বাসার কিছুটা দূরে এসে গাড়ি থামাতে দেখে তাসনিম বলল, বাসা চেন মনে হচ্ছে, এখানে থামলে কেন?
আব্দুস সাত্তার গাড়ি থেকে নেমে বলল, এবার তুমি যাও।
তাসনিম অবাক হয়ে বলল, সে কী? আমাদের বাসায় যাবে না?
আজ নয়, অন্য দিন।
কেন? আজ গেলে কী হয়?
কিছু হয় না, তবু যেতে পারছি না। প্লীজ, জিদ করো না। তোমার কথা রাখতে পারলে খুব কষ্ট পাব।
না গেলে আমিও যে খুব কষ্ট পাব, সে কথা মনে হচ্ছে না?
হচ্ছে। তবু যেতে পারছি না। বললাম না, অন্য দিন যাব?
আজ না যাওয়ার কারণ নিশ্চয় আছে?
আছে বলেই তো যেতে পারছি না।
কারণটা বল।
এখন কারণটাও বলতে পারব না।
ভালো হবে না বলছি।
খারাপ হলেও আমি নিরুপায়।
তাসনিম আহত স্বরে বলল, ঠিক আছে, তুমি স্বেচ্ছায় না আসা পর্যন্ত আর কখনও আসার জন্য তোমাকে বলব না। এই কথা বলে গাড়ি ছেড়ে দিল।
আব্দুস সাত্তার তার গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। অদৃশ্য হয়ে যেতে একটা স্কুটার নিয়ে বাসায় ফিরল।
————–
(১) বর্ণনায় : হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) মিশকাত
(২) সূরা-নূর, ৩১নং আয়াত, পারা-১৮
০৫. বাসায় ঢুকে তাসনিম চিন্তা করল
বাসায় ঢুকে তাসনিম চিন্তা করল, আংটিটা খুলে লুকিয়ে রাখাই ভালো। সায়মা দেখতে পেলে হাজার প্রশ্ন করে অস্থির করে তুলবে।
সায়মা কলেজে গিয়েছিল। আড়াইটায় ফিরে তাসনিমকে বলল, এবার বল, কোথায় গিয়েছিলি।
এক বান্ধবীর বাসায় বলতে গিয়েও থেমে গেল। ভাবল, একটা মিথ্যে বললে, তাকে সাতটা মিথ্যে দিয়েও কভার দেওয়া যায় না। বলল, একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম।
সেই একজনটা কে? অত সকালে তার সঙ্গে দেখা করতেই বা গেলি কেন?
ওসব আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার, বলা যাবে না।
কিন্তু তোর অনেক কিছু ব্যক্তিগত ব্যাপার আমাকে বলিস, এটাই বা বলবি না। কেন?
অনেক কিছু বললেও এটা বলা যাবে না।
সায়মা ক্রমশঃ রেগে যাচ্ছিল। তবু সংযত হয়ে বলল, কিন্তু যাওয়ার সময় তো বলেছিলি, ফিরে এসে বলবি?
হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
বেশি রেগে গেলে সায়মা কেঁদে ফেলে। এখনও তার কান্না পেল। বলল, ঠিক আছে, তোর কোনো ব্যাপারেই আমি আর কোনো দিন নাক গলাব না। কথা শেষ করে চলে যেতে লাগল।
তাসনিম তাকে কাঁদাবার জন্য এতক্ষণ ঘটনাটা বলে নি। কান্নাভেজা কণ্ঠ শুনে বলল, রাগ করে চলে যাচ্ছিস কেন? শোন।
সায়মা দাঁড়িয়ে পড়লেও ঘুরল না। বলল, কী বলবি বল।
বিকেলে কোথায় যেন নিয়ে যাবি বলেছিলি, নিয়ে যাবি তো? না আমার উপর রাগ করে নিয়ে যাবি না?
আপুর উপর রাগের চেয়ে অভিমানই বেশি হয়েছিল সায়মার। অভিমানের চোটে কান্না পাচ্ছিল। কিছু বলতে গেলে কেঁদে ফেলবে। তাই চুপ করে রইল।
রূপা তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলল, যেখানে নিয়ে যাবি বলেছিলি সেখানে যাওয়ার আর দরকার নেই। আমি সকালে আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তোকে বললে কলেজ কামাই করে যেতে চাইতিস। তাই বলি। নি। তোর অনুমান ঠিক, আসিফ সাহেবই আব্দুস সাত্তার। তোর কাছে হেরে গেলাম। একটু আগে যা বললাম, তোকে রাগাবার জন্য বলেছি।
সায়মা দ্রুত ঘুরে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, সত্যি বলছিস আপু? ততক্ষণে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
তাসনিম তাকে পাশে বসিয়ে চোখ মুছে দিতে দিতে বলল, হারে সত্যি। এত সামান্য ব্যাপারে আমার উপর রাগ অভিমান করে কেঁদে ফেললি, বিয়ের পর যখন আমি শ্বশুরবাড়ি চলে যাব তখন কার উপর রাগ অভিমান করবি?
সেজেগুজে বেরোতে দেখেই বুঝেছিলাম, তুই আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিস। আজ তোদের প্রথম সাক্ষাৎ, যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে জিদ করি নি। নচেৎ তোর নিষেধ অমান্য করে যেতাম। জিজ্ঞেস করল, ওঁকে নিশ্চয় তোর পছন্দ হয়েছে?
তোর কী মনে হয়?
একশ পার্সেন্ট হয়েছে। তারপর হেসে উঠে বলল, এই আপু বল না, তোর কত পার্সেন্ট হয়েছে?
আমারও একশ পার্সেন্ট হয়েছে বলে তাসনিম লজ্জা পেয়ে বলল, যা ভাগ। বড় বোনের এসব কথা জিজ্ঞেস করতে তোর লজ্জা করল না?
আহা আমার বড় রে? দু’আড়াই বছরের বড় আবার বড়? তা ছাড়া বড় বোন। হয়ে ছোট বোনের কাছে এসব কথা বলতে তোর যখন লজ্জা করে নি তখন আমার করবে কেন?
তুই দিন দিন বড় ফাজিল হয়ে যাচ্ছিস। খেয়েছিস? নামায পড়েছিস? না ওসব না করেই আমার সঙ্গে ফাজলামী করতে এসেছিস?
ওসব সেরেই তোমার কাছে এসেছি। এই আপু, আসিফ সাহেব নিজেই আব্দুস সাত্তার হয়ে ধরা দিলেন? না তুই কথার প্যাচে ফেলে ধরা দিতে বাধ্য করেছিস?
ও নিজেই ধরা দিল।
ওরে বাবা, প্রথম সাক্ষাতেই তুমি?
তাসনিম হেসে উঠে বলল, সাক্ষাৎ প্রথম হলেও সম্পর্কটা তো প্রায় দু’বছরের।
তা কি সব কথাবার্তা হল, একটু বল না শুনি।
আমার ডাক নাম রূপা বাদ দিতে বলেছে। তার বদলে তাসনিম দিয়েছে এবং আজ থেকে বাসার সবাই যেন তাসনিম নামে ডাকে, সে কথাও বলেছে।
ওমা, তাই নাকি? আর কি কি বলেছেন, বল না আপু?
দেব এক থাপ্পড়, যা এখান থেকে।
সায়মা একটু দূরে সরে দাঁড়িয়ে বলল, আমি কি সব শুনতে চাচ্ছি? একটু আধটু বললে কী হয়? ভবিষ্যতে আমারও কাজে লাগতে পারে।
তবে রে দাঁড়া তোর ফাজলামী বের করছি বলে তাকে তাসনিম হাত বাড়িয়ে। ধরতে গেল।
সায়মা ছুটে পালাবার সময় বলল, আবার যেদিন ওঁর সঙ্গে দেখা করতে যাবি, সেদিন না নিয়ে গেলে আব্রু আম্মুকে বলব, তুই একটা বাজে ছেলের প্রেমে পড়েছিস।
