সুবৰ্ণরেখা।
বালির চর বুকে করিয়া নদীটিা সারাদিন পড়িয়া থাকে। স্বল্প জল এখানে ওখানে বালির মধ্য দিয়া বহিয়া যায়। নদীর মাঝখানে বড়ো বড়ো কালো পাথরের চাই প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর মতো পড়িয়া আছে। উপরের প্রখর নীল আকাশ ধূসর দিগন্তের সহিত একটা অদ্ভুত বৈষম্য সৃষ্টি করিয়াছে। মাটির রঙ লাল। জমি সর্বত্র উঁচুনিচু। স্থানটিতে কেমন একটা বৈবাগ্যের ভাব আছে, মাটিব গৈরিক রঙটির মতো।
মৌপাহাড়িতে লোকজন কম। দিনের বেলায় মনে হয় কিসের উপলক্ষে যেন ছুটি হইয়া গিয়াছে–সবাই ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। সন্ধ্যার সময় একটা কালো চাদর ক্রমশ সবকিছু ঢাকিয়া ফেলে। ঝিঁঝি এবং অন্যান্য পতঙ্গের ডাকের মধ্যে দিয়া রাত্রি মৌপাহাড়িকে গ্ৰাস করিয়া লয়। অপু ইহার ভিতরে কী একটা যেন খুঁজিয়া পাইয়াছে। মানুষের সঙ্গ–কেবল কাজল এবং হৈমন্তী ছাড়া–তাহার কাছে আর কাম্য নহে। বইখাতা বগলে দিনের প্রায় সময়টাই সে বাহিরে ঘুরিয়া কাটায়।
নদীর ধারে একখানি বড়ো পাথরের উপর বসিয়া সে লেখে। জীবনকে সে অলসভাবে একদিক হইতে দেখে নাই। তাহার দেখা বিচিত্র জীবনের কথা সে আগামী যুগের জন্য রাখিয়া যাইবে। লিখিতে লিখিতে কখনও মুখ তুলিয়া দেখে সামনে সুবর্ণরেখার বিস্তৃত বক্ষ, ওপারে প্রান্তরের গৈরিক প্রসার। পড়ন্ত সূর্যালোকে নদীর বালির মধ্যে মিশ্ৰিত অভ্রকণা চিক্ চিক করিতেছে। আকাশে বাতাসে কীসের একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত অপুকে বিচলিত করে। কী একটা এখনই করিতে হইবে, কী একটা করিবার আছে–কিন্তু কিছুতেই করা হইতেছে না। শরীরের মধ্যে একটা বিচলিত ভাব বাড়িয়া ওঠে। মনে হয়, সবটাই বাকি রহিল, নির্দিষ্ট কাজের ভগ্নাংশও করা হইল না। যাহা জানিবার ছিল, তাহার কণামাত্রের আস্বাদন হইল মাত্র।
শরীর লইয়া অপু খুবই বিব্রত। নিশ্চিন্দিপুর ছাড়িয়া আসার পর মৌপাহাড়িতে তিন-চার বৎসর কাটিল, কিন্তু স্বাস্থ্যের খুব একটা উন্নতি হয় নাই। প্রায়ই বুকে একটা যন্ত্রণা হয়। মাথা ভার ঠেকে, অম্বল হয়। এসব কথা সে কাহাকেও বলে না। অসুখ গা সওয়া হইয়া গিয়াছে। সন্ধ্যা ঘনাইলে লেখা বন্ধ করিয়া নক্ষত্রের আলোয় বাড়ি ফিরিতে ফিরিতে হঠাৎ ছোট টিলেটার গা ঘেঁষিয়া বিশাল বৃহস্পতি গ্রহটাকে উঠিতে দেখিয়া তাহার অসুখের কথা বিস্মরণ হইয়া যায়। সেতারের জলদের মতো জীবনটা কাহার হাতের স্পর্শে যেন বাজিতেছে। কীসের স্পর্শে যেন জীবনের রঙ বদলাইতেছে, সুরের পরিবর্তন ঘটিতেছে।
সুবৰ্ণরেখার ধারে বসিয়া অপু নদীর সঙ্গে নিজের মিল খুঁজিয়া পায়। একা থাকিলেও মনে হয় না সে একা আছে। কাহার উপস্থিতি যেন রহিয়াছে আশেপাশে, অনুভব করা যায় কেহ পেছনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, সে চোখ ফিরাইলে সরিয়া যায় দূরে।
একদিন একটা কাণ্ড ঘটিল। অপু বসিয়া লিখিতেছে, একটা প্ৰজাপতি আসিয়া বসিল তাহার খাতার পাতায়। সে হাত বাড়াইয়া ধরিতে গেলে সেটা উড়িয়া একটু দূরে একটা পুটুস গাছের উপর বসিল। অপুর কেমন মনে হইল, সুন্দর প্রজাপতিটাকে ধরিতেই হইবে। এক টুকরা পাথর খাতার উপর চাপা দিয়া সে উঠিল।
প্রজাপতিটা ধরা গেল না। গাঢ় লাল আল বাদামী ডানাওয়ালা পতঙ্গটা তাহাকে দূর হইতে দূরে লইয়া গেল। এক ঝোপ হইতে অন্য ঝোপ করিতে করিতে অপু আচ্ছন্নের মতো দৌড়াইল। বাতাস অপুর চুল অবিন্যস্ত করিয়া দিল, তাহার ধুতিতে চোরাকাঁটা লাগিয়া গেল। পাথরে লাগিয়া পায়ের এক জায়গা কাটিয়াও গেল, কিন্তু প্ৰজাপতির নাগাল পাওয়া গেল না।
মাইলখানেক দৌড়াদৌড়ি করিয়া অপু নিজের বসিবাব জায়গায় ফিরিয়া আসিল। পাথরের উপর রাখা খাতার পাতা বাতাসে অল্প অল্প উড়িতেছে, চাপা আছে বলিয়া একেবারে উড়িয়া যায় নাই।
অপু পাথরটার এক কোণে বসিয়া শূন্যদৃষ্টিতে সুবৰ্ণরেখার দিকে তাকাইয়া রহিল।
বয়স বাড়িবাব সঙ্গে সঙ্গে কাজলের দুষ্টামি কমিয়াছে। আগের মতো লাফালাফি করিতে আর ভালোবাসে না। মৌপাহাড়িতে তাহার সমবয়সী কম। সমবয়সীদের সঙ্গে কখনই তাহার বন্ধুত্ব গড়িয়া ওঠে নাই। বয়সে যাহারা অনেক বড়, তাহদের সঙ্গেই বরং কাজলের জমে ভালো।
একদিন কয়েকটা ছেলে মিলিয়া মাইলতিনেক দূরের একটা পাহাড়ে বেড়াইতে গিয়াছিল। কাজলের মনে হইয়াছিল ছেলেগুলি এক একটি আস্ত বর্বব। ঢিল কুড়াইয়া ভীষণ জোরে ছুঁড়িতেছে, লাফাইতেছে, চিৎকার করিতেছে, নিজেদের মধ্যে তুচ্ছ কারণে মারামারি করিতেছে। অথচ চারিপাশে কেমন সুন্দর পাহাড়ি পরিবেশ। নির্জন স্থানে স্তব্ধতা খা খাঁ করিতেছে। মাঝে মাঝে বাসায় ফেরা কী এক ধরনের পাখি মাথার উপর দিয়া মধুর সুরে ডাকিয়া যাইতেছে। সব মিলাইয়া বেশ ঘনিষ্ঠ আনন্দময় পরিবেশ। ছেলেরা এসব মোটেই বুঝিতেছে না। কাজল ক্রমশ বিরক্ত হইয়া উঠিল। বড়ো গোলমাল করে ইহারা। তাহার মনের সঙ্গে ইহাদের কোন যোগাযোগ নাই। থামাইবার জন্য সে কিছুদিন আগে পড়া একটা গল্প শুরু করিল, কিন্তু সে গল্পে কেহ উৎসাহ পাইল না।
ধীরে ধীরে অল্প বয়সেই কাজলের ভিতর একটা বোধ জাগিয়া উঠিতেছিল, তাহার সহিত অন্যের মনের মিল হয় না–হইবে না।
সে একা থাকে। অপু প্রচুর বই আনি যা দিয়াছে। অনেক বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদ সে পড়িয়া শেষ করিয়াছে। অপু তাহাকে নিজে ইংরাজি শিখাইতেছে, যাহাতে কাজল শীঘ্রই বিশ্বসাহিত্যে প্ৰবেশলাভ করিতে পারে, কাজলও অসাধারণ দক্ষতা দেখাইয়া ইংরাজি ভাষা শিক্ষায় অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছে। সন্ধ্যায় দুই ঘণ্টা তাহাকে বাবার কাছে বসিয়া পড়িতে হয়।
