স্বপ্নের মধ্য দিয়া হাঁটিবার মতো কাজল নিঃশব্দ পদসঞ্চারে বাড়ির উঠানে আসিয়া দাঁড়াইল। আসন্ন সন্ধ্যার অন্ধকারে পতনোম্মুখ বাড়িটা বিস্মৃত ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের মতো দেখাইতেছে। চালে খড় প্রায় নাই, দাওয়ায় ছোট-বড়ো ইদুর অথবা সাপের গর্ত, সমস্ত উঠান জুড়িয়া আগাছার জঙ্গল। চাপাগাছে এখন ফুল নাই, এখন চাঁপাফুল ফুটিবার সময় নয়, কেবল সান্ধ্য-বাতাস বাধিয়া গাছের পাতায় ঝিরঝির শব্দ হইতেছে। গাছটা কী নিজের ভাষায় তাহাকে কিছু বলিতে চায়?
প্রথমেই একটা আলো প্রয়োজন। স্টেশন হইতে কয়েকটা মোমবাতি কিনিয়া আনা উচিত ছিল। আসলে সে জীবনে কখনও সাংসারিক বিষয়ে মাথা ঘামায় নাই, কোথাও গেলে সেখানে শয্যা, আলো, আহার এবং অন্যান্য গার্হস্থ্য সুবিধা অপেক্ষা করিয়া থাকিবে ইহাতেই সে অভ্যস্ত। আলোর ব্যবস্থা যে আবার নিজেকে সঙ্গে করিয়া আনিতে হইবে ইহা তাহার মাথায় আদৌ খেলে নাই। বস্তুত এখন মনে পড়িল, খাওয়ার ব্যবস্থাও সে কিছু করিয়া আসে নাই বটে। অবশ্য একরাত্রি না খাইলে তেমন কিছু অসুবিধা নাই, কিন্তু আলো নিতান্ত প্রয়োজন।
পাশে তেলিদের বাড়িতে সবে সন্ধ্যার প্রদীপ দেখানো হইতেছে। একজন বৃদ্ধা উঠানের তুলসীতলায় ছোট একটি পিতলের প্রদীপ জ্বালিয়া দিয়া উপুড় হইয়া প্রণাম করিতেছিল, প্রণামের শেষে সোজা হইয়া আধ-অন্ধকাবে কাজলকে দেখিয়া অবাক হইয়া বলিল–কে? কে ওখানে?
কাজল আন্দাজ করিল ইনিই কুণ্ডবাড়ির গৃহিণী, ছোটবেলায় যখন দেখিয়াছিল তখন আরও মোটাসোটা ছিলেন, বয়েস বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে চেহারা ভয়ানকভাবে ভাঙিয়া পড়িয়াছে। বয়স তো কম হইল না, তাহার বাবাকে ইনি ছোট দেখিছেন, সে বলিল—আমি-আমি কাজল–
-কাজল? কে কাজল?
-আমি—এই পাশের বাড়ির ছেলে। আমাকে ছোটবেলায় একবার আপনি দেখেছেন। আমার বাবার নাম অপূর্ব-অপু। মায়ের নাম অপর্ণা–
তেলি-গিন্নি অবাক হইয়া আগাইয়া আসিতে আসিতে বলিল—কে? বামুনঠাকরুনেব নাতি? অপুর ছেলে? তুমি হঠাৎ কোথা থেকে? এতদিন ছিলে কোথায়—এসো এসো, দাওয়ায় উঠে এসো
কাজল আধুনিক মনোবৃত্তির ছেলে, সে বৃদ্ধার পায়ে হাত দিয়া প্রণাম করিতে গেল। বৃদ্ধা পিছনে সরিয়া গিয়া বলিলেন–না না, ছিঃ! তোমরা ব্রাহ্মণ, আমাদের পুরোহিত বংশ। তোমার ঠাকুমা আমার চেয়ে বয়েসে ছোট ছিলেন, কিন্তু আমি তাকে চিরদিন পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে এসেছি। আহা, তোমার মা-ঠাকুমা বড়োই অল্প বয়েসে–
তেলিগিন্নি তাহাকে যথেষ্ট আদর করিলেন, গ্রামে আর ভদ্রলোক নাই সে বিষয়ে বিস্তর দুঃখ করিলেন, কিছু ধানী জমি দান করিলে কাজল তাহার বর্তমান মাকে লইয়া আবার মনসাপোতায় আসিয়া বাস করিতে রাজি আছে কিনা সে কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। তাহার বাবা যখন ছোটবেলায় এই গ্রামে বাস করিত, সেই সময় ও বর্তমান সময়ে যে অনেক পার্থক্য তাহা বলিয়া সে এই সরল ও স্নেহময়ী বৃদ্ধার মনে আঘাত দিতে চাহিল না। বিশেষ করিয়া সে জানে একদিন তেলি-গিন্নির দয়ার দানের উপর নির্ভর করিয়াই তাহাদের সংসার চলিত, আজ একটু সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছিয়া তাহাকে অসম্মান করা যায় না। সে বলিলআমি মায়ের সঙ্গে কথা বলে দেখব, দেখি ওঁর কী মত—
–তুমি কী এখন কদিন এখানে থাকবে? বাড়িঘর যে সারানোনা দরকার তা তো দেখতেই পাচ্ছো! তোমার বাবাই মারা যাবার আগে মেরামতের জন্য আমাকে শেষ যা টাকা পাঠিয়েছিল— তারপর তোমরা তো আর এদিক মাড়ালেই নাও, তোমাকে বলতে ভুল হয়ে গিয়েছে, আজকাল তোমাদের বাড়ি দেখতে মাঝে মাঝে শহর থেকে লোক আসে, জানো? অপু নাকি বড়ো হয়ে কী সব বই লিখেছে, সেই বই পড়ে তারা আসে। আমাকে কত কথা জিজ্ঞেস করে। তা তোমার বাবা কী বই লিখত? ঠাকুর-দেবতার কথা?
কাজল হাসিয়া বলিল–না ঠাকুমা, এমনি গল্পের বই। লোক আসে বাড়ি দেখতে আজকাল?
—তবে আর বলছি কী? সেদিনকার ছেলে অপু, এই তো সেদিন বইদপ্তর বগলে করে ইস্কুলে পড়তে যেত, সে নাকি আবার বই লিখে নাম করেছে। প্রায় ছুটির দিনেই লোকজন আসে
কাজল একটা হ্যারিকেন চাহিয়া লইয়া বাড়িতে ফিরিল। তেলিদের বাড়িতে জেলেপাড়ার একটি মেয়ে কাজ করে, সে গৃহিণীব নির্দেশে এরই মধ্যে আসিয়া দাওয়া ও ঘরঝট দিয়া নড়বড়ে তক্তাপোশটায় চাদর-বালিশ পাতিয়া দিয়া গিয়াছে। কাজলকে তেলি-গিন্নি বলিয়া দিয়াছে, যে কয়দিন থাকিবে তাহাদের বাড়ি দুইবেলা খাইতে। কাজেই আপাতত করিবার কিছু নাই। কাজল সুটকেস হইতে একখানি বই বাহির করিযা হ্যারিকেনের আলোয় বালিশে ভর দিয়া পড়িতে লাগিল।
তাহার একান্ত আপন মানুষেরা এই ঘরখানায় বাস করিত। রৌদ্র উঠিবার পর ঘাসের আগায় শিশিরবিন্দুর মতো তাহারা মহাকালেব নির্মম নির্দেশে কোথায় মিলাইয়া গিয়াছে। কিন্তু এই বাড়ির প্রত্যেকটি কোণে তাহাদের মমতার স্মৃতি মাখানো আছে। মায়ের কথাই বেশি করিয়া মনে আসে। ঠাকুমার সহিত নিশ্চিন্দিপুর ওতপ্রোতভাবে জড়িত, কিন্তু কেন যেন মনসাপোতার সহিত কেবলমাত্র মায়ের স্মৃতি মাখামাখি হইয়া আছে। এই ঘরে মা থাকিত, দরিদ্র ঘরের জিনিসপত্র সযত্নে গুছাইয়া রাখিত, কুলুঙ্গিতে রাখা আয়নার সামনে সাজিত, সিঁথিতে সিঁদুর দিত, বাবা কবে কলিকাতা হইতে আসিবে সেজন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করিযা থাকিত। ঘরের চারদেয়ালে আরদ্ধ পরিবেশে যেন সময় আর অগ্রসর হয় নাই, তেইশ বৎসব পূর্বের সেই দিনগুলিতেই আটকাইয়া গিয়াছে।
