তাসনিম বলল, তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দাও নি।
আব্দুস সাত্তার মৃদু হেসে বলল, কেন নিজেকে তোমার কাছ থেকে দু’বছর আড়াল করে রেখেছিলাম, তাই জানতে চাচ্ছ, তাই না?
তাসনিমও মৃদু হেসে বলল, জ্বি।
এর দু’টো কারণ। প্রথম কারণ হল, প্রায় তিন বছর আগে তোমাকে প্রথম গ্রীন সুপার মার্কেটে দেখে মুগ্ধ হই। তারপর কিভাবে দ্বিতীয়বার দেখা হল, কিভাবে তার বায়োডাটা ও ফোন নাম্বার জোগাড় করল, বায়োডাটা জানার পর তার মনের অবস্থা এবং কিভাবে তার সঙ্গে ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে তার মন জয় করল, সবকিছু বলল।
আমার বায়োডাটা জেনে তুমি হতাশ হয়েছিলে কেন? আমি কী এতই দুর্লভ।
আসল কারণটা না বলে আব্দুস সাত্তার বলল, আমি এক অখ্যাত গ্রামের ছেলে। একজন মন্ত্রীর মেয়েকে পাওয়া কুঁড়ে ঘরে ছেড়া কাঁথায় শুয়ে স্বপ্নে রাজকন্যাকে বিয়ে করার মতো নয় কী?
তোমার কথা অবশ্য ঠিক; কিন্তু এটা বোধহয় জান না, এমন অনেক রাজকন্যা ছিল এবং এখনও অনেক ধনীর দুলালী আছে, যারা দীন হীন ছেলেকে ভালবেসে রাজপ্রাসাদ ছাড়তে এতটুকু দ্বিধা করে নি। তাদের মধ্যে যারা রাজপ্রাসাদ ছাড়ার সুযোগ পাই নি, তারা ভালবাসার পাত্রকে না পাওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে।
তোমার কথাও ঠিক; কিন্তু তারা দুজন দুজনকে গভীরভাবে ভালবাসত। আমার ক্ষেত্রে তো তাদের মতো ছিল না। আমি তোমাকে পাগলের মতো ভালবাসলেও তুমি গ্রাম্য একটা নগণ্য ছেলেকে ভালবাসবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহের ব্যাপার নয় কী? তাই তোমার বায়োডাটা জানার পর খুব মুষড়ে পড়লাম। দিন দিন। আমার শরীর ভাঙতে লাগল। ফুফু আম্মা আমার অবস্থা দেখে একদিন বললেন, রাত জেগে পড়ে পড়ে তোর শরীর ভেঙে যাচ্ছে। কয়েকদিন গ্রামের বাড়িতে থেকে আয়। আমিও ভাবলাম, গ্রামের পরিবেশ হয়তো আমাকে কিছুটা শান্তি দিতে। পারবে এবং তোমার স্মৃতিও ভুলিয়ে দিতে পারবে। যদি তাই হয়, তা হলে আর ঢাকায় ফিরব না। এইসব ভেবে বাড়িতে গেলাম। আমাকে দেখে আম্মা বললেন, তোর অবস্থা একি হয়েছে? নিশ্চয় কোনো কঠিন অসুখ বাধিয়েছিস? বললাম, রাত জেগে পড়ে পরীক্ষা দিয়েছি। কয়েকদিন তোমার আদর পেলে ঠিক হয়ে যাব। বেশ কিছুদিন থাকলাম। শরীরের কিছু উন্নতি হলেও তোমার স্মৃতি অক্টোপাসের মতো আমার মনকে জড়িয়েই রইল। তোমাকে এক নজর দেখার জন্য মন পাগল হয়ে। উঠল। ঢাকায় ফিরে এসে বন্ধু আসিফকে সবকিছু বললাম, ও তোমাকে ভুলে যাওয়ার জন্য জোরালো যুক্তি দেখাল। ওর যুক্তিগুলো ভালো ছিল। তাই প্রতিবাদ করি নি। কিন্তু মন কিছুতেই বাগ মানল না। এক মুহূর্তের জন্য তোমাকে ভুলতে পারলাম না। একদিন রাত দশটার সময় তোমার কথা চিন্তা করতে করতে হঠাৎ তোমাকে ফোন করার প্রচণ্ড তাগিদ অনুভব করলাম। আসিফ এর বোনের কাছ। থেকে তোমার বায়োডাটা জানার সময় ফোন নাম্বারও জেনেছিলাম। অনেক আগে জেনে থাকলেও মেধার কারণে মনে ছিল। তোমার আব্ব ফোন ধরলে কি বলবে ভেবে বেশ ভয় ভয় করলেও তখনই ফোন করি। আজও করে চলেছি। কবে যে শেষ হবে অথবা আদৌ শেষ হবে কিনা তা আল্লাহ জানেন। তারপর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, একতরফা ভালবাসার যে কি যন্ত্রণা, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ জানে না।
তার কথা শুনতে শুনতে তাসনিমার চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠেছিল। শেষের দিকে কথা ও দীর্ঘনিশ্বাস তাসনিমার কলজেটাকে কেউ যেন ছুরি দিয়ে চিরে। দিল। চোখ মুছে করুণকণ্ঠে বলল, প্লীজ, আমার জন্যে আর এতটুকু দুশ্চিন্তা করো না। একটু আগে কথা দিয়েছি, কোনো কারণেই তোমাকে দূরে ঠেলে দেব না। এখন আবার বলছি, তোমার জন্য সবকিছু ত্যাগ করব, তবু তোমাকে ত্যাগ করব না। শুধু মন্ত্রীর মেয়ে নয়, যদি প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে অথবা কোনো রাজা বাদশার মেয়েও হতাম, তবু এই কথা বলতাম।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে আব্দুস সাত্তার বলল, তোমার কথা শুনে এত শান্তি পেলাম, যা তিন বছরের দুঃখ ও যন্ত্রণা সর্ষে পরিমাণ মনে হচ্ছে। আর কী মনে হচ্ছে জান, সারা পৃথিবীর বাদশাহী পেয়েও বুঝি এত সুখ অনুভব করতাম না। তারপর বলল, কেউ কাউকে আনন্দের বা সুখের খবর শোনালে তাকে পুরস্কার দেয়। এখন আমারও তোমাকে কিছু দিতে মন চাইছে। চল মার্কেটে যাই।
তাসনিম আনন্দ বিহ্বল কণ্ঠে বলল, কাল দিলে হয় না?
না তাসনিম না, আজই কিছু না দিলে মনে শান্তি পাব না। এমন সময় সংসদ ভবন চত্বরে যে ছেলে তিনটি রূপা ও সায়মাকে টিজ করেছিল, তাদের আসতে দেখে তাসনিম ভয়ার্ত গলায় বলল, সেদিনের মতো আজ আবার কিছু করবে না তো?
আব্দুস সাত্তার বলল, মনে হচ্ছে তুমি ভয় পেয়েছ? ওদের লীডারকে আমি চিনি। মনে হয় কিছু করবে না। তবু যদি করে, তা হলে উপযুক্ত জওয়াব পাবে। চল ওঠা যাক বলে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাসনিম দাঁড়াবার পর দু’জনে পাশাপাশি হেঁটে গেটের দিকে আসতে লাগল।
ওদের সামনা-সামনি এসে আব্দুস সাত্তার সালাম দিয়ে বলল, আপনারা ভালো আছেন ভাই?
সবার আগে মহসিন সালামের উত্তর দিয়ে বলল, জ্বি, ভালো। তারপর বলল, সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমি খুব লজ্জিত ও দুঃখিত। প্লীজ, মাফ করে দিন।
আব্দুস সাত্তার তাদের সবার সঙ্গে হাত মুসাফাহা করে বলল, মাফ চাওয়ার দরকার নেই। আপনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন জেনে খুব খুশী হয়েছি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভুল বোঝার ও সঠিক পথে চলার তওফিক দিক।
