বিকালের দিকে কাজলের মনটা খারাপ লাগিতেছিল। বাবা বাড়ি নাই। এ সময়টা সে সাধারণত বাবার সঙ্গে কাটায়। পড়ন্ত বেলার চাপা আলো তাহার মনে বেদনার একটা সুর ছড়াইয়া দিল। শুধুই কি বাবার জন্য মন খারাপ? কাজল অবাক হইয়া আবিষ্কার করিল, মায়ের জন্যও তাহার মন কেমন করিতেছে। কদিনই বা হইল মা তাহাদের দুইজনের সংসারে আসিয়াছে—তাহার জন্য মন খারাপ হয় তবুও।
জানালা দিয়া বাহিরে তাকাইয়া ভেজা গাছপালা দেখিতে দেখিতে কাজলের মনে হইল, মাকে সে সত্যই খুব ভালোবাসিয়া ফেলিয়াছে।
পুরী হৈমন্তীর ভালো লাগিতেছিল। জীবনের প্রথম সমুদ্রদর্শনে তাহার মন অকস্মাৎ আকাশের মতো খোলামেলা হইয়া গেল।
সারাদিন বেশ গরম থাকে। বিকালে দুইজনে সমুদ্রের ধারে যায়। পায়ে পায়ে হাঁটিয়া হঠাৎ আবিষ্কার করে শহর অনেকটা পেছনে ফেলিয়া আসিয়াছে। বাঁ-পাশে উঁচু বালির ডিাঙা, এদিকে বিস্তৃত একখানি নীল আয়নার মতো সমুদ্র। প্রথম দিন রেল স্টেশন হইতে আসিবাব সময় পথের বাঁক ফিরিয়াই হঠাৎ সামনে সমুদ্র দেখিয়া হৈমন্তী অবাক হইয়া গিয়াছিল। সমুদ্র সম্বন্ধে তাহার মনে যে ধারণাটা ছিল সেটাকে চুরমার করিয়া আসল সমুদ্র চোখের সামনে একটা অগাধ বিস্তুতি খুলিয়া দিল।
সেদিন তাহারা বেড়াইতে বেড়াইতে অনেক দূর গিয়াছিল। অপু বলিল–কেমন লাগছে?
–ভালো।
–শুধু ভালো? আর কিছু না?
—বিরাট ভালোর বর্ণনা কী করে দিই বলে তো? মোটামুটি ভালো লাগলে বেশ বড়ো করে বলা যায়। খুব বেশি ভালো লাগলে তখন আর প্রগল্ভ হওয়া যায় না।
অপু বলিল–ভালো করে অনুভব করে দেখো, সমুদ্রের সঙ্গে মানুষেব জীবণের একটা আশ্চর্য সাদৃশ্য পাবে। জীবনও সমুদ্রের মতো বড়। জীবনেও সমুদ্রের মতো ঝড় ওঠে। সমুদ্র যেমন সৃষ্টির আদি থেকে অবিশ্রাম তীরে এসে আঘাত করছে, বাধা পেয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে– আবার নতুন করে আসছে, তেমনি জীবনও একটা লোহার পর্দায় বাব বার আঘাত করছে যেন। কিছুতেই ভাঙতে পারছে না। কী একটা যেন জানবার কথা আছে–কিছুতেই জানা যাচ্ছে না–
অপু থামিতেই হৈমন্তীর কানে সমুদ্রের শো শো শব্দটা খুব স্পষ্ট হইয়া উঠিল।
সন্ধ্যা নামিয়াছে। দিগন্ত পর্যন্ত অন্ধকার।–কেবল এখানে ওখানে সাদা ফেনা অন্ধকারেও দেখা যাইতেছে।
হৈমন্তী চুপি চুপি প্রশ্ন করিল–কী জানবার আছে মানুষের?
অপু ঘাড় ফিরাইয়া চোখ তীক্ষ্ণ করিয়া দূরে তাকাইয়া ছিল। অনেকক্ষণ বাদে ধীরে ধীরে বলিল–প্রশ্নটা জানা আছে, উত্তরটা কেউ জানি না।
ফিরিবার সময় হৈমন্তীর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে লইয়া অপু বলিল– কেন চিন্তা করতে শিখলাম বল তো? জীবনটা তো এমনিতেই বেশ কাটিয়ে দেওয়া যেতো।
পরের দিন সকালে অপু বলিল–সব ঠিক করে ফেললাম। চল, কাল কোনারক থেকে ঘুরে আসি। পুরী এসে কোনারক না দেখে ফেরা যায় না।
হৈমন্তীর আপত্তির কোন কারণ ছিল না। আরও একটি পরিবাব কোনারক দেখিতে যাইতেছে-অপুও তাঁহাদের সহিত যাইবে ঠিক করিয়াছে, কথাবার্তা সব ঠিক।
সারাদিন একটু একটু করিয়া কোনারকের ইতিহাসটা হৈমন্তী অপুর নিকট হইতে শুনিয়া লইল। ইতিহাস জানিবার পর কোনারক দেখিবার ইচ্ছা আরও বাড়িল। পরদিন সূর্যমন্দিরের চূড়াটা উঁচু গাছের পাতার ফাঁক দিয়া একটু একটু করিয়া স্পষ্ট হইয়া উঠিতেই আনন্দে হৈমন্তীর গলার কাছে কী একটা পাকাইয়া উঠিল।
বিরাট মন্দির। প্রশস্ত উঠানের অপর প্রান্তে বিশাল প্রধান দ্বার। মন্দিরের ভিত্তিতে রথচক্রের অনুকরণে বড়ো বড়ো পাথরের চক্ৰ খোদাই করা। হু হু করিয়া বাতাস বহিতেছে। মন্দিরের ওপাশের উঁচু গাছে হাওয়া লাগিয়া একটা মাতামাতি কাণ্ড হইতেছে। চারিদিক একেবারে স্তব্ধ। এত স্তব্ধ যে, হৈমন্তী নিজের শান্তিপুরী শাড়ির খস-খাস শব্দ শুনিতে পাইতেছে স্পষ্ট।
সহযাত্রী পরিবারটি খাওয়ার ব্যবস্থায় লাগিল। তাহারা সঙ্গে লুচি-তরকারি ও মিষ্টি আনিয়াছে। শতরঞ্চি বিছাইয়া সেগুলিকে পাত্র হইতে বাহির করিয়া পাতায় সাজাইতে আরম্ভ করিল। কর্তাটি অপুকে ডাকিয়া বলিলেন-অপূর্ববাবু, খাবেন তো এখন? আমার মশাই, সত্যি বলতে কি, ভীষণ খিদে পেয়েছে–
—আপনারা শুরু করুন, আমরা একটু ঘুরে আসি। আমাদেরটা রেখে দিন ববং।
অপু হৈমন্তীকে লইয়া মন্দিরটা ঘুরিয়া দেখিতে লাগিল। বিরাট প্রাঙ্গণের মধ্যে ধূসর পাথরের মন্দিরটা কেমন উদাস ভাবে দাঁড়াইয়া আছে। মাটি হইতে ক্ৰমশ চুড়ার দিকে উঠিবার কয়েকটি সংকীর্ণ পথ আছে। তাহারই একটা দিয়া অপু, হৈমন্তীকে লইয়া উঠিতেছিল। একদিকে মন্দিরের পাথর–অপবদিকে অনেক নিচে মাটি। হঠাৎ তাকাইলে মাথা ঘোরে। হৈমন্তী অপুকে ধরিয়া উঠিতেছিল।
অপু বলিল–ভালো করে ধরে থেকে। হাওয়া দিচ্ছে বেশ, বেসামাল হলে ঝুপ করে পড়ে যাবে।
অদ্ভুত! অদ্ভুত! শতাব্দীর ইতিহাসবাহী মৌন প্রান্তর, দূরে গাছের সারি, সুন্দর বাতাস। আকাশের রঙ তাহদেরই মনোলোকের স্বপ্নের মতো নীল। ধীরে ধীরে হৈমন্তীর মনের ভিতর কেমন একটা ঘুম ঘুম ভাব ছড়াইয়া পড়িতেছিল। বহু-তারবিশিষ্ট যন্ত্রের ঝিমঝিম বাজনার মতো আবেশ।
কিন্তু এত সব ভালো লাগিবার মধ্যে একটা কী চিন্তা যেন হৈমন্তীকে খোঁচা দিতেছে। অনেক আনন্দের মধ্যে একটু কী অতৃপ্তির আভাস। কযেকদিন হইতেই হৈমন্তী নিজের অতৃপ্তির কারণ অনুসন্ধান করিতে করিতে আজ এই সূর্যমন্দিরের ভগ্নসোপানে দাঁড়াইয়া উত্তরটা পাইল। সে অনুচ্চকণ্ঠে বলিল—শুনিছো?
