ঠিক আছে ছাড়, কাপড় পাল্টে নিই। তুইও পাল্টে নে।
.
গাড়ি ইবনেসিনা ক্লিনিকে ঢুকতে দেখে তাসনিম বলল, এখানে এলি কেন? রুগী দেখে তো মন আরো খারাপ হয়ে যাবে?
এমন অনেক রুগী থাকে, যাকে দেখলে খারাপ মন ভালো হয়ে যায়।
গাড়ি থামার পর সায়মা বলল, তুই নেমে একটু দাঁড়া, আমি এসে তোকে নিয়ে যাব। তারপর ইনকোয়ারী কাউন্টারে গিয়ে আব্দুস সাত্তারের কেবিন নম্বার জেনে ফিরে এসে বলল, চল।
গতকাল ঢাকায় এসেই আব্দুস সাত্তার তাসনিমকে ফোন করতে চেয়েছিল। কিন্তু ডাক্তারদের পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যস্ততায় ও অপারেশনের কারণে তা সম্ভব হয়। নি। আজ দুপুরের দিকে জ্ঞান ফেরার পর উম্মে কুলসুমকে বলল, তুই তাসনিমদের বাসায় ডায়েল করে রিসিভারটা আমাকে দে।
এ্যাকসিডেন্ট করে জ্বরের ঘোরে আব্দুস সাত্তার যখন তাসনিমের নাম বলত তখন তার মা-বাবা ফুফু বুঝতে না পারলেও উম্মে কুলসুম বুঝেছিল। আজও। সবাই রয়েছেন। উম্মে কুলসুমকে তাসনিমদের বাসায় ফোন করার কথা বলতে সবাই তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।
উম্মে কুলসুম না দেখার ভান করে ডায়েল করে রিসিভার ছোট ভাইয়ার হাতে দিল। তারপর কথা বলতে বলতে তার মুখ বিবর্ণ হতে ও হাত থেকে রিসিভার পড়ে যেতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে বলল, কী হল ছোট ভাইয়া? ততক্ষণে আব্দুস সাত্তার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। উম্মে কুলসুম হাত ধরে নাড়া দিতে লাগল। তারপর সাড়া না পেয়ে ডাক্তার নিয়ে আসার জন্যে ছুটল।
ডাক্তার এসে পালস ও হার্ট পরীক্ষা করে বললেন, ভয়ের কিছু নেই। কোনো কারণে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে জ্ঞান ফিরে আসবে। জ্ঞান ফেরার পর আপনারা রুগীর সঙ্গে কথা বলবেন না। আর রুগীকেও কথা বলতে দেবেন না।
প্রায় আধঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরে এলে আব্দুস সাত্তার মা ও ফুফুকে বলল, তোমরা আমার বুকে একটু হাত বুলিয়ে দাও তো।
উম্মে হাফসা ছেলের বুকে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, কাকে ফোন করেছিলি?
আব্দুস সাত্তার কিছু বলার আগে উম্মে কুলসুম বলল, আহ আম্মু, ডাক্তার। সবাইকে কথা বলতে নিষেধ করে গেলেন না? তোমাদেরকে আমি পরে বলব।
.
কেবিনের কাছে এসে সায়মা দাঁড়িয়ে পড়ল।
তাসনিম বলল, কী রে? দাঁড়ালি কেন?
সায়মা বলল, যাকে দেখতে এসেছি, তার সম্পর্কে তোর জানা দরকার। তারপর কিভাবে ড্রাইভারকে আব্দুস সাত্তারের বাসায় পাঠিয়ে তার এ্যাকসিডেন্টের কথা ও গতকাল ঢাকায় আসার পর অপারেশনের কথা জেনেছে, সে সব বলে বলল, ভিতরে হয়তো ওর সব আত্মীয়রা আছেন। প্লীজ আপু, অশোভনীয় কোনো সীন ক্রিয়েট করবি না।
তাসনিম খুব অবাক হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই সায়মা একটা হাত ধরে টেনে নিয়ে ভিতরে ঢুকল।
সবাইর অবাক দৃষ্টি তাদের উপর পড়ল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উম্মে কুলসুম সামলে নিয়ে এগিয়ে এল।
সায়মা সালাম দিল।
উম্মে কুলসুম সালামের উত্তর দিয়ে তাসনিমের একটা হাত ধরে বেডের কাছে নিয়ে এল।
তাসনিম সবাইর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে সালাম দিয়ে মাথা নিচু করে নিল।
উম্মে হাফসা সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, কে মা তোমরা তোমাদেরকে তো চিনতে পারছি না।
উম্মে কুলসুম বলল, আমরা ডাক্তারের সাবধান বাণী কেউ মানছি না। ইনারা ছোট ভাইয়ার পরিচিত। খবর পেয়ে দেখতে এসেছেন।
তাসনিম আব্দুস সাত্তারের দিকে তাকিয়ে দেখল, অনেক রোগা হয়ে গেছে। মুখটা খুব মলিন। চোখে চোখ পড়তে অপলক দৃষ্টিতে দু’জনেই তাকিয়ে রইল।
চোখে পানি এসে গেছে বুঝতে পেরে আব্দুস সাত্তার মুখ ঘুরিয়ে নিল। তারপর সামলে নিয়ে উম্মে কুলসুমকে বলল, ওদেরকে চলে যেতে বল।
উম্মে কুলসুম ওদেরকে কেবিনের বাইরে নিয়ে এসে তাসনিমকে উদ্দেশ্য করে বলল, আপনার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় ছোট ভাইয়া অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার বলেছেন, তার কথা বলা একদম নিষেধ। প্লীজ, আপনারা এখন চলে। যান। ছোট ভাইয়া সুস্থ হওয়ার পর আমি ফোন করে জানাব, তখন আসবেন।
আব্দুস সাত্তারের অবস্থা দেখে তাসনিমের দুঃখ হলেও বিয়ের ব্যাপারটা জানতে পারে নি বলে রাগটা এখনো রয়েছে। তাই রাগের সঙ্গে বলল, বিয়ের পরে নিশ্চয় এ্যাকসিডেন্টটা হয়েছে? তা আপনার ভাবিকে দেখলাম না যে?
তার কথা শুনে উম্মে কুলসুম প্রথমে হকচকিয়ে গেল। তারপর সামলে নিয়ে বলল, ছোট ভাইয়া বিয়ে করেছে, কে বলেছে আপনাকে?
তাসনিম রাগের সঙ্গেই বলল, যেই বলুক, কথাটা সত্য কিনা বলুন?
উম্মে কুলসুম এবার রেগে উঠে বলল, না বলব না। যে প্রেমের মূল্য জানে না, কদর জানে না। প্রেমিককে বিশ্বাস করে না, তার কথার উত্তর দেব না। যান চলে। যান, আর কোনো দিন আসবেন না। ছোট ভাইয়াকেও বলে দেব, সে যেন। আপনাকে আর কোনো দিন বিরক্ত না করে। কথা শেষ করে কেবিনে ঢুকে গেল।
আপুর কথায় সায়মা রেগে গিয়েছিল। উম্মে কুলসুম কেবিনে ঢুকে যাওয়ার পর রাগের সঙ্গে বলল, বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করা তোর উচিত হয় নি।
উম্মে কুলসুমের কথা শুনে তাসনিম বুঝতে পেরেছে, বিয়ের কথাটা সত্য নয়। অনুতপ্ত কণ্ঠে বলল, আব্দুস সাত্তার আমাদেরকে চলে যেতে বলায় আমার মাথা। গরম হয়ে গিয়েছিল।
কেন উনি চলে যেতে বলেছেন, ভেবে দেখেছিস? ফোনে ওকে কি কি বলে অপমান করেছিস মনে নেই?
