রিসিভার রেখে দিলে তো তোমার আপু কষ্ট পাবে। তুমি বরং রিসিভারটা ওকে দাও। ও রাখতে বললে রেখে দেব।
মাত্র একবার দেখেই আপুর জন্য দরদ যে উথলে উঠছে দেখছি। বিয়ের কিছুদিন পর তো স্বামীরা বৌ এর সঙ্গে কোমর বেঁধে ঝগড়া করে?
পুরুষরা কোমর বেঁধে ঝগড়া করে না, করে মেয়েরা। আমার মরহুম দাদাজী বলতেন, “বিয়ের প্রথম বছর স্বামী কথা বলে স্ত্রী শোনে। দ্বিতীয় বছর স্ত্রী বলে স্বামী। শোনে। আর তৃতীয় বছর থেকে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বলে পাড়া-পড়শী শোনে।” আমার মনে হয় দাদাজী ঠিক কথাই বলেছেন। কারণ এক হাতে তালি বাজে না।
আপনার দাদাজীর বচন শোনার ধৈর্য আপুর থাকলেও আমার নেই।
তা হলে আর কষ্ট করছ কেন? রিসিভারটা তোমার আপুকে দিয়ে দিলেই তো ল্যাটা চুকে যায়।
আচ্ছা বাচাল ছেলে তো? আপনার কী ভদ্ৰতা জ্ঞান নেই?
যথেষ্ট ছিল, তুমিই সব খরচ করে দিচ্ছ।
সামনে পেলে বাচালতা ছাড়িয়ে দিতাম।
ঠিকানা তো জান, ড্রাইভারকে বল, পৌঁছে দিতে।
সায়মা বুঝতে পারল, কথায় ওঁকে হারাতে পারবে না। বলল, বকমবাজরাই বেশি কথা বলে।
তুমি কিন্তু আমার চেয়ে বেশি কথা বলছ।
উঁহ, কী সাংঘাতিক ছেলে রে বাবা, বলে তাসনিমার হাতে রিসিভার দিয়ে বলল, তোর পাগলকে তুই সামলা। আমার ঘুম পাচ্ছে। তারপর বেড়ে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
গভীর নিঝুম রাত। তাই আব্দুস সাত্তারের কথাগুলোও তাসনিম শুনতে পেয়েছে। রিসিভার কানের কাছে নিয়ে বলল, সায়মার কথায় কিছু মনে কর নি তো? ও কিন্তু তোমার সঙ্গে দুষ্টুমী করেছে। আমার সঙ্গেও প্রায়ই করে।
আব্দুস সাত্তার বলল, তা কি আর আমি বুঝি না। শোন, আর দেরি করা উচিত হচ্ছে না। এবার রাখি কেমন?
কাল ফোন করবে তো?
তাতো করবই।
ঠিক আছে রাখছি বলে তাসনিম সালাম বিনিময় করে লাইন কেটে দিল।
সায়মা বলল, কোনো জিনিস বাড়াবাড়ি ভালো না। তোরা কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করছিস।
হয়েছে, তোকে আর পাকামী করতে হবে না, ঘুমিয়ে পড়।
.
পরের দিন ফোনের অপেক্ষায় তাসনিম রাত দুটো পর্যন্ত জেগে রইল। সাড়ে বারটায় ফোন না আসায় দশ মিনিট অপেক্ষা করে বেশ কয়েকবার সে ফোন করেছে। রিং বাজার শব্দ না হয়ে শুধু ঘড় ঘড় শব্দ হয়েছে। তাতেই বুঝেছে ফোন খারাপ। তবু দু’টো পর্যন্ত জেগে থেকে ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালে নাস্তা খেয়ে তাসনিম আবার ফোন করল আব্দুস সাত্তারের বাসায়। রাতের মতো একই শব্দ শুনে। নিশ্চিত হল ফোন খারাপ। ভাবল, আজ নিশ্চয় ফোন সারাবার ব্যবস্থা করবে অথবা অন্য কোথাও থেকে ফোন করবে। কিন্তু তিন চার দিন পার হয়ে যেতেও যখন ফোন এল না তখন বেশ চিন্তিত হল।
এই ক’দিন সায়মা আপুর অস্থিরতা লক্ষ্য করেও কিছু বলে নি। আজ কলেজ থেকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, আপু, তোর মন খারাপ কেন বলবি?
তাসনিম বলল, মানুষের মন সব সময় ভালো থাকে না, মাঝে মাঝে খারাপও থাকে।
তা আমিও জানি। আর মন খারাপের পিছনে যে কারণ থাকে, তাও জানি। তোর মন খারাপের কারণটা জানতে চাচ্ছি। আব্দুস সাত্তার সাহেবের সঙ্গে কিছু। হয়েছে নাকি?
কী আবার হবে? এমনিই মন খারাপ।
আমি তোর মুখ দেখে বুঝতে পারছি কিছু হয়েছে। কি হয়েছে বল, সম্ভব হলে সমাধান করে দেব।
তাসনিম জানে, সায়মার হাত থেকে সহজে নিস্তার পাওয়া যাবে না। বলল, প্রত্যেক দিন ফোন করার কথা থাকলেও আজ চার পাঁচ দিন করে নি।
সায়মা হেসে উঠে বলল, ও এই কথা। কোনো কারণে হয়তো করতে পারে নি। এতে মন খারাপের কী হল?
ও তুই বুঝবি না।
তা ফোন না করার কারণ কিছু বুঝতে পারলি?
না।
তুই ফোন করিস নি?
করেছি, রিং হয় নি। মনে হয় ফোন খারাপ।
ওর বাসায় গিয়ে খোঁজ নিতে পারতিস?
বাসার ঠিকানা জানি না।
আমি জানি।
সত্যি বলছিস?
হ্যাঁ সত্যি।
কীভাবে জানলি?
কিভাবে জেনেছিল সায়মা বলল।
ওমা, তাই নাকি? তুই তো খুব চাপা?
জানার পরের দিন তোকে ওঁদের বাসায় নিয়ে গিয়ে আসিফ সাহেবই যে আব্দুস সাত্তার প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম। তুই তো সকালে তার সঙ্গে দেখা করে এলি। তাই কথাটা বলি নি।
তৈরি হয়ে নে, এক্ষুনি যাব।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখ, এসময় কেউ কারো বাসায় যায়? আসরের নামায পড়ে যাব।
.
বিকেল সাড়ে পাঁচটায় তাসনিম ও সায়মা ঠিকানা মতো একটা বেশ বড় গেটের কাছে এল। গেট বন্ধ দেখে তাসনিম ড্রাইভারকে হর্ণ বাজাতে বলল।
একটু পরে একজন খাকী পোশাক পরা যুবক গেট খুলে দিলে ড্রাইভার গাড়ি ভিতরে ঢুকিয়ে একসাইডে পার্ক করল।
তাসনিম ও সায়মা গাড়ি থেকে নেমে বাড়ি দেখে অবাক। এ্যাপার্টমেন্ট আকারে সাততলা বাড়ি। নিচতলাটা প্রায় সবটাই গ্যারেজ। বেশ কয়েকটা গাড়ি পার্ক করা। গেট থেকে ঢুকে অনেকখানি প্রশস্ত জায়গা। এক পাশে ছোটখাট একটা মসজিদ। মসজিদের দক্ষিণ দিকে দুটো পাকা রুম। উত্তর দিকে ছোট একটা। দোতলা বাড়ি।
খাকি পোশাক পরা যুবকটা এগিয়ে এসে বলল, আপনারা কোন ফ্লাটে যাবেন?
তাসনিম বলল, আপনি নিশ্চয় দারোয়ান?
জ্বি, টয়লেটে গিয়েছিলাম। গেট খুলতে তাই একটু দেরি হয়ে গেছে।
ঠিক আছে, আমরা আব্দুস সাত্তার সাহেবের কাছে এসেছি। উনি কোন ফ্লাটে থাকেন বলেন নি।
দারোয়ান চিন্তিত মুখে বলল, এখানে তিনজন আব্দুস সাত্তার আছেন, কার কাছে এসেছেন বুঝব কী করে? এই বাড়ির মালিকের নামও আব্দুস সাত্তার।
