এখন যাওয়া ঠিক হবে না। আপনাকে দেখে ছোট ভাইয়া হয়তো আবার জ্ঞান হারাবে। আমি বলি কী, আপনারা বাসায় চলে যান। আমি ছোট ভাইয়াকে। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলব। পরিস্থিতি বুঝে কাল সকালে ফোন করে আপনাদের আনাব। ফোনে কী বলেছিলেন জানি না, ছোট ভাইয়ার মুখ বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল, হাত থেকে রিসিভার পড়ে গিয়েছিল। তারপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। আপনাকে ছোট ভাইয়া যে কত ভালবাসে, তা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন?
ছলছল চোখে তাসনিম বলল, জানি ভাই জানি। খবরটা যাচাই না করে যে কত বড় ভুল করেছি, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
উম্মে কুলসুম বলল, আমাদের কাজের বুয়ার মাথায় একটু গোলমাল আছে। কি বলতে কি বলে, কি শুনতে কি শুনে তার কোনো ঠিক নেই। ওর একমাত্র ও ছয় বছরের ছেলে ও স্বামীকে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক সেনারা মেরে ফেলে ওকে ক্যাম্পে নিয়ে চলে গিয়েছিল। ও আমাদের গ্রামেরই মেয়ে। আব্ব জানতে পেরে অনেক টাকার বিনিময়ে ওকে নিয়ে আসে। তারপর থেকে ওর মাথা খারাপ হয়ে যায়। আব্ব চিকিৎসা করিয়ে ভালো করে। কিন্তু সম্পূর্ণ ভালো হয় নি। মাঝে মাঝে ভুল বকে, আর উল্টো পাল্টা কথা বলে। আপনাদেরকেও ঐরকম কিছু বলেছে। আসল ঘটনা হল, পাঁচ বছর আগে আমার আকদ হয়েছিল। একটু আগে আমার সঙ্গে যে ডাক্তার কেবিনে গেলেন, উনি আমার স্বামী। আকদ হওয়ার এক বছর পর উনি উচ্চ ডিগ্রী নিতে বিদেশে গিয়েছিলেন। যেদিন ফিরলেন, সেদিনই আমরা সবাই এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করে দেশের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তার কয়েকদিন পর আমার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানের দিন পাশের গ্রাম থেকে। রাজনৈতিক পার্টির কিছু ছেলে এসে মোটা অংকের টাকা দাবি করে। ছোট ভাইয়া দিতে অস্বীকার করে। ফলে তারা ভাইয়াকে হাইজ্যাক করার চেষ্টা করে। গ্রামের ছেলেরা জানতে পেরে বাধা দিলে দুই দলে মারপিট শুরু হয়। ওরা নানারকম অস্ত্র নিয়ে তৈরি হয়ে এসেছিল। আমাদের গ্রামের ছেলেদের সেসব ছিল না। লাঠিসোটা, বল্লম, দা, হেঁসো বের করতে দেরি হয়। ততক্ষণে আমাদের অনেকে জখম হয়। শেষে গ্রামশুদ্ধ লোক যখন তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ল তখন তারা পালাতে বাধ্য হল। অবশ্য তাদেরও কয়েকজন আহত হয়েছিল। তাদেরকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ছোট ভাইয়া গুরুতর জখম হয়েছিল। তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। তারপরের ঘটনা তো আপনারা দারোয়ানের কাছে থেকে জেনেছেন। আর সময় দিতে পারছি না। ছোট ভাইয়া আমাকে চোখের আড়াল হতে দেয় না। এতক্ষণে হয়তো আমার স্বামীকে খুঁজতে পাঠিয়েছে। তারপর আসি বলে উম্মে কুলসুম তাদের সঙ্গে সালাম বিনিময় করে কেবিনে ফিরে এল।
তাকে দেখে উম্মে হাফসা একটু রাগের সঙ্গে বললেন, এতক্ষণ কোথায় গিয়েছিলি? আব্দুস সাত্তার তোকে ডেকে নিয়ে আসার জন্য বারবার তাগিদ দিচ্ছে। একটু আগে আব্দুল মজিদ তোকে খুঁজতে গেল। আব্দুল মজিদ ফিরে এলে তোর ফুফুকে নিয়ে তার সাথে বাসায় যা।
উম্মে কুলসুম বলল, আমি আজ রাতে এখানে থাকব। তুমি ও ফুফুআম্মা তোমাদের জামাইয়ের সাথে চলে যাও। ড্রাইভারকে দিয়ে আমাদের রাতের খাবার পাঠিয়ে দিও।
এমন সময় স্বামীকে ফিরতে দেখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আম্মু ও ফুফুআম্মাকে নিয়ে বাসায় যাও। মাগরিবের নামাযের সময় হয়ে আসছে, বাসায় গিয়ে নামায পড়বে।
.
রাতে খাওয়ার পর উম্মে কুলসুম ছোট ভাইয়ার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল, একটা কথা বলব, রেগে যাবে না অথবা টেনসান করবে না বল?
আব্দুস সাত্তার দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, তুই যা বলতে চাচ্ছিস, আমি বুঝতে পেরেছি। ওর কথা না বলাই ভালো।
ঠিক আছে, ওর কথা না হয় নাই বললাম; কিন্তু তুমি কী ওকে ছাড়া বাঁচতে পারবে?
বাঁচা মরা আল্লাহর হাতে।
তাতো অবশ্যই। হায়াত যতদিন আছে বাঁচবেই। কিন্তু সেরকম বেঁচে থাকার যে কি যন্ত্রণা তা তুমি ভালোভাবেই জান। এখনও কী কম যন্ত্রণা ভোগ করছ?
আচ্ছা বল, কী বলতে চাচ্ছিস।
তাসনিম কেন ছোট ভাইয়ার সাথে এত রূঢ় ব্যবহার করল, সে সব বলে বলল, যত নষ্টের গোড়া আমাদের কাজের বুয়া জমিলা খালা।
শুনে আব্দুস সাত্তার এত খুশী হল যে, মনে হল তার বুকের উপর থেকে হাজার মণ ওজনের পাথর কেউ সরিয়ে দিল। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে চুপ। করে রইল।
কী হল ছোট ভাইয়া? কিছু বলছ না কেন?
একটা কথা ভেবে খুব আশ্চর্য হচ্ছি, তাসনিমের মতো উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে সত্য মিথ্যা যাচাই না করে কথাটা বিশ্বাস করল কি করে?
আমিও সে কথা ওকে বলেছিলাম। ওর বোন সায়মা বলল, বিয়ের কথা শুনে তাসনিম আপা এ্যাবনরম্যাল হয়ে পড়েছিলেন। তাই সত্য মিথ্যা যাচাই করার কথা মাথায় আসে নি।
তুই এসব জানলি কেমন করে?
তোমার বন্ধুকে নিয়ে যখন এলাম তখনও ওরা কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন। তারপর কিভাবে জানল বলে বলল; তাসনিম আপা খুবই অনুতপ্ত। আমার কাছে সবকিছু শোনার সময় চোখ থেকে পানি পড়ছিল। তখনই ক্ষমা চাওয়ার জন্য তোমার কাছে আসতে চেয়েছিলেন। তাকে দেখে তুমি যদি আবার অজ্ঞান হয়ে যাও? তাই বলেছি, আমি ব্যাপারটা তোমাকে বোঝাব এবং কাল সকালে তাকে ফোন করে জানাব।
প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্য আব্দুস সাত্তার বলল, তুই যে আমার কাছে সব সময়। রয়েছিস, আমার বন্ধুর অসুবিধার কথা ভাবছিস না কেন?
