আর একটু দাঁড়ান সাত্তার ভাই, ওঁর কাছেও মাফ চাইব। সেদিন যদি ওঁর পরিচয় জানতাম তা হলে…….। কথাটা আর শেষ করতে না পেরে মুখ নিচু করে। নিল।
তাসনিম বুঝতে পারল, সে যে মন্ত্রীর মেয়ে ছেলেটা জেনে গেছে। বলল, আমাদের দু’বোনের সঙ্গে যা কিছু করেছেন, তাতে কিছু মনে করি নি। আব্দুস সাত্তার সাহেবকে গুলি করার পর আপনাকে খুব খারাপ ছেলে ভেবেছিলাম। এখন আপনার কথা শুনে খুব ভালো লাগল। আমিও দোয়া করছি, “আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তওফিক দিক।” তারপর আব্দুস সাত্তারের দিকে তাকিয়ে বলল, চল।
আব্দুস সাত্তার মহসীনকে জিজ্ঞেস করল, আপনি আমার পুরো নাম জানেন?
জানি, আব্দুস সাত্তার।
ভবিষ্যতে পুরো নাম ধরে বলবেন। তারপর কারণটা বুঝিয়ে দিয়ে সালাম বিনিময় করে তাসনিমকে বলল, চল।
গাড়ির কাছে এসে তাসনিম বলল, তুমি গাড়ি নিয়ে আস নি?
না, তুমি ফিরিয়ে দিলে নির্ঘাত এ্যাকসিডেন্ট করতাম, তাই গাড়ি নিয়ে আসি নি।
রোযা রাখার কথা শুনে তাসনিম তার প্রতি আব্দুস সাত্তারের ভালবাসার গভীরতা যতটা না অনুভব করেছিল, এখন গাড়ি নিয়ে না আসার কারণ শুনে আরো বেশি অনুভব করল। কোনো কথা বলতে পারল না। ছলছল চোখে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে তার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আব্দুস সাত্তার বলল, তুমি জান না তাসনিম, আমি তোমাকে কত ভালবাসি। তারপর নাও এবার গাড়িতে ওঠ দেখি বলে বলল, আমি কিন্তু ড্রাইভিং করব।
তাসনিম কিছু বলল না। চোখ মুছে গাড়ির চাবি তার হাতে দিল।
গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার পর বলল, পার্কের ঘটনাটা আমাকে খুব অবাক করেছে।
আব্দুস সাত্তার বলল, ছেলেটা হয়তো লীডারের কাছে তোমার পরিচয় পেয়েছে। আর আমাকে তোমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে দেখে ভেবেছে, আমি হয়তো তোমাদের কাছাকাছি একজন।
তাসনিম আব্দুস সাত্তারের ভালবাসার গভীরতার কথা চিন্তা করছিল। তাই আব্দুস সাত্তার যে নিজের পরিচয় এড়িয়ে গেল, তা বুঝতে পারল না।
বায়তুল মোকাররমে এসে আব্দুস সাত্তার গাড়ি পার্ক করে তাসনিমকে নিয়ে আমিন জুয়েলার্সে ঢুকল।
আব্দুস সাত্তারের ফুফা ও ফুফু আমিন জুয়েলার্সের বড় খদ্দের। স্বামী মারা। যাওয়ার পর রাইসা বেগম আব্দুস সাত্তারকে নিয়ে আসেন। তাই আব্দুস সাত্তারকে ম্যানেজার ও দোকানের অন্যান্য সবাই চেনে। একজন অপূর্ব সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে ঢুকতে দেখে ম্যানেজার সালাম দিয়ে বলল, আসুন আসুন, অনেকদিন পরে এলেন, কেমন আছেন? আপনার ফুফুআম্মা ভালো আছেন?
আব্দুস সাত্তার সালামের উত্তর দিয়ে বলল, আলহামদু লিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে আমরা ভালো আছি। তা আপনারা কেমন আছেন?
জ্বি ভালো, বলে ম্যানেজার হাসিমুখে বললেন, সঙ্গে নিশ্চয় ভাবি? বিয়ের দাওয়াত না পেলেও আশা করি, অলিমার দাওয়াত পাব?
ম্যানেজারের কথা শুনে তাসনিমের মুখে কেউ যেন কয়েক মুঠো আবির মাখিয়ে দিল। লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল।
তার দিকে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে আব্দুস সাত্তার বলল, আন্দাজে ঢিল ছোড়া উচিত নয় ভাই। ঢিলটা বেজায়গায় লেগে গেলে কী হত বলুন তো? অবশ্য কাছাকাছি পৌঁছেছে। শুনুন, আমি আপনাদের না জানিয়ে বিয়ে করব এটা ভাবলেন কী করে? আন্দাজে ঢিল মেরে শুধু শুধু এই বেচারীকে লজ্জা দিচ্ছেন। ওসব কথা বাদ দিয়ে ইনার বাম হাতের মধ্যমার মাপের একটা হীরের আংটি দিন। তৈরি না থাকলে আঙ্গুলের মাপটা নিন। দু’একদিনের মধ্যে তৈরি করে দেবেন।
ম্যানেজার বললেন, কয়েকটা তৈরি আছে দেখাচ্ছি, মাপ মতো হয় কিনা দেখুন। আশা করি পছন্দ হবে।
আংটি পছন্দ করে আব্দুস সাত্তার চেকে পেমেন্ট দিল।
ততক্ষণে কেক ও কো-কো এসে গেল। ম্যানেজার বললেন, নিন ভাই।
আব্দুস সাত্তার ইশারা করে তাসনিমকে খেতে বলল, সে মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল।
আব্দুস সাত্তার ম্যানেজারকে বলল, মাফ করবেন, আমরা আজ কিছুই খেতে পারব না। অন্য দিন খাব বলে তাসনিমকে নিয়ে বেরিয়ে এল।
তাসনিম বুঝতে পারল, অখ্যাত পাড়াগাঁয়ের ছেলে বলে পরিচয় দিলেও আব্দুস সাত্তার খুব ধনী ঘরের ছেলে।
দোকান থেকে বেরিয়ে আব্দুস সাত্তার বলল, চল, তোমাকে কিছু খাওয়াই। সেই কোন সকালে নাস্তা খেয়েছিলে, নিশ্চয় খিদে পেয়েছে। দোকানেও কিছু খেলে না?
তুমি রোযা রেখে রয়েছ, আর তোমার সামনে আমি খাব, এটা ভাবলে কী করে? যতই খিদে পাক, তোমার সঙ্গে থাকলে সারাদিন না খেয়ে থাকতে পারব। অন্য দিন আপত্তি করব না। আজ চল, ফেরা যাক। তারপর গাড়িতে উঠে বলল, এত দামি উপহার না দিলে কী হত না?
পার্কে কি বলেছিলাম মনে নেই বুঝি? তারপরও বলছি, আমি যদি সারা পৃথিবীর বাদশাহ হতাম, তা হলে এমন খুশীর দিনে বাদশাহীটাই তোমাকে উপহার দিয়ে দিতাম। তোমার বাম হাতটা দাও পরিয়ে দিই।
আব্দুস সাত্তার আংটি পরিয়ে দেওয়ার পর তাসনিম বলল, তোমার এই উপহার আমার কাছে বাদশাহী তক্তের চেয়ে লক্ষগুণ শ্রেষ্ঠ। আমারও মন চাচ্ছে, এই মুহূর্তে তোমাকে কিছু দেওয়ার; কিন্তু আমার কাছে যে কিছুই নেই। তারপর তার দু’টো। হাত ধরে চুমো খেয়ে গালে চেপে রেখে মুখের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল।
আব্দুস সাত্তার আনন্দে আপ্লুত হয়ে বলল, তুমি যা দিলে, তার তুলনায় আমারটা অতি নগণ্য। তোমার প্রেমের এই প্রথম উপহার আমার কাছে লক্ষ কোটি টাকার উপহারের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। তারপর হাত দুটো টেনে। স্টিয়ারিং-এ হুইল ধরে বলল, চল, তোমাকে পৌঁছে দিই।
