তাসনিম তার দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসতে লাগল।
.
রাত বারটার সময় সায়মা ঘুমাতে এসে আপুকে বই পড়তে দেখে জিজ্ঞেস করল, ঘুমাবি, না আরো পড়বি?
তাসনিম টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে বলল, তুই বড় লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়, বইটা শেষ করে ঘুমাব।
সায়মা জানে আপু আব্দুস সাত্তারের ফোনের অপেক্ষায় প্রতিদিন রাত সাড়ে বারটা একটা পর্যন্ত জেগে বই পড়ে। সে কথা বললে বকা খেতে হবে ভেবে শুধু একটু মৃদু হেসে ঘুমিয়ে পড়ল।
পড়তে পড়তে হঠাৎ তাসনিমের মনে হল, রিং বাজলে সায়মা জেগে যেতে পারে। তাই বারটা বিশে সে আব্দুস সাত্তারকে ফোন করল।
আব্দুস সাত্তার আজ সাড়ে দশটার সময় ফোন করতে চেয়েছিল, সায়মা জেগে আছে ভেবে করে নি। সাড়ে বারটা বাজার অপেক্ষায় সেও একটা বই পড়ছিল। ফোন বেজে উঠতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবল, এ সময় আবার কে ফোন করল? বিরক্ত হয়ে রিসিভার তুলে সালাম দেওয়ার আগেই তাসনিমকে সালাম দিতে শুনে বিরক্ত ভাবটা কেটে গেল। উৎফুল্ল কণ্ঠে সালামের উত্তর দিয়ে বলল, কী ব্যাপার? আজ সময়ের আগেই তুমি ফোন করলে যে? আমি তো মনে করেছিলাম, তোমাদের বাসায় যাই নি বলে রাগ করে আমার ফোন রিসিভ করবে না।
রাগ অবশ্য ঠিকই করেছিলাম, তোমার প্রেম পানি ঢেলে ঠাণ্ডা করে দিয়েছে।
শুনে খুশী হলাম।
আমিও খুশী হয়েছি।
তোমার খুশীর কারণটা তো বুঝলাম না।
বারে, তোমার খুশীতে আমি খুশী হব না?
সত্যি, তোমার কোনো জওয়াব নেই।
তোমারও কোনো জওয়াব নেই।
লা জওয়াবের মতো আমি কিছু করেছি কী?
একটা গ্রাম্য ছেলে হয়ে একজন মন্ত্রীর মেয়েকে প্রেমের বানে ঘায়েল করা কম কৃতিত্বের কথা নয়।
এই কথার উত্তর দিতে না পেরে আব্দুস সাত্তার চুপ করে রইল।
কিছু বলছ না যে?
প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্য আব্দুস সাত্তার বলল, আমার আগেই তুমি ফোন করলে কেন বলবে না?
কিছুক্ষণ আগে সায়মা ঘুমিয়েছে। ভাবলাম, রিং হলে জেগে যাবে। তাই করলাম। কী করছিলে?
একসঙ্গে দু’টো কাজ করছিলাম।
তাসনিম হেসে উঠে বলল, একসঙ্গে আবার দু’টো কাজ করা যায় বুঝি?
তা জানি না। তবে আমি বই পড়ছিলাম আর তোমাকে ফোন করব বলে মাঝে মাঝে ঘড়িতে সময় দেখছিলাম।
তাসনিম হাসতে হাসতেই বলল, এটা আবার দু’টো কাজ হল বুঝি? বোকার মতো কথা বলছ কেন?
প্রেমে পড়লে সবারই বুদ্ধি লোপ পায়, তাই বোকামী করে। তুমিও কর।
ওমা, আমি আবার কি বোকামী করলাম?
আমি তোমার প্রেমে পড়ে তোমাদের সব খবর নিয়েছি। কিন্তু তুমি আমার কিছুই নাও নি। বুদ্ধিমতী মেয়েরা প্রেমিকের সঙ্গে প্রথম আলাপের সময়েই তার সবকিছু জেনে নেয়।
কথাটা ঠিক বল নি। অনেক আগেই জানতে চেয়েছি, তুমি বল নি। আজ অবশ্য বাসা থেকে বেরোবার সময় তোমার সবকিছু জানার কথা ভেবেছিলাম, তোমার কথা শুনতে শুনতে ভুলে গেছি। আর এজন্য দায়ী তোমার প্রেম। এখন তাড়াতাড়ি পূর্ণ বায়োডাটা বলে ফেল।
তাড়াতাড়ি কেন?
শুধু তোমার প্রেমে নয়, কথাতেও যাদু আছে। ফট করে এমন কথা বলবে, যা শুনে আমি আবার ভুলে যাব।
আব্দুস সাত্তার হেসে উঠে বলল, তাই নাকি?
জ্বি তাই। ফোনে তোমার কথার যাদুতেই তো প্রেমে পড়ে গেলাম।
আব্দুস সাত্তার হাসতে হাসতেই বলল, যাদু কি জিনিস জান?
দেখেছ? বায়োডাটা না বলে কেমন অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছ? যাদু সম্পর্কে কিছু জানি আর না জানি, তোমার জানার দরকার নেই। যা জানতে চেয়েছি বল।
আমি গ্রামের ছেলে তা তো আগেই বলেছি, আমার আব্বা গ্রামের বেসরকারী কলেজে শিক্ষকতা করেন। জমি-জায়গা, আগান-বাগান ও পুকুর ডোবা কিছু আছে। মোটামুটি স্বচ্ছল অবস্থা। আমরা তিন বোন, দুই ভাই। দু’বোন সবার বড়। তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। তারপর একভাই। তিনি বিয়ে করার আগে মারা গেছেন। ঐ ভায়ের পরে আমি। আমার পরে উম্মে কুলসুম। ওর আকদ হয়েছে। আমার এখনো বিয়ে হয় নি। এতেই হবে? না আরো কিছু লাগবে?
তাসনিম হেসে উঠে বলল, বাবার নাম, গ্রামের নাম ও জেলার নাম লাগবে।
ওগুলো পরে বলব।
ওগুলো না হলে বায়োডাটা সম্পূর্ণ হয় না। আব্বকে জানাব কী করে?
যখন জানাবে তখন বলব।
তাসনিম আবার হেসে উঠে বলল, তুমি তো আচ্ছা পাগল। তখন তোমাকে পাব কোথায়?
কী বললে? আমি পাগল?
কথা প্রসঙ্গে হঠাৎ বলে ফেলেছি। তাই বলে সত্যি সত্যি তুমি তো আর পাগল না।
তা হলে কথা প্রসঙ্গে আমিও তোমাকে পাগলি বলব?
আপত্তি নেই।
সায়মা নিশ্চিত ছিল, আব্দুস সাত্তার আজও ফোন করবেন। তাই আপু তার সঙ্গে কি কথা বলে শোনার জন্য এতক্ষণ ঘুমের ভান করে জেগে ছিল। এবার খাট থেকে নেমে নিঃশব্দে পিছন থেকে এসে তাসনিম বুঝে উঠার আগেই চিলের মতো ছোঁ মেরে তার হাত থেকে রিসিভার কেড়ে নিয়ে বলল, এই যে পাগল সাহেব, রাত কত হয়েছে খেয়াল করেছেন? পাগল পাগলির পাগলামীর কারণে অন্য একজনের যে ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে, তাও খেয়াল নেই বুঝি? আর কোনো দিন এতক্ষণ ধরে পাগলামী করবেন না। মানুষে ঠিকই বলে, “পাগলরাই প্রেম করে।” রিসিভার রেখে দিন। নচেৎ আল্লুকে বলে প্রেম করার মজা বুঝিয়ে দেব।
সরি, তোমার, সরি আপনার ঘুম পাতলা জানলে এত দেরি করতাম না। ক্ষমা করে দিন।
বার বার সরি বলার দরকার নেই। আমাকে তুমি করেই বলবেন। রিসিভার রেখে দিন, তারপর ক্ষমা করার কথা চিন্তা করব।
