তাসনিম চোখ মুখ মুছতে মুছতে বলল, আব্বকে কোন মুখে এসব কথা জানাব? হাদিসে পড়েছি, “আল্লাহ যার সঙ্গে জোড়া করে পয়দা করেছেন, তার সঙ্গে বিয়ে হয়।” কাজের বুয়ার কথা সত্য হোক, আর মিথ্যে হোক, আমি হাদিসের বাণী মোতাবেক ধৈর্য ধরব। দেখব, আল্লাহ কার সঙ্গে আমাকে জোড়া করে পয়দা করেছেন।
সায়মা খুশী হয়ে বলল, দোয়া করি, আল্লাহ তোকে ধৈর্য ধরার তওফিক দিক।
০৭. সায়মা ফাইন্যাল পরীক্ষা
সায়মা ফাইন্যাল পরীক্ষা নিয়ে দু’মাস ব্যস্ত রইল। এরমধ্যে একদিনও আপুকে আব্দুস সাত্তারের ব্যাপারে কোনো কথা বলে নি। গতকাল পরীক্ষা শেষ হলেও রাতে তাকে কিছু বলে নি। আজ সকালে নাস্তা খাওয়ার পর বলল, তুই কী আব্দুস সাত্তার সাহেবের কোনো খোঁজ টোজ নিয়েছিলি?
তাসনিম খুব রাগের সঙ্গে তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, না।
তুই রেগে যাচ্ছিস কেন আপু? সত্যিই তিনি বিয়ে করেছেন কিনা জানা উচিত ছিল তোর।
দেখ ওর সম্পর্কে আর একটা কথা বলবি না।
তুই ভুল করছিস আপু, বাসার কাজের বুয়ার কথাকে বিশ্বাস করে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা তোর ঠিক হয় নি।
তাসনিম আরো রেগে উঠে বলল, কথাটা যদি সত্য না হবে, তা হলে ওই বা এতদিন ফোন করে নি কেন?
ফোন না করার হয়তো কারণ থাকতে পারে।
তাসনিম বিদ্রুপকণ্ঠে বলল, ফোন না করার যে কারণ থাকতে পারে, তা তো। জানি না। আগে তুই তাকে ফ্রড বলতিস, এখন তার ফরে কেন কথা বলছিস বুঝতে পারছি না। আমার তো মনে হচ্ছে, সে সত্যিই একটা ফ্রড। বড়লোকের ছেলে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। আমার মতো কতো মেয়ের সঙ্গে যে প্রেম করে। বেড়ায়, তার কোনো ঠিক আছে? ওদের মতো ছেলে অনেক মেয়ের সঙ্গে প্রেম করলেও বিয়ে করে মা বাবার পছন্দ মতো মেয়েকে।
সায়মা চিন্তা করল, বেশি কিছু বললে, আপু আরো রেগে যাবে। তার চেয়ে সে গোপনে আব্দুস সাত্তারের খোঁজ খবর নেবে।
দুপুরে খেয়ে এসে রেষ্ট নেওয়ার সময় সায়মা ভাবল, আপু ঘুমিয়ে যাওয়ার পর ড্রইংরুম থেকে আব্দুস সাত্তারের বাসায় ফোন করবে। তাই ঘুমের ভান করে। অনেকক্ষণ শুয়ে রইল। তারপর আপু ঘুমিয়ে গেছে বুঝতে পেরে খাট থেকে নেমে। দরজার বাইরে এসেছে, এমন সময় ফোন বেজে উঠতে ফিরে আসতে লাগল।
সায়মা আসার আগেই তাসনিমের ঘুম ভেঙে গেল। হাত বাড়িয়ে রিসিভার কানের কাছে নিতে আব্দুস সাত্তারের গলা শুনতে পেল “আসসালামু আলায়কুম।”
তাসনিম ধড়ফড় করে উঠে বসল। তখন তার হার্টবিট অনেক বেড়ে গেল। সালামের উত্তর দিতে পারল না; রাগে ফুলতে লাগল।
কী হল তাসনিম? চুপ করে আছ কেন? জান না, হাদিসে আছে, “সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজীব?” না দিলে গুনাহ হবে। তা ছাড়া তোমার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য পাগল হয়ে আছি। প্লীজ, কথা বল।
তাসনিম কর্কশ কণ্ঠে বলল, একজন প্রতারক, ছোটলোক, ইতরের মুখে হাদিসের পবিত্র বাণী শুনতে চাই না।
আব্দুস সাত্তার খুব আশ্চর্য হয়ে আহতকণ্ঠে বলল, এ তুমি কী বলছ তাসনিমঃ আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
একজন ফ্রড ও বেঈমানের মুখে আমার নামও শুনতে চাই না। আমি তোমাকে ঘৃণা করি বলে রিসিভার রেখে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
সায়মা এতক্ষণ পাশে দাঁড়িয়েছিল। বুঝতে পারল, আবদুস সাত্তার ফোন করেছেন। আপুর কথা শুনে সেও খুব আশ্চর্য হল। তাড়াড়াড়ি রিসিভার তুলে কয়েকবার হ্যালো হ্যালো করে যখন কোনো সাড়া পেল না তখন রিসিভার রেখে বলল, তার সম্পর্কে কিছু না জেনেই এসব কথা বলা তোর মোটেই উচিত হয়। নি।
কাঁদার জন্য তাসনিম কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। তারপর সামলে নিয়ে ভিজে গলায় বলল, তুই আমার মনের অবস্থা যদি জানতিস, তা হলে উচিত অনুচিতের কথা বলতিস না। তুই এখান থেকে যা, আমাকে একটু একা থাকতে দে। তারপর দুহাতে মুখ ঢেকে আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
সায়মা চুপচাপ বেরিয়ে এসে ড্রইংরুম থেকে আব্দুস সাত্তারের বাসায় ফোন করল। কিন্তু তাদের ফোন খারাপ, তাই রিং বাজল না। হঠাৎ সায়মার মাথায়। একটা বুদ্ধি এল। ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে ড্রাইভারের কাছে গিয়ে তাকে কিছু ইনস্ট্রাকসান দিয়ে গাড়ি নিয়ে আব্দুস সাত্তারের বাসায় পাঠাল।
প্রায় এক ঘণ্টা পর ড্রাইভার ফিরে এসে বলল, তাকে দারোয়ান গেটের ভিতরে ঢুকতে দিলেও বাসায় যেতে দেয় নি। তার কাছে জেনেছে, প্রায় দু’মাস আগে সাহেব এ্যাকসিডেন্ট করে দেশের হাসপাতালে ছিলেন। একটা পা ভেঙে গেছে। সেখানে প্লাস্টার করে দিয়েছিল। ইনফেকসান হয়ে গেছে। তাই কাল ঢাকায় নিয়ে এসে ইবনেসিনা ক্লিনিকে কাল রাতেই অপারেশন করে আবার প্লস্টার করে দিয়েছে। ডাক্তাররা বলেছেন, আর দু’চার দিন দেরি হলে পুরো পাটা কেটে বাদ দিতে হত। আজ দুপুরের দিকে জ্ঞান ফিরেছে। বাসার সবাই সেখানে আছে। তাই দারোয়ান বাসায় যেতে দেয় নি।
সায়মা বলল, সাহেব বিয়ে করেছেন কিনা জিজ্ঞেস করেন নি?
সাহেবের সম্পর্কে এইসব জানার পর বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে না ভেবে করি নি।
সায়মা চিন্তা করল, বিয়ে করলে আব্দুস সাত্তার কিছুতেই আপুকে ফোন করতেন না। তার এ্যাকসিডেন্টের কথা আপুকে বললে বিশ্বাস তো করবেই না, বরং উল্টো পাল্টা অনেক প্রশ্ন করবে। তার চেয়ে তাকে নিয়ে ক্লিনিকে গেলেই সবকিছু জানা যাবে।
