আমি নাস্তা খেয়েই বেরিয়েছি। আমার তো মনে হচ্ছে, তুমিই না খেয়ে বেরিয়েছ।
তোমার অনুমান ঠিক। আল্লাহ যেন আমাকে অপমানিত না করেন, সেজন্য আজ নফল রোযা রেখেছি।
তার কথা শুনে রূপাও আনন্দে কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারল না। তারপর ছলছল চোখে বলল, তুমি আমাকে এত ভালবাস?
তোমাকে আমি কতটা ভালবাসি, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। কথা দাও, কোনো কারণেই আমাকে দূরে সরিয়ে দেবে না?
দিলাম। এবার তুমিও দাও।
আমিও দিলাম।
এতদিন কেন আড়াল হয়েছিলে, সরি ছিলেন বলবেন?
আব্দুস সাত্তার হেসে উঠে বলল, সরি বলার আর দরকার নেই। প্রথম দিকে অল্পক্ষণ আপনি করে বললেও এতক্ষণ দুজনেই তুমি করেই বলেছি।
রূপা লজ্জারাঙা হয়ে বলল, ওমা, তাই নাকী?
তাই আর হবে না? প্রায় দু’বছর যে স্রোত বইছিল আজ মিলিত হয়ে একাকার হয়ে গেছে। তাই মনের অজান্তে দু’জনেই তুমি হয়ে গেছি। আর এটাই চিরাচরিত নিয়ম, তুমি লজ্জা পাচ্ছ কেন? আচ্ছা, তোমার ভালো নাম যাবিন তাসনিম, তাই না?
রূপা মৃদু হেসে বলল, জেনেও জিজ্ঞেস করছ কেন?
অন্যের মুখে দু’বছর আগে জেনেছিলাম, মনে আছে কিনা ঝালাই করে নিলাম।
তোমার মেমোরি খুব প্রখর। সঠিক মনে রেখেছ। অনার্সে নিশ্চয়ই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলে?
তোমার অনুমান ঠিক।
মাস্টার্সের রেজাল্টও নিশ্চয়ই তাই হবে?
আশা তো করি, বাকি আল্লাহর মর্জি। এবার তোমারটা বল।
আমার মেমোরি তোমার মতো অত প্রখর নয়। আল্লাহ রাজি থাকলে সেকেন্ড ক্লাস পেতে পারি। তা হঠাৎ নাম জিজ্ঞেস করলে কেন?
নামের অর্থ জান?
হ্যাঁ, বেহেস্তের সোনালী ঝরণা।
রূপা নাম কে রেখেছেন?
আব্বু।
আর আসল নাম?
আম্মুর কাছে শুনেছি, গ্রামে আব্বুর এক বন্ধু ছিলেন, তিনি রেখেছেন। অবশ্য উনি বলার আগে আম্মুও ঐ নামটা সিলেক্ট করেছিলেন।
আব্দুস সাত্তার বুঝতে পারল, তার আব্বই নামটা রেখেছিলেন। বলল, তোমার আম্মু মনে হয়, ধর্ম সম্বন্ধে অনেক জ্ঞানী এবং ধর্মের বিধি নিষেধ মেনে চলেন?
হ্যাঁ, আব্বুও কিছু কিছু মেনে চলেন।
সোনা, রূপা, ধাতুর নাম। তোমার আব্ব ধার্মিক হয়েও কেন যে তোমার ডাক। নাম রূপা রাখলেন বুঝতে পারছি না। তোমার গায়ের রং সোনালী। সোনা রাখলেও না হয় কিছু সামঞ্জস্য হত। যাক গে, আমি তোমাকে তাসনিম বলে ডাকব।
রূপা হাসিমুখে বলল, বেশ তো তাই ডাকবে। এবার আমি একটা কথা বলি?
বল।
তোমাকে আমি শুধু সাত্তার বলে ডাকব।
না, তা ডাকবে না।
কেন?
সাত্তার শব্দের অর্থ জান?
না।
গোপনকারী। আর এটা আল্লাহর গুণবাচক একটা নাম। আল্লাহর এরকম গুণবাচক নাম নিরানব্বইটা অথবা তার চেয়ে বেশি আছে। শুধু আল্লাহর গুণবাচক নাম ধরে ডাকা অথবা রাখা উচিত নয়। রাখলে শেরেকের তুল্য গোনাহ হবে। তাই ঐসব নামের আগে আব্দুল বা আব্দুস শব্দ যোগ করে নাম রাখতে হবে। যেমন—আব্দুস সুবহান, আব্দুল গফুর, আব্বুর রউফ ইত্যাদি। আর নাম রাখার ব্যাপারে মুসলমানের খুব হুশিয়ার হতে হবে। হাদিসে আছে, “রাসুলুল্লাহ (দঃ) বলিয়াছেন, তোমাদের নামের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা উত্তম নাম আব্বুল্লাহ, আব্বুর রহমান। (দু’টো নামেরই অর্থ আল্লাহর দাস)।”(১)
ইসলামী নামসমূহের আংশিক নামে ডাকাও মারাত্মক অন্যায় ও গুনাহর কাজ। যেমন কোনো লোকের নাম আব্বুর রহমান (অর্থাৎ আল্লাহর দাস), তাকে যদি শুধু। “রহমান” নামে ডাকা হয়, তা হলে তাকে আল্লাহ সম্বোধনেই ডাকা হল। আল্লাহর বান্দাকে আল্লাহ সম্বোধনে ডাকা কত জঘন্য অপরাধ ও নাফরমানী, তা চিন্তা করে। দেখ। এরূপ আংশিক নামে যে অন্যকে ডাকবে এবং সে যদি ঐ ডাকে সাড়া দেয়, তা হলে উভয়েই সমান গুনাহগার হবে। বর্তমান যুগে মুসলমানদের মধ্যে অনেকেই চরম বিভ্রান্তি ও গোমরাহীতে নিক্ষিপ্ত হয়ে অধর্ম ও অনাচারে লিপ্ত হয়ে, আধুনিকতার অন্ধমোহে, জেনে না জেনে শিক্ষিত সমাজে ইসলামী, আকীদা ও সাংস্কৃতিকে দুমড়ে মুচড়ে ছেলেমেয়েদের ইসলামী নামের বিপরীতে ডাক নাম রাখতে শুরু করেছে। তাদের দেখাদেখি সর্বস্তরে একরম ডাক নাম রাখা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে ছেলেমেয়েদেরকে কেউ আর আসল নামে ডাকে না। সবাই ডাক নামেই ডাকে। আর ছেলেমেয়েদেরকে কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে, তারা ডাক নামটাই বলে। এটা যে বিদেশী ও বিধর্মীদের চক্রান্ত, তাতে কোনো সন্দেহ। নেই। কিছু কিছু নামের উদাহরণ দিচ্ছি, যেমন—রফিকুল ইসলাম (হিমেল), আব্বুর রহমান (বুলেট), আব্দুল মতিন (রাসেল), আবিদা সুলতানা (চকলেট), নূর মোহাম্মদ (নুরু), ওমর ফারুক (ডালিম), মেহের নিগার (নিপা), ফাহিম ফায়সাল (তারা), রওসনারা বেগম (বেদানা), ফরহাদ আহম্মদ (তনু), তোমার নামটাই দেখ না, যাবিন তাসনিম (রূপা)। আবার অনেক পিতামাতা ভালো নামের সঙ্গে ডাক নাম রাখেন, মন্টু, ঝন্টু, রিন্টু, বিল্লী, বিজলী, উর্মি, সোমা, সাগর, সৈকত, অন্তরা, পলাশ, গোলাপ, জবা, যুঁই, চামেলী, চাঁদ, সূর্য, তারা, তোতা, ময়না, টুটুল, সুন্দরী, তুলি, বুলি, উষা, হাসি, মেঘনা, যমুনা ইত্যাদি। বিবেক সম্পন্ন লোক একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন, এসব পশু, পাখি, নদ, নদী, ফল ও ফুলের নাম। মুসলমান নর-নারীর ভালো অর্থবহ ও ফযিলতপূর্ণ ইসলামী নামের স্থলে বা বিপরীতে এরকম ডাক নাম রাখা শুধু খারাপ নয়, গুনাহও। কারণ মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। সেই আশরাফুল মাখলুকাতের নাম পশু-পাখি, ফল-ফুল, নদ-নদী ও অস্ত্র ইত্যাদির নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখলে এবং সে নামে ডাকলে নিশ্চয় আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন। তাই মুসলমানদের ফজিলতপূর্ণ ইসলামী নামের বিপরীতে ঐসব নাম রাখা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এটা বর্জন করা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য।
