আকাশটা দুপুরে ধকধক করিয়া জুলে, বিকালের দিকে স্নিগ্ধ হইয়া আসে। সন্ধ্যায় বাতাসে দিনশেষের সুর বাজে। অন্ধকার ঘন হইলে অপু নদীর ধাবে ঘাসে ছাওয়া ঢালু জমিতে শুইয়া দেখে আকাশে তারা ফুটিয়া উঠিতেছে। তাহার ছোটবেলায্য যেমন উঠিত। এ সময়টা সে নৌকায় কবিঘা নদীর উপর বেড়াইত। ছোটবেলাটা কত দূরে চলিয়া গিয়াছে।
মনে কোন দুঃখ নাই, কেমন উদার আনন্দ। পাড়ের নিচে নদীর বহিয়া যাইবার সহজ ভঙ্গির মতো আনন্দ। নদীর ওপারে দিগন্তের উপর উল্কাপাত হইল। বুপালী আগুনের তীব্র শিখা সন্ধ্যা আকাশে একটা উজ্জ্বল সরলরেখা টানিয়া দিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে অপুর মনে সুদূরের চিন্তা জাগিয়া উঠিল। উল্কাটি এক বিশাল বিশ্বের দূত–মহাজগতের সংবাদবাহক। তাহার মনটা হঠাৎ বড়ো হইয়া, ব্যাপ্ত হইয়া দেখিতে দেখিতে যেন সমস্ত আকাশে ছড়াইয়া গেল।
০৫. অপু ডাক্তার দেখাইতে গিয়াছিল
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
অপু ডাক্তার দেখাইতে গিয়াছিল। ডাক্তারবাবু চশমাটা নাকের উপর ঠিকভাবে আঁটিয়া লইয়া বলিলেন—আসল কথা এই, বাংলাদেশের হিউমিড আরহাওয়া আপনার স্যুট করছে না। আপনি কিছুদিন বাংলার বাইরে থেকে দেখুন তো, মনে হয় সুস্থ হবেন।
কথাটা অপুর মনে ধরিল। মধ্যপ্রদেশে সে যে কয়েক বৎসর কাটাইয়াছে, সে সময়। তাহার অসুখবিসুখ কিছু হয় নাই। প্রচণ্ড উল্লাসে হৈ হৈ করিয়া প্রায় একটা বন্য জীবন যাপন করিয়াছে। বিহারের দিকে কোথাও গিয়া থাকিলে মন্দ হয় না।
রাত্রে শুইয়া একদিন সে হৈমন্তীর সঙ্গে পবামর্শ করিল। হৈমন্তী কিছুটা অবাক হইয়া বলিল– নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে যাবে? অন্য কোথাও ভালো লাগবে তোমার?
—একেবারে যাবো না হৈমন্তী। আমাদের গা ছেড়ে পৃথিবীতে কোথাও গিয়ে শাস্তি পাব না। এ বাড়িও রইল, ইচ্ছে হলেই চলে আসব।
আসল কথা, অপুর বক্তে ভবঘুরেমি আবার জাগিয়া উঠিতেছে! স্থবিরতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিতেছে। অসুখের জন্যই সে যাইতেছে, এ কথা সম্পূর্ণ সত্য নহে! এক সমস্ত জীবন কাটানো তাহার পক্ষে অসম্ভব। এ তাহার পূর্বপুরুষদেব নিকট হইতে প্রাপ্ত। তাহাদের ভবঘুরে রক্ত তাহাকেও স্থির থাকিতে দিতেছে না। সে যাইবে, আমৃত্যু সে পৃথিবীর ধূলিতে পা ডুবাইয়া হাঁটিবে।
সামান্য সময়ের ভিতরেই অপু কিছু টাকা জোগাড় করিয়া ফেলিল। সবাই তাহাকে আগাম টাকা দেয়, তাহার বই পাইবার জন্য হাঁটাহাঁটি করে। সকালে দুপুরে বিকালে প্রচু্র চিঠি আসে। পাঠকেরা মুগ্ধ হইয়া লিখিতেছে। অপু সবার চিঠির উত্তর দেয়, সামান্য এক লাইনে চিঠি দেয়। প্রত্যেককে দীর্ঘ চিঠি দেওয়া সম্ভব নহে।
জীবন কানায় কানায় পূর্ণ হইয়া উঠিতেছে। আর কী প্রত্যাশা করিবার আছে? টাকা পাইতেছে এবং নাম করিয়াছে এটাই বড়ো কথা নহে–সে দুই চোখ ভরিয়া প্ৰাণ ভরিয়া জগৎটা দেখিয়া লইয়াছে। আরও দেখিবে। থামিবে না। গাৰ্হস্থ্য তাহার কপালে লেখা নাই।
টাকা আনিতে পাবলিশারের কাছে গিয়া একদিন জিজ্ঞাসা করিল–আপনার সন্ধ্যানে কোন ভালো জায়গা আছে বিহারের দিকে? ভাবছি কিছুদিন ওদিকে থাকবো।–
প্রকাশক হাসিয়া বলিল–আপনার ঘোরা বাতিকটা আর গেল না। হ্যাঁ, জায়গার খোঁজ দিতে পারি। অল্প কয়েকদিন থাকবেন, না–
–ভাবছি। একটা ছোটমতো বাড়ি পেলে কিনে নিতাম।
অপুকে তিনি একটা জায়গার কথা বলিলেন, কলিকাতা হইতে খুব দূর নহে, জামসেদপুরের কাছাকাছি। হাওড়া হইতে ট্রেনে মাত্ৰ ঘণ্টা পাঁচেক লাগে। পাহাড়ি এলাকা-অপুর ভালো লাগিবে, তিনি বার বার বলিতে লাগিলেন।
–জঙ্গল আছে? প্রাকৃতিক দৃশ্য কেমন?
—খুব ভালো। সে আপনি নিজের চোখে দেখবেন। আপনাকে তো চিনি। ভালো না হলে আমি আপনার কাছে ও জায়গার নাম করি। কখনও!
অপু আরও দু’পাঁচজনকে জিজ্ঞাসা করিল। অনেকে বিশেষ কোন খবর দিতে পারিল না। কেবল দুইজন লোক, যাদের কথার অপু মূল্য দেয়, জায়গাটার সম্বন্ধে প্রশংসা করিল।
প্রকাশকই খোঁজ করিয়া একটা বাড়ি বাহির করিলেন এবং অপু বিশেষ দেরি না করিয়া বাড়িটা কিনিয়া ফেলিল। কিনিবার জন্য সে নিজে যায় নাই, বাড়ির ছবি দেখিয়াছিল মাত্র। টালির ছাদওয়ালা ছোট সুন্দর বাড়ি। পাশে দুইটা ইউক্যালিপটাস গাছ পাশাপাশি যমজ ভাইয়ের মতো উঠিয়াছে। বহু পিছনে একটা পাহাড় দেখা যায়। ছবিতে বেশ একটা রহস্যের ভাব ফুটিয়াছিল। বিশেষত পিছনের পাহাড়টা অপুকে আকর্ষণ করিল। ছবিটা প্রকাশককে ফেরত দিয়া সে বলিল–আমি আর দেখতে যাবো না। আপনার ওপর ভরসা করে কিনছি। আপনি লোক পাঠিয়ে দিন টাকা সঙ্গে দিয়ে। দলিলপত্রে আমি একেবারে গিয়ে সই কবব।
রাত্রে শুইয়া শুইয়া অপু বলিল–খোকা, তুই তো পাহাড় দেখিস নি? এবার দেখবি’খন। কাজল পাহাড় দেখে নাই। বাবার কাছে শুনিয়া সে মনে মনে জিনিসটা সম্বন্ধে একটা ধারণা করিবার চেষ্টা করে। চড়কতলার ডাইনে যে মাটির উঁচু ঢিবিটা আছে, অনেকটা সেইরূপ কি?
–সেখানে নদী নেই বাবা?
–আছে। কী নাম জনিস?
–কী বাবা?
–সুবর্ণরেখা। নামটা তাহার পছন্দ হয়। সুবর্ণরেখা। এক নিঃশ্বাসে বলিবার মতো নাম। সাঁই করিয়া একবার তলোয়ার ঘুরাইবার মতো। কত নূতন জিনিস সে দেখিবে–পাহাড়, শালবন, সুবৰ্ণরেখা। সুবর্ণরেখা মিষ্টি নাম, সুন্দর নাম।
