প আমি পড়েছি। বেশ ভালো লেখা। তোর লেখা নিয় মাস্টারমশাইদের মধ্যে আলোচনা হয়—
কাজলের খুব আনন্দ হইল। ছোটবেলায় যে শিক্ষকদের কাছে পড়িয়াছে তাহারা তাহার লেখা পড়িয়া আলোচনা করিয়াছেন! মানুষের অহং তৃপ্ত হইবার মতো ব্যাপার বটে!
দিনদুয়েক বাদে সন্ধ্যাবেলা কাজল নিজের ঘরে বসিয়া লিভিংস্টোনের জীবনী পড়িতেছে, এমন সময়ে খট্ খট্ করিয়া বাহিরের দরজার কড়া নড়িয়া উঠিল। দরজা খুলিয়া সে দেখিল কালিদাসবাবু দাঁড়াইয়া আছেন। সে অবাকও হইল, খুশিও হইল। সে যখন স্কুলের ছাত্র, তখনও মাস্টারমশাই কোনোদিন তাহাদের বাড়ি আসেন নাই। এই প্রথম।
ঘরে আসিয়া কালিদাসবাবু খাটের এককোণে বসিলেন, উপুড় করিয়া রাখা বইটা হাতে লইয়া বলিলেন–এই বইটা পড়ছিলি বুঝি? লিভিংস্টোনের জীবনী? খুব ভালো, বই পড়ার অভ্যেস মানুষকে মহং করে, মনটাকে বড় করে। দেখবি যারা বই পড়তে ভালোবাসে তারা কখনও ছোটাখাটো নীচতা করতে পারে না।
কাজল মাকে ডাকিয়া মাস্টারমশাইয়ের সহিত পরিচয় করাইয়া দিল। তিনি হাসিয়া বলিলেন—আলাপ হয়ে ভালোই হল বৌঠান, আপনার কাছ থেকে একটা অনুমতি নেবার আছে। সত্যি বলতে কী, সেজন্যেই আজ এসেছি। অমিতাভ তো এবাব এম.এ. পাশ করেছে, বর্তমানে কোন কাজও করছে না। ওকে আমি আমাদের স্কুলে শিক্ষক হিসেবে নিয়ে যেতে চাই। আপনার কোন আপত্তি হবে না তো?
কাজল শুনিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল, খুব আনন্দও হইল। স্কুলের মাস্টারমশাইদের শ্রদ্ধা করিতে হয়, দেখা হইলেই প্রণাম কবিতে হয় নিজেরও যে কোনদিন সেই শ্রেণিভুক্ত হওয়া সম্ভব তাহা যেন ঠিকঠাক বিশ্বাস হয় না।
কালিদাসবাবু কাজলকে বলিলেন—তোর যদি অসুবিধে না থাকে তাহলে এই সোমবার থেকেই কাজ শুরু কর। পৌনে এগারোটার ভেতর স্কুলে আসবি।অবশ্য প্রথম দিন সাড়ে দশটায় যাওয়াই ভালো। এখন তোকে স্কেল দিতে পারব না। থাউকে কিছু টাকা ধরে দেবো, কাবণ স্কুলে এখন কোনো পোস্ট খালি নেই, তোকে বাড়তি হিসেবে নিচ্ছি। আট-দশমাস পরে মণীন্দ্রবাবু রিটায়ার করবেন, সেই জায়গায় তোকে পাকাপাকিভাবে নিয়ে নেব
হৈমন্তী জলখাবারের ব্যবস্থা করিতে গেলে কালিদাসবাবু অনেক কথা বলিলেন। স্কুলে এখন কোন হেডমাস্টার নাই, সবচেয়ে সিনিয়ার টিচার হিসাবে তিনিই কাজকর্ম দেখিতেছেন। শিক্ষকদের মধ্যে নানাবুপ দলাদলি শুরু হইয়াছে। ভালোভাবে ইংবাজি পড়াইবাব মতো কেহ নাই। বয়স্ক শিক্ষক রাখিলে এ অবস্থায় উন্নতি ঘটানো যাইবে না। তরুণ এবং আদর্শবাদী শিক্ষক, যাহার ভিতর উৎসাহ ও স্বপ্ন এখনও মরিয়া যায় নাই, স্কুলকে বাঁচাইতে হইলে এখন তেমন একজনকে প্রয়োজন। কাজলের এইসব গুণ আছে বলিয়া তিনি মনে করেন।
প্রথমদিন স্কুলে যাইবার জন্য রওনা হইয়া কাজলের মনে হইল রাস্তায় যত লোক সবাই তাহার দিকে হাঁ করিয়া তাকাইয়া আছে, সবাই যেন ধরিয়া ফেলিয়াছে সে স্কুলে ছাত্র পড়াইতে যাইতেছে। দশটা পনেরোতেই সে পৌঁছাইয়া গেল। এগারোটা হইতে ক্লাস শুরু, একমাত্র কালিদাসবাবু টিচার্স রুমে খাতাপত্র লইয়া কী যেন করিতেছেন, অন্য কেহই এখনও আসে নাই। কাজলকে দেখিয়া তিনি বলিলেন—এই যে অমিতাভ, এসে গিয়েছিস দেখছি। বোস ওই চেয়ারটায়। সবাই আসতে এখনও দেরি আছে। দাঁড়া, অ্যাটেনডেনস রেজিস্ট্রারে তোর নামটা তুলে দিই, তারপর সই কর
