ছলছল চোখে তাসনিম বলল, এখন কি করব বলতে পারিস?
এখন বাসায় চল, ভেবে চিন্তে যা করার করা যাবে।
.
উম্মে কুলসুম ঢুকতেই উম্মে হাফসা আতঙ্কিত স্বরে বললেন, এতক্ষণ কোথায় ছিলি? আব্দুস সাত্তার আবার অজ্ঞান হয়ে গেছে।
সেকি বলে উম্মে কুলসুম ডাক্তারকে খবর দিতে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
তখনও দু’বোন কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়েছিল। তাকে তন্তদন্ত হয়ে বেরোতে দেখে সায়মা জিজ্ঞেস করল, এভাবে কোথায় যাচ্ছেন?
উম্মে কুলসুম যেতে যেতে বলল, ছোট ভাইয়া আবার অজ্ঞান হয়ে গেছে, ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি।
সায়মা আপুর দিকে তাকিয়ে বলল, তোর কারণেই উনি বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন। আল্লাহ না করুক, যদি কিছু হয়ে যায়, সেজন্য তুই-ই দায়ী হবি। ওঁর মা-বাবা ও আত্মীয়রা ব্যাপারটা জানেন না, তারা তোকে দায়ী করবেন না ঠিক; কিন্তু উম্মে কুলসুম তোকে দায়ী করবেই। আর তুইও কী নিজেকে ক্ষমা করতে পারবি?
তাসনিম ভুল বুঝতে পেরে মুখ নিচু করে অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগল; কিছু বলতে পারল না।
উম্মে কুলসুম ডাক্তার ডাকতে যাওয়ার সময় দোতলার বারান্দা থেকে স্বামীকে আসতে দেখে তরতর করে সিড়ি বেয়ে নেমে এসে সালাম দিল।
আব্দুল মজিদ বিদেশ থেকে ফিরে এসে মাসখানেক হল পি.জি.তে প্রফেসার হিসাবে জয়েন করেছে। সেই-ই আব্দুস সাত্তারকে ঢাকায় নিয়ে এসে ইবনেসিনায় ভর্তি করেছে। ডিউটি সেরে ক্লিনিকে এসেছে। স্ত্রীর সালামের উত্তর দিয়ে বলল, কী ব্যাপার? তোমাকে খুব পেরেশান মনে হচ্ছে?
হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি চল। দুপুরের দিকে ছোট ভাইয়ার জ্ঞান ফিরে। কিছুক্ষণ পর ফোনে তাসনিমের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অজ্ঞান হয়ে যায়। আধঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরে আসে। একটু আগে তাসনিম ও সায়মা এসেছিলেন তাদেরকে চলে যাওয়ার কথা বলে আবার অজ্ঞান হয়ে গেছে। আমি ডাক্তারকে খবর দিতে যাচ্ছিলাম, তোমাকে দেখতে পেয়ে নেমে এলাম।
আব্দুল মজিদ স্ত্রীর কাছে বন্ধুর প্রেম কাহিনী শুনেছে। হাঁটতে শুরু করে বলল, ওঁরা চলে গেছেন।
না, কেবিনের বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। তারপর ওদের সঙ্গে কথা কাটাকাটির ব্যাপারটা বলল।
এটা তুমি ঠিক করো নি। ওর মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করা তোমার উচিত ছিল। উনি নিশ্চয় কারো কাছে আব্দুস সাত্তার ভাইয়ের বিয়ের কথা শুনেছেন। ভেবে দেখ, আমি ফেরার আগে তুমি যদি খবর পেতে আমি সেখানে একটা বিয়ে করেছি, তা হলে তোমার মানসিক অবস্থা কী হত? যাক গে, যা হওয়ার হয়েছে। ওর ভুল ভাঙিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিও। ততক্ষণে তারা দোতলায় উঠে। কেবিনের কাছে চলে এল।
সায়মা উম্মে কুলসুমকে উদ্দেশ্য করে বলল, আপনার ছোট ভাইয়ার জ্ঞান ফেরার পর একটু বাইরে আসবেন।
উম্মে কুলসুম কিছু বলল না।
আব্দুল মজিদ এক নজর দু’বোনের দিকে তাকিয়ে স্ত্রীকে বলল, ওঁরাই না কী?
হ্যাঁ, তারপর স্বামীকে নিয়ে কেবিনে ঢুকল।
ওরা ঢোকার একটু আগে আব্দুস সাত্তারের জ্ঞান ফিরেছে।
আব্দুল মজিদ বেডের কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে বলল, এখন কেমন লাগছে?
আব্দুস সাত্তার সালামের উত্তর দিয়ে বলল, ভালো। তারপর উম্মে কুলসুমকে বলল, তুই কোথায় গিয়েছিলি?
তুমি অজ্ঞান হয়ে যেতে ডাক্তারকে খবর দিতে যাচ্ছিলাম, ওকে আসতে দেখে বলে লজ্জা পেয়ে থেমে গেল।
আব্দুল মজিদ স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, আব্বাকে দেখছি না যে? বাসায় গেছেন।
না, দুপুরে ছোট ভাইয়ার জ্ঞান ফেরার পর ড্রাইভারকে নিয়ে বাড়ি চলে গেছেন। আব্বার কলেজে এবারও ইন্টারের পরীক্ষা কেন্দ্র হয়েছে। কাল থেকে পরীক্ষা শুরু। তারপর একটু আসছি বলে বেরিয়ে এসে তাসনিম ও সায়মাকে বলল, ছোট ভাইয়ার জ্ঞান ফিরেছে। এবার আপনারা বাসায় যান। পরে আপনাদের সঙ্গে ফোনে আলাপ করব।
সায়মা বলল, প্লীজ, একটু সময় দেবেন? কয়েকটা কথা বলব।
উম্মে কুলসুম স্বামীর কথাগুলো চিন্তা করে বলল, ঠিক আছে, চলুন রিসেপসনে বসি।
রিসেপসন রুমে লোকজন বসার জন্য সোফা সেট ও বেশ কয়েকটা চেয়ার রয়েছে। ওরা এক সাইডে বসল। বসার পর সায়মা বলল, দেখুন, আপুর কথায় আপনি মনে কিছু নেবেন না। আপনারা দেশে যাওয়ার তিন চার দিন পর আমরা আপনাদের বাসায় গিয়েছিলাম। আপনাদের কাজের বুয়া বলল, আপনার ছোট। ভাই এর বিয়ে। তাই সবাই দেশে গেছেন। কথাটা শুনে আপু এ্যাবনরম্যাল হয়ে পড়েছিল। তারপর এই দীর্ঘ দু’আড়াই মাস হয়ে গেল আপনার ছোট ভাইয়া যোগাযোগ করেন নি। এ্যাকসিডেন্টের কথা কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত আমরা জানতাম না। তাই উনি যখন আজ দুপুরের দিকে ফোন করেন তখন আপু কয়েকটা অশোভন কথা বলেছে। তারপর কিভাবে এ্যাকসিডেন্টের কথা জেনে আপুকে নিয়ে সে এসেছে বলে বলল, এবার আপনিই বলুন, আপুর কতটা দোষ?
সায়মা থেমে যেতে তাসনিম করুণস্বরে বলল, আমার মাথা ঠিক ছিল না। তাই কিছুক্ষণ আগে আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি। দয়া করে মাফ করে দিন।
উম্মে কুলসুম বলল, আপনি উচ্চ ডিগ্রী নিচ্ছেন, অথচ এটা জানেন না, শোনা কথা যাচাই না করে বিশ্বাস করতে নেই? যাই হোক, মানুষ মাত্রেই ভুল করে। আমিও না জেনে আপনাকে অনেক কিছু বলে ভুল করেছি। আপনিও আমাকে মাফ করে দিন।
তাসনিম বলল, আল্লাহ আমাদের সবাইকে মাফ করুক। এখন আমি কী আপনার ছোট ভাইয়ার কাছে যেতে পারি।
