আব্দুস সাত্তার তার পাশে হাটতে হাটতে বলল, আপনাকে খুশী করার জন্য হাসিমুখে প্রাণটাও উৎসর্গ করতে পারি। এর থেকেও কী আরো বড় মাশুল দিতে হবে?।
রূপা থমকে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখ বের করে বলল, সাবধান করে দিচ্ছি, ভবিষ্যতে যদি এরকম কথা দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করেন, সেদিন আমার মরা মুখ। দেখবেন।
আব্দুস সাত্তার তার মনের খবর জানতে পেরে চমকে উঠে বলল, আমি না হয় ভুল করে কথাটা বলে ফেলেছি, তাই বলে এতবড় কথা বলে প্রতিশোধ নেবেন?
আপনি ভুল করতে পারলে আমি পারি না বুঝি? আপনি যা করেছেন, আমি তার পুনরাবৃত্তি করেছি মাত্র। তবু ক্ষমা চাইছি, আর ওয়াদা করছি, আর কখনও এমন কথা উচ্চারণ করব না।
ভুল আমি প্রথমে করেছি। আমারই ক্ষমা চাওয়া ও ওয়াদা করা উচিত।
ঠিক আছে, ভুল যখন দু’জনেই করেছি তখন দু’জনরেই দু’জনকে ক্ষমা করা উচিত এবং দু’জনকেই ওয়াদাও করা উচিত।এবার এ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আসুন এখানে বসা যাক বলে রূপা ছায়া ঢাকা ও ঘাসেভরা জায়গায় বসে পড়ল।
আব্দুস সাত্তার তার সামনে বসে অপলক নয়নে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফিরোজা কালারের পোশাক রূপাকে ভীষণ মানিয়েছে। সুন্দরী রূপাকে আরো সৌন্দৰ্য্যময়ী করে তুলেছে। সেদিকে আব্দুস সাত্তারের কোনো খেয়াল নেই। সে তার চোখের তারার দিকে তাকিয়ে আছে।
রূপাও তার চোখের দিকে তাকিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ পর বলল, চোখের দিকে তাকিয়ে কী দেখছেন?
একই প্রশ্ন যদি আমিও করি?
আপনি আগে বলুন, তারপর আমি।
“তোমার কাজল কালো চোখের দু’টো নীল পাথরের গভীরতায় হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে।” এবার তোমারটা বল।
রূপা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে গোলাপ ফুলটা বের কের তার হাতে দেওয়ার সময় মৃদু হেসে বলল, “আমার কাজল কালো চোখে হয়তো খুঁজে পাবে তোমার প্রিয় মরুদ্যান।”
মারহাবা মারহাবা বলে আব্দুস সাত্তার ফুলটা একবার শুকে নিয়ে পকেট থেকে একটা লাল গোলাপ বের করে তার হাতে দিল।
শুকরিয়া বলে রূপা একবার শুকে বলল, আমারটা আমাদের বাগানের। তোমারটা আমারটার চেয়ে খুব সুন্দর।
আব্দুস সাত্তার বলল, দেশের বাড়িতে বেশ বড় ফুলের বাগান আছে, এখানে নেই। তাই ছাদটাকে ফুলের বাগান বানিয়েছি। এটা সেই বাগানের। তারপর বলল, জান, গত রাতে তোমাকে ফোন করার পর থেকে খুব টেনসানে ছিলাম। সারারাত ঘুমাতে পারি নি। কেবলই মনে হয়েছে, আমাকে দেখার পর যদি ফ্রড ভেবে রাগ করে চলে যাও, তা হলে…..।
থেমে গেলে কেন? তা হলে কী?
তা হলে লজ্জায় ও অপমানে হয়তো মরেই যেতাম। আর তা না হলে নিজের প্রতি খুব ঘৃণা তো হতই, এমনকি নিজের প্রতি বিশ্বাসও হারিয়ে ফেলতাম। সারাজীবন কোনো মেয়েকে গ্রহণ করা তো দূরের কথা, কোনো মেয়ের দিকে মুখ তুলে তাকাতেও পারতাম না। আল্লাহ পাকের অপার করুণা, তিনি আমাকে নিরাশ করেন নি। সেজন্য তার পাক দরবারে শতকোটি শুকরিয়া জানাচ্ছি।
রূপা মৃদু হেসে বলল, প্রথম দিকে যখন ফোন করতে তখন তোমাকে বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে ভেবে রেগে যেতাম, কিছুটা ঘৃণাও করতাম। আব্বকে জানিয়ে শায়েস্তা করতেও চেয়েছিলাম; কিন্তু তোমার গলার স্বরে যেমন মধু ছিল তেমনি তোমার কথাতেও যাদু ছিল। তাই আল্লুকে জানাতে পারি নি। তারপর দিনের পর দিন তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি। অনেক সময় মনে হয়েছে, অনেক কুশ্রী ও চরিত্রহীন ছেলেদের কণ্ঠস্বর মধুর হয়, কথাতেও যাদু থাকে। যখন সামনা-সামনি হতে চাইলে না, এমন কি ফোনেও নাম ছাড়া কিছুই জানালে না। তখন মন খুব বিগড়ে যায়। ভাবলাম, খুব গরিব ঘরের ছেলে আমাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে পিছে লেগেছে। সায়মা ও আমি কোলেপিঠে। ও সব কিছু জানে। একদিন বলল, ছেলেটা ফ্রড। আব্বকে জানিয়ে জব্ধ করে দে। আমি বললাম, ছেলেটা যাই। হোক, তাকে সম্পূর্ণ না জানা পর্যন্ত আল্লুকে জানান ঠিক হবে না। ও কিন্তু সংসদ ভবন চত্বরের ঘটনার দিন বলেছে, গুলি খাওয়া ছেলেটাই তুমি। গতকাল জুতো কিনতে গিয়ে বাসায় ফিরেও ঐ কথা বলেছে।
আব্দুস সাত্তার জিজ্ঞেস করল, তোমার কিছু মনে হয় নি?
হয়েছে, তবে তেমন জোরাল নয়।
সায়মা সত্যিই খুব চালাক। গতকাল আমরা বাসায় পৌঁছাবার আগেই ফোন করেছিল। ফুফুআম্মা ফোন ধরেছিলেন। খুব চালাকির সঙ্গে তার কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু জেনে নিয়েছে।
ওমা, তাই নাকী? এখন বুঝতে পারছি, এখানে আসার সময় কেন বলেছিল, তোকে নিয়ে এক জায়গায় যাব। আমি বলেছি বিকেলে নিয়ে যাস। মনে হচ্ছে, তোমাদের বাসাতেই নিয়ে যেত। জান, ওর কাছে হেরে গেলাম।
হেরে গেলে বুঝলাম না।
বললাম না, ও বলেছিল, আসিফ সাহেবই তুমি?
হেরে গিয়ে দুঃখ হচ্ছে বুঝি?
তোমার কী তাই মনে হচ্ছে?
না, তবে তোমার মুখে শুনতে চাই।
দুঃখের বিপরীত শব্দটা হচ্ছে।
সায়মার কথা কেন বিশ্বাস কর নি বলবে?
দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তুমি মিথ্যে অভিনয় করতে পার না।
এখনও কী সে বিশ্বাস আছে?
আছে?
মিথ্যে অভিনয় করলাম, তবু আছে?
শুধু আছে নয়, বরং এখন সেই বিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে।
বুঝলাম না।
তোমাকে সামনাসামনি দেখে ও তোমার কথা শুনে যা জানতে পারলাম, তা চন্দ্র সূর্যের মতো সত্য। অতটুকু মিথ্যে অভিনয় না করলে তা জানতে পারতাম না।
আনন্দে আপ্লুত হয়ে আব্দুস সাত্তার কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে না পেরে চুপ করে রইল। তারপর বলল, তুমি বোধহয় না খেয়ে বেরিয়েছ, চল, কোনো রেষ্টুরেণ্টে যাই।
