কথাবার্তা উর্দু এবং ইংরেজিতে মিশাইয়া হইতেছিল, ডাক্তারের বক্তব্য বুঝিতে না পারিয়া অমরবাবুর স্ত্রী কাজলের দিকে তাকাইলেন। কাজল ব্যাখ্যা করিয়া বুঝাইয়া দিতে তিনি কাঁদিয়া ফেলিয়া ডাক্তারের দিকে তাকাইয়া বলিলেন—আপনাকে বাবা বলে ডাকছি, আমি আপনার মেয়ে। আমার স্বামী বাঁচবেন তো?
ডাক্তার বলিলেন–ভয় নেই। বেশি পরিমাণে রিচ ফুড় খাওয়ায় অ্যাসিড আর গ্যাস ফর্ম করে এমনটা হয়েছে। বমি হয়ে গেলে অনেকটা রিলিফ পাবেন। নিন এটা খাইয়ে দিন
টারটার এমেটিকের প্রভাবে অমরবাবু অবিলম্বে ঘর ভাসাইয়া বমি করিতে শুরু করিলেন। বমি করিবার আবেগে দম আটকাইয়া আসে আর কী!
অমরবাবু প্রাণপণে ডাক্তারের হাত আঁকড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন–ডাক্তারবাবু, আমার শরীরের মধ্যে কেমন করছে, আমি আর বাঁচবো না–
ডাক্তার ততোধিক জোরে তাহার হাত চাপিয়া বলিলেন—ডোন্ট ওরি, আপনার কিছু হয়নি, বমি করতে থাকুন–
সব প্রলয়েরই সমাপ্তি আছে, কিছুক্ষণ ধরিয়া অনর্গল বমি করিবার পর অমরবাবু নিশ্রুপ হইয়া পড়িলেন। ডাক্তার ব্যাগ হইতে আর একটা কী ঔষধ তাঁহাকে খাওয়াইয়া কাজলকে বলিলেন—ইনি এখন ঘুমোবেন। আর ভয় নেই, আমি সকালে আবার এসে দেখে যাব–
অমরবাবুর স্ত্রী বলিলেন–বাবা, আপনার ভিজিট–
-ও সকালে এসে একেবারে নেব–
ডাক্তার বিদায় লইলে অমরবাবুর স্ত্রী বলিলেন—ভাই, আপনি ছিলেন বলে আজ খুব রক্ষে হল। আমি গেরস্তঘরের বৌ, কোনোদিন বিদেশে বেরুই নি, তারপর এসব জায়গার ভাষা মোটে বুঝিনে। আপনি না থাকলে–
কাজল বলিল—ওসব কথা বলবেন না। আপনাকে দিদি বলে ডেকেছি ভাই তো বোনের জন্য এটুকু করবেই
-দেখুন তো দেখি কী কাণ্ড! বরাবরই ওইরকম লোভী মানুষ, খেতে ভালোবাসেন। ভালো রান্নাবান্না হলে আর খেয়াল থাকে না। অম্বল, পেটের অসুখ আর বায়ুতে কষ্ট পান-কত বলি! বয়েস হচ্ছে, এবার একটু সামলে চল—তা কে কার কথা শোনে! তবে এত বাড়াবাড়ি কখনও হয়নি।
পরদিন সকাল আটটা নাগাদ ডাক্তার নিজেই কথামত আসিয়া হাজির। অমরবাবু কিছুক্ষণ হইল উঠিয়া সমবেত পরিজনের তিরস্কার সহ্য করিতেছেন। দেখিয়া ডাক্তার বলিলেন—ফাইন! এই তো রোগী উঠে বসেছে-কী মশায়, কাল রাত্তিরে সবাইকে অমন ভয় লাগিয়ে দিয়েছিলেন কেন? আর কখনও ঠেসে রি খাবার খাবেন না! খাবার অন্যের, শরীর তো আপনার নিজের না কী? অমরবাবুর স্ত্রী কিছু টাকা কাজলের হাতে খুঁজিয়া দিয়াছিলেন, সে তাহা দিতে গেলে ডাক্তার অমরবাবুর স্ত্রীর দিকে ফিরিয়া হাসিয়া বলিলেন–না, আপনি আমাকে বাবা বলে ডেকেছেন এমনিতে এই মহল্লায় আমি অনেক বোজগার করি, জামাইয়ের চিকিৎসা করে আর টাকা নেব না।
অমরবাবু চিঁ-চিঁ করিয়া বলিলেন—আপনি আমার প্রাণদাতা, আপনার নামটা তো জানা হল–আবার কখনও দিল্লি এলে দেখা করবো
ডাক্তার বলিলেন—আমার নাম মহম্মদ ইলিয়াস আজম।
ডাক্তার বিদায় লইলে কাজল মৃদু হাসিয়া অমরবাবুকে বলিল কী দাদা, তাহলে মুসলমান মাত্রেই খাবাপ লোক নয়, কী বলেন?
অমরবাবু লজ্জিত মুখে বললেন—আমার ভুল হয়েছিল ভাই। এক জায়গায় আটকে থাকা মানুষকে বড়ো ছোট করে দেয়। এইজন্যেই তো দেশভ্রমণ প্রয়োজন।
০৯. কাজল মনসাপোতা পৌঁছিল
নবম পরিচ্ছেদ
কাজল মনসাপোতা পৌঁছিল সন্ধ্যাবেলা।
বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া সমগ্র ভারতবর্ষ ঘুরিতে ঘুরিতে একটি ভ্রাম্যমাণ দলের সঙ্গে সে অজন্তায় গিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। গুহাভ্যন্তবে অনতিউজ্জ্বল আলোকে মায়ের কোলে শিশু বুদ্ধের চিত্র দেখিতে দেখিতে হঠাৎ তাহার হারানো মায়ের জন্য মন কেমন করিয়া উঠিল। জগতে মাতৃশক্তি একটা বড়ো শক্তি। যে মাকে সে কখনও দেখে নাই, অথচ দশমাস ধরিয়া যাহার গর্ভে বাস করিয়া, যাহার শরীর হইতে পুষ্টি সংগ্রহ করিয়া তাহার দেহ পুষ্ট হইয়াছে, তাহার কথা মনে পড়িবামাত্র কাজলের সমস্ত নাড়ীতে টান ধরিল। মায়ের সহিত দেখা কবিবার আর কোনো উপায় নাই, কিন্তু মায়ের পবিত্র স্মৃতিবিজড়িত মনসাপোতায় গিয়া হাজিব হইতে পারিলে যেন মাকে সে অনেকখানি ফিরিয়া পাইবে।
অপরাহের রৌদ্র বাঁকাভাবে আসিয়া গুহার দেওয়ালে পড়িয়াছে, চারিদিকে স্তব্ধতা এবং নিবিড় প্রশান্তি। কোথায় লুকাইয়া বসিয়া কী একটা পাখি ক্রমাগত ডাকিতেছে। পাখির ডাকে সমস্ত পবিবেশ যেন করুণ উদাস হইয়া উঠিল। মানুষ সকলেই সকলের আত্মীয়, তবু মায়ের সঙ্গে শিশুর যে গভীর আত্মীয়তা তাহার সমান্তরাল কোনো সম্পর্ক আর পৃথিবীতে নাই। শৈশব হইতেই একটা বঞ্চনার অনুভূতি হৃদয়ের গভীরতম তলদেশ হইতে উঠিয়া আসিয়া মাঝে মাঝে তাহাকে কষ্ট দেয়। কী একটা জিনিস যেন তাহার পাওয়া হইল না, কী এক অমৃত আস্বাদন করিতে বাকি রহিয়া গেল। বড়ো হইয়া উঠিবার পর হইতে সে অপর্ণার জন্য তাহার মন-খারাপের কথা হৈমন্তীকে কখনও বলে নাই— বলিলে মা ভাবিতে পারে এত ভালোবাসা সত্ত্বেও ছেলে আপন হয় নাই। কিন্তু মনের ভিতরে গোপন রাখা এক জিনিস, আর ভূলিয়া যাওয়া অপর জিনিস।
তাহার ভয় ছিল সে ঠিক ঠিক পথ চিনিয়া যাইতে পারিবে কিনা, সেই কোন ছোটবেলায় বাবার সহিত একবার আসিয়াছিল। স্টেশন হইতে সে একখানা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করিল বটে, কিন্তু গ্রামে ঢুকির মুখে সেখানা ছাড়িয়া দিল এই গ্রামে সে হাঁটিয়া ঢুকিবে। জেলে-পাড়া ছাড়াইয়া পথের বাকে একটা অশ্বথ গাছ। ছোটবেলায় গাছটাকে সে এইটুকু দেখিয়া গিয়াছে, গোড়ায় কতগুলি ইট সাজাইয়া বেদিমতো করা ছিল। মেয়েরা স্নান করিয়া এক ঘটি করিয়া জল ঢালিয়া দিয়া যাইত। এখন গাছটা দোতলা সমান বড়ো হইয়া উঠিয়াছে, গোড়াটা গোল করিয়া বাঁধানো। আর কিছুটা হাঁটিতেই দূর হইতে একটা ঝাকড়া গাছের মাথা নজরে আসিল, কাহাদের উঠানে যেন গাছটা বাড়িয়া উঠিয়াছে। তারপরেই তাহার বুকের মধ্যে রক্ত ঢেউ খেলিয়া উঠিল। তাহাদের বাড়ি! তাহার মায়ের হাতে পোঁতা স্বর্ণচাপার গাছটা!
