অনুরোধ-উপরোধে ফল হইত না, রানীকে আবার বড়ি ভাজিয়া আনিতে হইত। রানুপিসি সেই কথা এখনও মনে রাখিয়াছে দেখিয়া আবেগে তাহার বুকের মধ্যেটা কেমন করিয়া উঠিল। পিসি তাহাকে এত ভালোবাসে, অথচ সে কতবছর আসিয়া একবার খোঁজ করে নাই। কাজটা খুব অন্যায় হইয়া গিয়াছে। এখন হইতে সে নিয়মিত যোগাযোগ রাখিবে।
মধ্যাহ্নভোজনের পর জগদীশ বাহিরের তক্তাপোশের উপর মাদুর পাতিয়া সামান্য বিশ্রাম করিবার জন্য শুইয়া পড়িল। কাজল ভিতরে গিয়া দেখিল খাওয়া সারিয়া রানী শোওয়ার ঘরে মেঝেতে বসিয়া জাতি দিয়া সুপারি কাটিতেছে। কাজলকে দেখিয়া রানী বলিল–আয়, বোস এখানে। ও লোকটা ঘুমিয়েছে?
-হ্যাঁ পিসি, ওকে শুতে দিয়েই তো এলাম।
—কে রে লোকটা? তোর মামাবাড়ির দিকের কেউ নাকি?
-না, আমার কেউ হয় না। বাবার এখন খুব নাম হয়েছে তা জানো তো? অনেক বই বেরিয়েছে বাবার, সেসব বই পড়ে লোকেরা বলহে বাংলা সাহিত্যে অনেক যুগের মধ্যে এতবড় সাহিত্যিক আর আসেনি। এর নাম জগদীশ চৌধুরী, কলকাতায় থাকে, বাবার লেখার খুব ভক্ত। এরা কয়েকজন বন্ধু মিলে বাবার স্মৃতিতে সভা করবে কলকাতায়, তার আগে একবার আমাদের গ্রাম দেখতে এসেছে।
জাঁতির কুচকুচ শব্দ বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। আগ্রহপূর্ণ স্বরে রানী জিজ্ঞাসা করিল—কেন রে? অপু বইতে আমাদের গাঁয়ের কথা লিখেছে বুঝি?
কাজল অবাক হইয়া গেল। যে বই লইয়া এখন সারাদেশে এত আলোচনা, রানুপিসি সে সম্বন্ধে কিছুই জানে না? সে বলিল—বাবার প্রথম উপন্যাসখানা তো আমাদের এই গ্রামের কথা নিয়েই লেখা। সব সত্যি ঘটনা, চরিত্রগুলোও সব সত্যি। ঠাকুরদা-ঠাকুরমার কথা আছে, প্রসন্ন গুরুমশাইয়ের কথা আছে, চিনিবাস কাকার কথা আছে।
তারপর একটু থামিয়া আস্তে আস্তে বলিল—তোমার কথাও অনেক আছে পিসি। তুমি নাকি বাবাকে ছোটবেলায় একটা খাতা দিয়েছিলে গল্প লিখে দেবার জন্য, কিছুদূর লেখার পর ঠাকুরদা এ গ্রাম ছেড়ে চলে যান, বাবা আর খাতাটা শেষ করতে পারেনি—সে ঘটনাও লেখা আছে। তুমি বাবার বই একটাও পড়ো নি? কত লোকে পড়ে ফেলল—
রানী ধরা গলায় বলিল—কী করে পড়বো বল? আমাদের গাঁয়ে বই পড়ার রেওয়াজ নেই, কেউ আমাকে বলেও নি অপুর এত নাম হয়েছে। তুইও তো একটা বই আমাকে দিয়ে যেতে পারতিস–আসলে কী জানিস, আমরা সেই গাঁয়েই পড়ে আছি, কাদায় গুণ পুঁতে। তুই শহরে থাকিস, তোর কত বন্ধু, কত কাজ—তোর কী আর মনে পড়বে আমার কথা? তবে তুই ছেলেমানুষ, তোকে দোষ দিই না, তোর বাবা বেঁচে থাকলে
কাজলের সত্য-সত্যই খুব মনখারাপ হইল। রানীর একটা হাত ধরিয়া সে বলিল—পিসি, তুমি রাগ কোরো না, আমার সত্যিই খুব ভুল হয়ে গিয়েছে। এরপর আমার আসতে আবার কমাস দেরি হবে হয়তো, কিন্তু আমি তার আগেই তোমাকে ডাকে পার্সেল করে বাবার এক সেট বই পাঠিয়ে দেব। অন্য লোকে যতই নাচানাচি করুক, এ পৃথিবীতে বাবার বই পড়বার সবচেয়ে বেশি অধিকার তোমার, কেন জানো?
রানী উত্তর দিল না, মাথা নিচু করিয়া কাটা সুপারির টুকরাগুলি আঙুল দিয়া নাড়াচাড়া করিতে লাগিল।
কাজল বলিল—কারণ এই যে, ছোটবেলায় তোমার প্রেরণাতেই বাবা প্রথম লিখতে শুরু করে। হলই বা ছেলেমানুষি লেখা, জীবনের প্রথম লেখা তো! বাবা নিজের উপন্যাসে তোমার ঋণ স্বীকার করেছে–
রানী মুখ তুলিল না। সুপারিগুলি আঙুল দিয়া নাড়িয়াই যাইতেছে।
কাজল এতক্ষণ আবেগের বশে কথা বলিয়া যাইতেছিল। হঠাৎ তাহার মনে হইল রানুপিসি প্রাণপণে কান্না চাপিবার চেষ্টা করিতেছে। সে অপ্রতিভ হইয়া কথা ঘুরাইয়া গ্রামের বর্তমান পরিবেশ কিরূপ সে বিষয়ে আলোচনা শুরু করিল। রানী অধমনস্কভাবে দুই-একটা অসংলগ্ন উত্তর দিল। কাজল বুঝিতে পারিল এ আলোচনায় রানুপিসির মনোযোগ নাই। কিছুক্ষণের ভিতরেই দ্বিপাক্ষিক নীরবতার মধ্যে কথাবার্তা থামিয়া গেল।
সারাটা বিকাল ধরিয়া কাজল জগদীশকে লইয়া গ্রাম দেখাইয়া বেড়াইল। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরিয়া জগদীশ ঝোলার ভিতর হইতে নোটবই বাহির করিয়া হ্যারিকেনের আলোয় কী সব লিখিতে বসিল। কাজল ভিতর-বাড়িতে ঢুকিয়া দেখিল রান্নাঘরের বারান্দায় বসিয়া রানুপিসি তরকারি কুটিতেছে। সে কাছে বসিয়া বলিল—পিসি, বাবা তোমাকে যে খাতাখানা লিখে দিয়েছিল সেটা এখনও তোমার কাছে আছে?
রানী বিষণ্ণ হাসিয়া বলিল–ছোটবেলার জিনিস কী ফেলা যায়? আছে বাক্সের মধ্যে। কেন রে?
—আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। একবার দেখাবে?
বঁটি কাত করিয়া রাখিয়া রানী উঠিয়া ঘরের মধ্যে গেল। খাটের তলায় রাখা পুরাতন বেতের পেঁটরা টানিয়া বাহির করিয়া খুলিতেই অকস্মাৎ চারিদিকের যেন কঠিন বর্তমানটা আর নাই। আবার সেই অতীতের নিশ্চিন্দিপুর। হলুদ জমির উপর খয়েরী ডুরেপাড় শাড়ি, খানকতক পুরানো চিঠি, ভিটোরিয়ার আমলের দুইটি তামার ডবল পয়সা। একটা পুঁতির মালা, মালার সূতা ছিড়িয়া পুতিগুলি বাক্সের ভিতর ছড়াইয়া পড়িয়াছে। সর্বোপরি পেটরার মধ্যেটায় কেমন একটা গন্ধপুরাতন কাপড় বা কাগজপত্র বন্ধ পড়িয়া থাকিলে যেমন পাওয়া যায়। এই ঘ্রাণের সহিত অতীত দিনগুলির কী যেন সম্পর্ক আছে, শুকিলেই মনে হয় মাঝের বসরগুলি সব ফাঁকি। আবার যেন সেই কালের গর্ভে বিলীন বাল্যকালটা সমস্ত রূপ-রস-গন্ধ লইয়া ফিরিয়া আসে।
উদ্গত চোখের জল চাপিয়া রানী খাতাখানা কাজলকে আনিয়া দিল।
