আমরা বাড়ির মালিকের কাছে এসেছি। কোন ফ্লাটে থাকেন বলুন।
ওরা ফ্লাটে থাকেন না। তারপর একটা হাত বাড়িয়ে বলল, ঐ যে মসজিদের উত্তর দিকে দোতলা বাড়িটা দেখছেন, ওখানে থাকেন? কিন্তু ওঁরা তো কেউ বাসায় নেই।
কোথায় গেছেন?
দারোয়ান মনে মনে হিসাব করে বলল, চারদিন হল সবাই দেশের বাড়িতে গেছেন। শুধু একজন কাজের বুয়া আছে।
তাসনিম বুঝতে পারল, যেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার পরের দিন গেছেন। জিজ্ঞেস করল, কবে ফিরবেন জানেন?
না। তবে কাজের বুয়া হয়তো জানতে পারে। আসুন আমার সঙ্গে।
সাদামাটা অর্ডিনারী বাড়ি। নিচতলা ও উপরের তলায় গ্রীল দিয়ে ঘেরা বেশ। চওড়া বারান্দা। গ্রীলের ভিতরে চিক ফেলা।
গেটের কাছে এসে দারোয়ান কলিংবেলের বোতামে চাপ দিল।
একটু পরে একজন বয়স্কা মহিলা চিক সরিয়ে বলল, কে?
দারোয়ান ওদেরকে দেখিয়ে বলল, ইনারা সাহেবের কাছে এসেছেন। সবাই দেশে গেছেন শুনে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।
জমিলা গেট খুলে দিয়ে ওদেরকে ভিতরে আসতে বলল। তারপর তাদেরকে ড্রইংরুমে নিয়ে এসে বসতে বলে বেরিয়ে গেল।
তাসনিম ও সায়মা রুমের পরিবেশ দেখে খুব অবাক হল। সব আসবাবপত্র অর্ডিনারী। মেঝের কার্পেট, দরজা জানালার পর্দাও তাই। একপাশে বই ভর্তি একটা আলমারী। কোনো কিছুতে এতটুকু আভিজাত্যের ছাপ নেই।
তাসনিম চিন্তা করতে লাগল, যে এতবড় এ্যাপার্টমেন্ট বাড়ির মালিক, যে প্রথম সাক্ষাতের দিন প্রেমিকাকে হীরের আংটি উপহার দিতে পারে, তার বাড়ির পরিবেশ এত সাধারণ, প্রত্যক্ষ না করলে বিশ্বাস হত না।
সায়মাও যেন বিশ্বাস করতে পারল না। বলল, এই আপু, কিছু অনুমান করতে পারছিস?
তাসনিম বলল, কী অনুমান করব?
এমন সময় জমিলা ট্রেতে করে কেক, বিস্কুট ও দু’কাপ কফি নিয়ে এসে বলল, সাহেবদের কেউ নেই, যা ছিল নিয়ে এসেছি।
তাসনিম বলল, এসব আনতে গেলেন কেন? আমরা দু’একটা কথা জিজ্ঞেস করেই চলে যাব।
তাতে কী হয়েছে? মেহমানকে যত্ন করা সওয়াবের কাজ।
দু’বোন কেক বিস্কুট না খেয়ে শুধু কফি খেল। তারপর তাসনিম জিজ্ঞেস করল, সাহেবরা কবে ফিরবেন জানেন?
জমিলা বলল, না।
তা হঠাৎ সবাই দেশে গেলেন কেন?
হঠাৎ হবে কেন? অনেক আগে সাহেবের আকদ হয়েছিল, এবার বৌ ওঠাবে। তাই সবাই দেশে গেছে।
দু’বোন চমকে উঠে একে অপরের দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তাসনিমের মনে হল, কেউ যেন তাকে হিমালয়ের চূড়া থেকে ছুঁড়ে নিচে ফেলে দিল। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
জমিলা ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, সাহেবের বিয়ের কথা শুনে খুশী হয় নি। বলল, এই দেখুন, আসল কথাটাই ভুলে গেছি, আপনাদের পরিচয় নেওয়া হয় নি। কেন এসেছেন তাও জানা হয় নি।
তাসনিম বাস্তব জ্ঞান হারিয়ে সায়মার দিকে তখনও তাকিয়েছিল। তার কানে জমিলার কথা গেল না।
সায়মা তা বুঝতে পেরে জমিলার দিকে তাকিয়ে বলল, আমরা দু’বোন। আমি ছোট। আপনাদের সাহেবের সঙ্গে খুব জানাশোনা। উনি আসতে বলেছিলেন। আচ্ছা, সাহেবের দেশের বাড়ি কোথায়?
নিলফামারী।
সায়মাদের দেশের বাড়িও নিলফামারী। তাই বেশ অবাক হয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, ওঁর আব্বার নাম জানেন?
তা আর জানব না। আমার বাড়িও তো ওখানে। হাজী আব্দুল হামিদকে গেরামের সবাই চেনে। আশপাশের গেরামের লোকেরাও চেনে। ওনার মতো বড়লোক দশ পাঁচটা গেরামে কেউ নেই। কত যে জমি-জায়গা তা কেউ বলতে পারে না। খুব ভালো মানুষ। গরিবের মা বাপ, গেরামের উন্নতির জন্য মাদ্রাসা, স্কুল, হাসপাতাল নিজের টাকায় করে দিয়েছেন।
আব্দুস সাত্তারের বাবার সুখ্যাতি শুনে সায়মা বিরক্ত বোধ করে বলল, তা বাসায় কেউ যখন নেই, এবার আমরা আসি। তারপর তাসনিমের দিকে তাকিয়ে বলল, আপু চল।
তাসনিম মনে প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে এখনও স্তব্ধ হয়ে মুক ও বধিরের মতো বসেছিল। সায়মার কথাও তার কানে গেল না।
সায়মা তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে দাঁড়িয়ে উঠে আপুর একটা হাত ধরে টান দিয়ে বলল, এই আপু, বাসায় চল।
তাসনিম এবার সম্বিত ফিরে পেয়ে ধীরে ধীরে তার সঙ্গে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠল।
সায়মা ড্রাইভারকে বলল, বাসায় চলুন।
পথে কেউ কোনো কথা বলল না। বাসায় পৌঁছে সায়মা গাড়ি থেকে নামল; কিন্তু তাসনিম বসে রইল।
সায়মা বলল, এই আপু, নামবি তো।
তাসনিমের কোনো সাড়া নেই, বসেই রইল।
সায়মা তার একটা হাত ধরে টেনে নামিয়ে রুমে নিয়ে এসে বসিয়ে দিল।
তাসনিম তার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
সায়মার মনে হল, আব্দুস সাত্তার সাহেবের বিয়ের কথা শুনে আপু এবনরম্যাল হয়ে পড়েছে। আতঙ্কিত স্বরে বলল, আপু তুই ওভাবে আমার দিকে। তাকিয়ে আছিস কেন? কোনো কথাই বা বলছিস না কেন?
তাসনিমের ঠোঁট দুটো শুধু একটু কেঁপে উঠল আর চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল।
সায়মার ধারণা হল, মনে আঘাত পেয়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ভয় পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত স্বরে বলল, আপু, তুই চুপ করে আছিস কেন? কথা বলবি তো? একটু পরে তাকে ফুলে ফুলে কাঁদতে দেখে কিছুটা স্বস্তি পেয়ে বলল, একটা কাজের বুয়া কি বলতে কি বলেছে, আর তাতেই তুই আব্দুস সাত্তার সাহেবকে অবিশ্বাস করে ফেললি? তুই-ই তো বলেছিলি, “হাদিসে আছে, প্রমাণ না নিয়ে শোনা কথা বিশ্বাস করতে নেই,” আরো জোরে ফুলে ফুলে কাঁদতে দেখে চুপ করে গেল। কাদলে মানুষের অনেকটা হালকা হয়। তাই সায়মা তাকে কিছুক্ষণ সময় দিল। তারপর যখন বুঝতে পারল, কান্নার বেগ কমেছে তখন। তাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, তুই আমার থেকে বেশি কুরআন হাদিস পড়িস, আর এটা জানিস না, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (দঃ) মানুষকে ধৈর্য ধরতে বলেছেন? আমার মন বলছে, আব্দুস সাত্তার সাহেব তোর সঙ্গে কিছুতেই বেঈমানী করতে পারেন না। বিয়ের ব্যাপারটা আমি একদম বিশ্বাস করতে পারছি না। তুই। বোধহয় ওদের কাজের বুয়ার সব কথা শুনিস নি। আমি তার কাছ থেকে জেনেছি, দেশের বাড়ি নিলফামারী, ওর বাবার নাম হাজী আব্দুল হামিদ। তিনি খুব ধনী লোক। আশপাশের গ্রামের সবাই তাকে চেনে। আমাদের দেশের বাড়িও নিলফামারী। আলু নিশ্চয় ওদেরকে চেনে। আব্বুকে সবকিছু জানালে কেমন হয়?
