ভিটায় যে জঙ্গল হইয়া গিয়াছে তাহা সে ছোটবেলাতেই দেখিয়া গিয়াছিল। কেহ পরিষ্কার না করায় জঙ্গল যেন আরও বাড়িয়া উঠিয়াছে। কাঁটাওয়ালা দুষ্প্রবেশ্য ওকড়া ফলের ঝোপ ঠেলিয়া ভেতরে ঢোকাই কঠিন। নিশ্চিন্দিপুরে তাহার বাবা সম্প্রতি যে বাড়ি কিনিয়াছিল, কেহ বাস না করায় সেটির অবস্থাও ভালো নহে, অবিলম্বে মেরামত প্রয়োজন। বর্তমানে সে রানুপিসির বাড়িতেই থাকিবে।
তাহাদের বাড়িটার বলিতে গেলে আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। দু-একটা দেয়াল কোনোমতে দাঁড়াইয়া আছে, চারিদিকে ভাঙা ইট আর উইধরা কাঠের খুঁটির স্তূপ। ফ্যাকাসে সবুজ পাতাওয়ালা শেয়ালকাটার গাছ সর্বত্র। তাহার পায়েব শব্দে একটা গিবগিটি দ্রুত ছুটিয়া ধ্বংসস্তূপের ফাঁকে কোথায় লুকাইল।
কাজলের পরিচিত একজন প্রৌঢ় ইতিহাসের অধ্যাপক সবকাবের অনুমতি লইয়া কিছুদিন এখানে-ওখানে শখের খননকার্য চালাইযাছিলেন। প্রত্নতত্ত্বে উৎসাহী কাজল মাঝে মাঝে সন্ধ্যার দিকে তাহার কাছে গিয়া গল্প শুনিত। অধ্যাপক ভদ্রলোক বলিয়াছিলেন—যেখানে-সেখানে খুঁড়তে আরম্ভ করলেই তো হল না, তোমাকে নিশ্চিত হতে হবে সেখানে আগে মানুষের বাস ছিল। নইলে খোঁড়াখুড়ি কবলে, অঢেল পয়সা খরচ হল, পরিশ্রমও হল—তারপর সেখানে মাটির নিচে কিছুই পাওয়া গেল না—
-কী করে নিশ্চিত হওয়া যায়? কোনো উপায় আছে?
—আছে, অন্তত আমি পারি। ধবো, কোথাও একটা টিবি দেখে বা অন্য কোনো লক্ষণ দেখে মনে হল এখানে এসক্যাভেশন চালানো যেতে পারে। আমি তখন সেখানকার মাটি একমুঠো হাতে তুলে নিয়ে এঁকে দেখি–
-কেন? মাটি খুঁকে কী বোঝেন?
-মানুষ কোথাও একবার বাস করলে সেখানকার মাটিতে মানুষের গন্ধ মিশে যায়—সে গন্ধ আর নষ্ট হয় না। আমি মাটি খুঁকে বলে দিতে পারি—এখানে একহাজার বছর আগে বসতি ছিল। অবশ্য এ ক্ষমতা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয় কিছুটা সহজাতও বটে। যার থাকে তার থাকে
কাজল নিচু হইয়া এক মুঠা মাটি হাতে লইল।
এই মৃত্তিকা বিগত তিনপুরুষ ধরিয়া তাহাদের বংশকে লালন করিয়া আসিয়াছে, আশ্রয় দিয়াছে। তাহার ঠাকুরদা এই ভিটার দাওয়ায় বসিয়া পুথি লিখিয়াছে, ঠাকুমা রান্না করিয়াছে—
দুর্গাপিসি পুতুলের বাক্স সাজাইয়াছে এই উঠানে বসিয়া। তাহার বাবার শৈশবক্রীড়ার সাক্ষী এই ভিটা। এই মাটিতে কী সত্যই তাহাদের স্মৃতির ঘ্রাণ মিশিয়া রহিয়াছে?
বদ্ধমুষ্টি মুখের কাছে আনিয়া কাজল চোখ বুঁজিয়া ঘ্রাণ লইল।
প্রথমে শুধুই সোঁদা সোঁদা সাধারণ মাটির গন্ধ। তারপর যেন তাহারই সঙ্গে মিশিয়া কোন সুদুর অতীত হইতে হারানো দিনের ছবি আর রঙ ভাসিয়া আসিল। কত না-দেখা প্রিয়জন, ভুলিয়া যাওয়া উৎসবের আনন্দ-জন্মান্তরের তটভূমি হইতে প্রবাহিত অলৌকিক বায়ুস্রোতে ভর করিয়া দেবধূপের সৌরভ বহন করিয়া আনিল।
তাহার জন্মের বহু পূর্বেই এই মঞ্চের নাটক সমাপ্ত হইয়া গিয়াছে। কোথায় ঠাকুরদা-ঠাকুরমা, কোথায়ই বা দুর্গাপিসি আর বাবার হারানো শৈশব! বাবার কাছে সেইসব দিনের গল্প শুনিয়াছে শুধু, তাহার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ নাই সে যুগটার। অন্যের মুখে শোনা রূপকথার কাহিনীর মতো।
তবু চোখে জল আসে কেন?
জায়গাটায় বেশ ছায়া-ছায়া ভাব, তীব্র সূর্যের আলো প্রবেশ করিয়া পরিবেশের স্বপ্নিল মোহাচ্ছন্নতাকে খর্ব করে নাই। কাজল দুইখানি ইট পাশাপাশি পাতিয়া তাহার উপর অনেকক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
এই বাড়িটাকে আবার সারাইয়া তুলিতে হইবে। আধুনিক নকশা অনুযায়ী নতুন বাড়ি নয়, পূর্বে যেমন ছিল ঠিক তাহাই। সে দেখে নাই, কিন্তু রানুপিসি বলিতে পারিবে বাড়িটা দেখিতে কেমন ছিল। আজ জগদীশের আগমন দিয়া শুরু, তাহার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছে আগামী কয়েক বছরে তাহার বাবার খ্যাতি আরও বাড়িবে। দেশের দূর দূর প্রান্ত হইতে ভক্তের দল এই বাড়ি দেখিতে আসিবে একদিন। আসিয়া কী দেখিবে? এই শ্রীহীন ভগ্নস্তূপ? নাঃ, বাড়িটার সংস্কারের ব্যবস্থা লইতে হইতেছে। কিংবা থাক। বিগত যুগকে এভাবে কালের গর্ভ হইতে উদ্ধার করিয়া লাভ নাই। শেষ জীবনে তাহার বাবা যে বাড়িতে বাস করিত, তাহাই বরং লোকে দেখুক। পুরোনো ভিটার বেদনাকরুণ স্মৃতি বাবার উপন্যাসে অক্ষয় হইয়া থাকিবে।
ঘণ্টাখানেক পরে উঠিয়া আসিবার সময় কাজল ভিটা হইতে কিছুটা মাটি তুলিয়া লইল। পকেটে একটা কিসের হ্যান্ডবিল রহিয়াছে আজ দিন দুই-তিন, শেয়ালদার মোড়ে কে যেন বিলি করিতেছিল। সেই কাগজখানা বাহির করিয়া মাটিটুকু তাহাতে মুড়িয়া পকেটে রাখিল।
সে রানুপিসির বাড়ি পৌঁছাইবার একটু পরেই জগদীশও ফিরিয়া আসিল। কুঠির মাঠ দেখিয়া সে খুব খুশি। বলিল–নীলকুঠির ভাঙা চৌবাচ্চাগুলো এখনও পড়ে আছে দেখে এলাম, বুঝলে? অপূর্ববাবুর শেষ উপন্যাসখানা তো নীলবিদ্রোহের পটভূমিতে বাংলার গ্রাম নিয়ে লেখা। মহাকাব্য, বুঝলে, মহাকাব্য। সেই উপন্যাসের জন্মস্থানে দাঁড়িয়ে আছি ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিল—
দুপুরে রানী যত্ন করিয়া তাহাদের খাওয়াইল। কাজল ছোটবেলায় কী কী খাইতে ভালোবাসিত তাহা সে ঠিক মনে করিয়া রাখিয়াছে। থালায় চূড়া করিয়া ভাত বাড়িয়াছে—শহরের পালিশ করা চালের সাদা ভাত নয়, ঈষৎ লালচে মোটা চাল। কিন্তু ভারি মিষ্টি স্বাদ। পাতের একপাশে মোচার তরকারি, তাহার উপর বড়িভাজার গুঁড়া আর নারকোলকোরা ছড়ানো। ছোটবেলায় খাইতে বসিয়া মোচার ঘণ্ট দেখিলেই সে বলিতও পিসি, বড়ি দাওনি কেন? আমি এমনি এমনি মোচা খাবো না—
