-এবার চলো বাড়ি ফিরে যাই।
-সে কী? এই তো সবে এলে। ভালো কবে সব দেখাও তো হল না। তোমার জন্যেই তো আসা।
–তা হোক। আর ভালো লাগছে না।
–কেন?
একটু স্তব্ধ থাকিয়া হৈমন্তী বলিল–খোকাকে ছেড়ে থাকতে পারছি নে।
ফেরা হইল।
কাজলের ষান্মাসিক পরীক্ষা শেষ হইয়া গিয়াছে। অপু ঠিক করিয়াছে এখন বিহারের নতুন বাড়িতে যাইবে না, কাজলের বাৎসরিক পরীক্ষা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করিবে। নতুন জায়গায় একেবারে নতুন শ্রেণীতে ছেলেকে ভর্তি করিলে। এখন গেলে কাজলের একটা বৎসর নষ্ট হয়।
পরীক্ষার পর কাজল বেশ মজায় আছে। পড়ার চাপ কমিয়াছে। সারাদিন সে ঘুরিয়া কাটাইতেছে। বনজঙ্গল ভাঙিয়া মাঝে মাঝে চলিয়া যায় পাশের গ্রামে।
একদিন কাজল বেড়াইতে বেড়াইতে একটা বাড়ির উঠানে গিয়া হাজির হইল। বেশি সুন্দর ঝকঝকে বাড়ি, উঠানে ধানের গোলা, সিঁদুর দিয়া তাহাতে মঙ্গলচিহ্ন আঁকা। কয়েকটা ছেলে ছোটাছুটি করিতেছে। গোয়ালের একটা গরু বাছুরের গা চাটিতেছে। উঠানে ক্ৰীড়ারত চারটি কুকুরছনা। সে মুগ্ধ নয়নে হৃষ্টপুষ্ট বাচ্চাগুলির খেলা দেখিতেছিল। এমন সময় একটি ছেলে আসিয়া তাহার সামনে দাঁড়াইল।
-কী দেখছ?
তাই সে আমতা আমতা করিয়া বলিল–না, এই–মানে–ওই বাচ্চাগুলো বেশ সুন্দর কিনা, তাই–
–তুমি নেবে একটা?
অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যের সম্মুখীন হইয়া কাজল প্রথমটা কিছু বলিতে পারিল না। পরে বলিল–একেবারে দিয়ে দেবে? তোমার বাড়ির লোক কিছু বলবে না?
—দুর! আরও তো তিনটে রইল।–তুমি একটা নাও।
প্রথমে কাজল ধরিতে ভয় পাইতেছিল। পরে গায়ে হাত বুলাইয়া বুলি তাহারা নিতান্তই নিরীহ।
একটা বাচ্চা বগলদাবা করিয়া দ্রুত সে স্থানত্যাগ করিল। প্রতি মুহূর্তে ভয় হইতেছিল, পেছন হইতে ছেলেটি ডাকিয়া বলিবে–না ভাই, বাচ্চা দেবো না। তুমি রেখে যাও।
দ্রুত বড়ো মাঠটা পার হইয়া কাজল নিশ্চিন্দিপুরে ঢুকিল।
হৈমন্তী রাগ করিয়া বলিল–এঃ, এটা আবার কোত্থেকে জুটিয়ে আনলি, নেড়ির বাচ্চা—
হাত-পা নাড়িয়া কাজল দুর্বল জীবটির পক্ষে অনেক ওকালতি করিল। অবশেষে অনুমতি মিলিল। এবারে বাচ্চাকে তো কিছু খাওয়ানো প্রয়োজন। কুকুরের বাচ্চা কী খায়, এ সম্বন্ধে ধারণা না থাকায় হৈমন্তীর কাছে আবার গিয়া দাঁড়াইতে হইল।
–মা।
–কী রে?
–ওটাকে কী খেতে দিই এখন?
রাগ করিতে গিয়া হৈমন্তী হাসিয়া ফেলিল। ছেলেকে কাছে টানিষা লইয়া বলিল–বড্ড বাচ্চা যে, দুধ ছাড়া কি অন্য কিছু খেতে পারবে? বরং রান্নাঘরের কড়া থেকে খানিকটা দুধ নারকোলের মালায় নিয়ে খাওয়াগে।
খাদ্যের প্রতি বাচ্চাটার একটা দার্শনিকসুলভ নিস্পৃহতা দেখা গেল। কাজল জোর করিয়া দুধের মধ্যে মুখ ড়ুবাইয়া দিলে নাকের মধ্যে দুধ ঢুকিয়া হ্যাঁচিয়া সে অস্থির হইল। এক মালা দুধ খাওয়াইতে বেলা গড়াইয়া অন্ধকার নামিল।
দুই-তিনদিনের মধ্যে কুকুরছানা নূতন জায়গায় অভ্যস্ত হইয়া আসিল! কাজল বাবাকে বলিয়াছে, কলিকাতা হইতে কুকুরের গলার চেন আনিয়া দিতে। চেন গলায় দিয়া সকাল বিকাল কাজল তাহাকে লইয়া গ্রাম পরিক্ৰমা করিবে। ওয়াইড ওয়ার্লড ম্যাগাজিনে কুকুরের বীরত্ব সম্বন্ধে ভালো ভালো গল্প ছাপা হয়–বাবার কাছে কাজল তেমন অনেক গল্প শুনিয়াছে। সেও ইহাকে সুশিক্ষিত করিয়া বীরত্বপূর্ণ অভিযানের সঙ্গী করবে।
কুকুরের নাম রাখা হইল–কালু। সাতদিনের মধ্যেই কালু কাজলের পরম ভক্ত হইয়া উঠিল। কাজল নিজে আসিয়া খাইতে না দিলে খায় না, সর্বদা কাজলের পেছনে পেছনে ঘোরে। বেশ ভালো চলিতেছিল, কিন্তু মাসখানেক বাদে হঠাৎ কালুর কী অসুখ করিল। সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঝিমায়, খাওয়াদাওয়া একদম ছাড়িয়া দিয়াছে। প্রথমে কাজল আমল দেয় নাই, পরে দেখিল কালুর উঠিবার ক্ষমতা লুপ্ত হইয়াছে। তিনদিন আগেও লাফালাফি করিয়া বেড়াইয়াছে, ইদানীং সৰ্বক্ষণ শুইয়া থাকে। কাজলের সাড়া পাইলে অতিকষ্টে একবার মাথা তুলিয়া তাকায়। অশক্ত ঘাড়ের উপর মাথাটা কাঁপে, কিছুক্ষণ বাদে আবার চটের উপর পড়িয়া যায়।
অপু দেখিয়া বলিল–আহা রে! কালু বোধ হয় আর বাঁচিবে না।
গোঙানি। কালু মারা যাইতেছে, কালু ভীষণ কষ্ট পাইতেছে, অথচ কাজলের কিছুই করিবার নাই। চাপা গোঙানির শব্দ তাহাকে কিছুতেই ঘুমাইতে দিল না। রাত্রে মায়ের বুকের কাছে শুইয়া তাহার মনে হইল তাহার অসুখ করিলে মা-বাবা ব্যস্ত হইয়া সেবা করে, আর বেচারা কালু অন্ধকারের ভিতর একা একা কষ্ট পাইয়া মরিতেছে।
কাজল ফুঁপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল।
হৈমন্তী তাহাকে কাছে টানিয়া বলিল–কাঁদতে নেই মানিক আমার। ছিঃ—
আদরের কথা শুনিয়া কান্নাটা আরও বাড়িল। অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে কাজল বলিল–কালু কত কষ্ট পাচ্ছে, অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে–
হৈমন্তী তাহার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিল–একা কোথায় পাগলা! ওর কাছে ঠিক ভগবান এসে বসে আছেন, জানিস! যারা কষ্ট পেয়ে মারা যায়, তাদের আত্মাকে ভগবান নিজের হাতে স্বৰ্গে নিয়ে যান। ঠিক ওর পাশে ভগবান এসে বসেছেন
কাজলের দুঃখের বেগটা একটু কমিয়া আসিল। এভাবে সে কখনও ভাবিয়া দেখে নাই। একথা যদি সত্য হয়, তবে দুঃখের কিছুই নাই। ভগবান যদি আসিয়া থাকেন—তবে ভালোই তো। কাজল স্পষ্ট দেখিল, কালুর পাশে এক জ্যোতির্ময়দেহ বিশাল পুরুষ–উন্নতললাট, দীপ্তনয়ন। তাঁহার হাতে পৃথিবীর শাসনের স্বর্ণদণ্ড। তিনি আসিয়াছেন ক্লিষ্ট আত্মাকে স্বহস্তে স্বৰ্গে লইয়া যাইবার জন্য।
০৬. সুবৰ্ণরেখা
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
