সুবৰ্ণরেখা। সু-ব-র্ণ-রেখা–নামটা কাজলকে ঘুম পাড়াইয়া ফেলে।
কাজল ঘুমাইলে অপু বলিল–ঠিক বুঝতে পারছিনে হৈমন্তী, কাজটা ভালো হল বিকা। সবে এসে নিশ্চিন্দিপুরে বসতে না বসতেই আবার রওনা দেওয়া-অবশ্য ডাক্তার বলল যেতে, তবু—
হৈমন্তী একটু ভাবিয়া বলিল–না, চলো কিছুদিন থেকেই দেখি তোমার শরীরটা সারে কিনা। এই ভালো, এক জায়গায় না থেকে বেশ ঘুরে ঘুরে বেড়ানো। ও রকম শেকড় গেড়ে সংসায় করতে আমিও ভালোবাসিনে।
–আচ্ছা, তোমার পাহাড়ি দেশ ভালো লাগে, না আমাদের এই পাড়াগাঁ ভালো লাগে?
–দুই-ই। এক এক দেশের এক এক রকম সৌন্দৰ্য–
একটু চুপ করিয়া থাকিয়া অপু বলিল–তুমি তো সমুদ্র দেখনি, না?
–না। কী করে দেখবো বল? বরাবর তো বাবার সঙ্গেই ঘুরেছি, সমুদ্রের কাছাকাছি বাবা কখনও বদলি হননি।
–যাবে?
হৈমন্তী উৎসাহে বিছানায় উঠিয়া বসিল।
–সত্যি বলছো? কবে নিয়ে যাবে? চলো দু’এক দিনেব মধ্যেই যাই।
– কোথায় যাবে?
হৈমন্তী চিন্তা করিয়া বলিল–তুমি বলো।
-পুরী যাবে?
পুরী যাওয়াই ঠিক হইল। কাজলের কিছুদিন বাদেই পরীক্ষা। সে রানির কাছে থাকিবে। অপুরা কাজলের পরীক্ষার আগেই ফিরিবে। রানির কাছে থাকিতে কাজলের কোন অসুবিধা নাই। কাজল সঙ্গে যাইবে বলিয়া অবশ্য হাত-পা ছুঁড়িয়ছিল এবং অপু রাজিও হইয়াছিল। কিন্তু রানি আসিয়া বলিল–তোরা যাচ্ছিস যা। এ ছেলেটার সামনে পরীক্ষা। এটাকে আবার দলে টনছিস কেন? ও আমার কাছে থাকুক, দুবেলা পড়াতে বসাব এখন। তোরা একা যা
কাজল রানির কাছে থাকিয়া গেল। অবশ্য অপুকে বাববার প্রতিশ্রুতি দিতে হইল যে, পরীক্ষার পরেই কাজলকে লইয়া সে পুবী যাইবে।
অপু হাসিয়া হৈমন্তীকে বলিতেছিল–আমাকে কোথাও একদণ্ড তিষ্ঠোতে দিচ্চে না, বুঝলে? দুই জায়গায় তো সংসার পেতে ফেললাম, তাতেও দেখচি খালি ঘুরে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছা কবীচে। বেশিক্ষণ ঘরের মধ্যে থাকলে মন কেমন হ্যাঁপিয়ে ওঠে, জানো!
—তোমার তো ওইরকমই। খালি বেড়ানো, খালি ঘুরে বেড়ানো! এখন তোমার যাযাবববৃত্তি একটু বন্ধ ব্যাখতে হবে, নইলে ছেলেটার পড়াশুনো আব্ব কিছু হবে ভেবেছ?
–হবে হবে। সে কি আমি ভাবিনি মনে করচো? কাজল এতে ভালো কবে মানুষ হয়ে উঠেচে। পড়াশুনায় ওর ঝোঁক বড়ো বেশি, সব সময় বই মুখে করে বসে আছে। নতুন বাড়িতে গিয়েই ওকে আবার সেখানকার ইস্কুলে ভর্তি করে দেব।
হৈমন্তী বলিল–আচ্ছা, সমুদ্রে স্নান করা যাবে তো? নাকি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ঢেউয়েব টানে?
–তা কেন, কত লোক স্নান কবচে দেখবে। সবাইকে কি জলে ভাসিযে নিয়ে যাচ্ছে? তা ছাড়া নুলিয়া আছে–
–নুলিয়ারা কখনও ডোবে না, না?
অপু হাসিয়া বলিল–তুমি বড়ো ছেলেমানুষ হৈমন্তী। একেবারে বাচ্চাদের মতো প্রশ্ন করছে। এই জন্যেই তোমাকে এত ভালো লাগে।
–আর তুমি খুব বুড়ো হয়ে গেছ, না?
-হয়েছিই তো।
–উঃ, একেবারে তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে–
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অপু বলিল–কাপড়চোপড় গুছিয়ে নাও। শীগগিরই রওনা দেবো।
অপু আর হৈমন্তী পুরী যাইবার দিন চারেক পর নিশ্চিন্দিপুরে একদিন বৃষ্টি নামিল। রাস্তার ধূলা নিমেষের মধ্যে কাদায় রূপান্তরিত হইয়া গেল। গ্রামের ভিতরের সমস্ত রাস্তা কাদায় ভর্তি, বালকের দল সেখানে আছাড় খাইতে লাগিল। বড়ো বড়ো আম কাঁঠাল গাছ হইতে টুপটাপ করিয়া অবিশ্রান্ত জল পড়িতেছে নিচের কচুবনের উপর। বৃষ্টি এক-একবার ধরিয়া আসে, কিন্তু উঁচু গাছ হইতে জল পড়া থামে না।
মেঘাচ্ছন্ন দিনে কাজলের বড়ো মন কেমন করে। কেন করে, তা সে বোঝে না। ঘন মেঘে। আকাশ কালো, গুম গুম করিয়া মেঘ ডাকিতেছে, ঝপ ঝুপ করিয়া অবিরাম বৃষ্টির শব্দ। কেমন একটা মনখারাপ-করা চাপা আলো চারিদিকে– এই আলোটা কাজলকে উদাস করিয়া দেয়।
রানুপিসির উত্তরের জানালায় বসিয়া সে দেখে, বাহিরের অন্ধকার ক্রমশ ঘন হইতেছে, দুপুরটা সন্ধ্যাবেলার মতো দেখাইতেছে। রানি বৃষ্টিতে তাহাকে বাহির হইতে দেয় নাই। জানালায় বসিয়া সে দেখিল, চণু একটা পুঁটিমাছধরা ছিপ আর একটা চটের থলে হাতে কোথায় যাইতেছে।
কাজল তাহাকে ডাকিয়া বলিল–কোথায় যাচ্ছিস রে?
–মাছ ধরতে।
— কোথায়? নদীতে?
—দূর! নদীর পথে বেজায় কাদা। বামুনপুকুরে যাবো। যাবি?
কাজল মাথা নাড়িল।
— যাবি না?
–না।
— কেন রে, জ্বর হযেছে?
–না।
–তবে?
—ইচ্ছে করছে না যেতে। তুই ধরগে যা মাছ।
ইচ্ছা খুবই করিতেছে। কিন্তু পিসি ঘরে বন্দী করিয়া রাখিয়াছে—এ কথা বলিলে চনুর কাছে দর কমিয়া যায়। চনুব মা-বাবা কেমন ছাড়িয়া দিয়াছে, তাহার বেলা সবার যত কড়াকড়ি।
একটু পরে রানি ঘরে ঢুকিলে সে বলিল–চানু কেমন মাছ ধরতে গেল এই একটু আগে! ওকে তো বেশ ছেড়ে দিয়েছে, আমাকে তুমি একটু বেরুতে দাও না কোথাও–
–দিই না তো বেশ করি। ও সব হাভাতে ছোঁড়ারা তো ঘুরবেই–
অনুমতি মিলিল না। অতঃপর জানালায় বসিয়া শিকে গাল রাখিয়া নির্মিমেষ দৃষ্টিতে বাহিরে তাকাইয়া থাকা ছাড়া উপায় নাই।
বাহিরে জল জমিয়াছে। একটা চড়ুই পাখি হঠাৎ কোথা হইতে উড়িয়া আসিয়া রাস্তার ধারের জমা জলে স্নান করিতে লাগিল। মাথা ড়ুবাইয়া জল তুলিয়া গায়ে দেয়, কখনও সমস্ত শরীরটা ড়ুবাইয়া দেয় জলে। বৃষ্টি হওয়ায় মহাস্মৃতি–এদিকে ওদিকে অনেক পাখি ঝোপঝাড়ে কিচমিচ করিতেছে। ভয়ানক গরম পড়িয়াছিল, তাহা হইতে মুক্তি পাইয়া সবাই খুশি! একটা শেয়াল সামনের বাগানটা পার হইয়া গিয়া একবারে রানুপিসিদের উঠানে আসিয়া পড়িল। কাজল দিনের বেলা এত কাছ হইতে কখনও শেযাল দেখে নাই, উৎসাহে সে উঠিয়া দাঁড়াইল। শেয়াল বড়ো চালাক, দিনমানে মনুষ্যবসতির নিকটে ঘোরাফেরা করিতে বড়ো দেখা যায় না। কাজলের চোখ বিস্ময়ে কোটার হইতে বাহির হইয়া আসিতেছিল। শেয়ালটা মিনিটখানেক স্থাণুবৎ দাঁড়াইয়া হঠাৎ তীরবেগে পাশের কচুবনে ঢুকিয়া পড়িল।
