নাস্তা খেয়ে রুমে এসে গোলাপ ফুলটা ভ্যানিটি ব্যাগে নিয়ে বেরোবার সময় সায়মার সামনে পড়ে গেল। সে এতক্ষণ রিডিংরুমে পড়ছিল। বেডরুমে একটা খাতার জন্য আসছিল। আপুকে দেখে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ভাবল, যে আপুকে শতবার বলা সত্ত্বেও সেজেগুজে বাইরে বেরোয় না। তাকে আজ এ কী দেখছে?
সায়মার গায়ের রং রূপার চেয়ে একটু চাপা। সে বাবার রং পেয়েছে। আর রূপা মায়ের। সায়মা সুন্দরী। রূপা তার থেকে অনেক বেশি সুন্দরী। রং একটু চাপা বলে সায়মা হয়তো সাজগোজ পছন্দ করে। আর রূপা খুব সুন্দরী বলে হয়তো সাজগোজ মোটেই পছন্দ করে না। সায়মা সাজগোজ করেও রূপার সৌন্দর্য্যের ধারে কাছে যেতে পারে না। তবে এ নিয়ে তার মনে কোনো ক্ষোভ নেই। আপুকে ভীষণ ভালবাসে। তাই বাইরে কোথাও যাওয়ার সময় সাজগোজ করার জন্য প্রায় চাপ দেয়। রূপা হেসে এড়িয়ে যায়। সেই আপুকে আজ সাজগোজ করে বেরোতে দেখে এত অবাক হল যে, কিছুক্ষণ কথা বলতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
রূপা এগিয়ে এসে তার গাল টিপে দিয়ে মুচকি হেসে বলল, কীরে, অমন করে তাকিয়ে কী দেখছিস?
তোকে দেখছি।
তোর হিংসা হচ্ছে বুঝি?
আপু তুই একথা বলতে পারলি বলে সায়মা তাকে জড়িয়ে ধরে ভিজে গলায় বলল, হিংসা হবে কেন? বরং ভীষণ খুশী হয়েছি। হাদিসে পড়েছি, হিংসা এমন জিনিস, যা নেকীকে লাকড়ীর মতো আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। তাই তোর। রূপ দেখে হিংসা না করে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাচ্ছিলাম। তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে চোখ মুছে কান্নামুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, কোথায় এবং কেন যাচ্ছিস জানি না। তবে কোনো ছেলের সঙ্গে যদি দেখা করতে যাস, তা হলে নিশ্চিত করে বলতে পারি, সে তোকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যাবে।
রূপা বলল, হিংসা করার কথাটা হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তবু আমার ভুল হয়েছে। ভবিষ্যতে এরকম ভুল আর হবে না। চলি, দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে এগোল।
সায়মা তার পথ আগলে বলল, আমাকে সঙ্গে না নিয়ে তুই কখনও কোথাও যাস না, আজ একা যাচ্ছিস যে?
একা কেন যাচ্ছি ফিরে এসে বলব।
কিন্তু নাস্তা খেয়ে আমি তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাব ভেবেছিলাম।
বিকেলে নিয়ে যাস বলে রূপা বেরিয়ে এসে ড্রাইভিং সিটে বসল।
ড্রাইভার আগেই ইনফরমেসান পেয়ে গাড়ি বের করে রেডি হয়েছিল। রূপাকে আসতে দেখে পিছনের দরজা খুলে দিল। ড্রাইভিং সিটে বসতে দরজা লাগিয়ে সরে দাঁড়াল।
টি.এস.সির মোড়ে এসে রূপা সরওয়ার্দি উদ্যানের গেটের দিকে রাস্তায় এক পাশে গাড়ি পার্ক করল। তারপর গাড়ি লক করে নেমে পার্কের গেটের কাছে। আসিফকে দেখে মনে হোঁচট খেল। ভাবল, তা হলে কি সায়মার কথাই ঠিক? যদি তাই হয়, তা হলে তো উনি এগিয়ে এসে কথা বলবেন। এই ভেবে তাকে না দেখার ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
আসিফ ওরফে আব্দুস সাত্তার দশ মিনিট আগে এসে এতক্ষণ চিন্তা করছিল, আজ সকালে সায়মা যদি ঘটনাটা রূপার কাছে ফাঁস করে দেয়, তা হলে নিশ্চয় ফ্রড ভাববে, আর এখানে নাও আসতে পারে। আবার ভাবল, সায়মা ফাস না করলেও আসার পর যখন জানতে পারবে আসিফই আব্দুস সাত্তার তখন কী করবে? যদি ফ্রড ভেবে রাগ করে চলে যায়, তা হলে কি করবে? রাস্তার দিকে তাকিয়ে এইসব চিন্তা করছিল। রূপাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে ধীরে ধীরে তার সামনে এসে সালাম দিল।
রূপা অবাক হওয়ার ভান করে সালামের উত্তর দিয়ে বলল, আপনি এখানে?
হ্যাঁ, বন্ধু আব্দুস সাত্তার পাঠিয়েছে।
তার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রূপার পা থেকে মাথা পর্যন্ত আব্দুস সাত্তারের প্রতি ঘৃণায় রিরি করে উঠল। সেই সাথে প্রচণ্ড রেগে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে রাগ সামলাল। তারপর বিদ্রুপ কণ্ঠে বলল, আপনি তো বন্ধুর খুব গুণগান করেন, কিন্তু সে যে একটা জঘন্য ধরনের ফ্রড, তা জানেন না বোধহয়?
আব্দুস সাত্তার কিছু না বলে করুণ দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অল্পক্ষণের মধ্যে তার চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠতে মুখ নিচু করে নিল।
রূপা তার চোখে পানি দেখে ফেলেছে। বিদ্রুপ কণ্ঠেই বলল, বন্ধুকে ফ্রড বলেছি বলে খুব দুঃখ পেয়েছেন তাই না?
পানিভরা চোখে মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে আব্দুস সাত্তার বলল, যদি বলি আমিই আব্দুস সাত্তার। বিশেষ কারণে সেদিন পরিচয় গোপন করে বন্ধু আসিফের নামে পরিচয় দিয়েছিলাম। তারপর আবার মুখ নিচু করে নিল।
রূপা হতভম্ব হয়ে বেশ কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। তখন তার সমস্ত তনুমনে আনন্দের বান ছুটল।
আব্দুস সাত্তার ভয়ে ভয়ে মুখ তুলে তার মুখের দিকে তাকাতে চোখে চোখ পড়ল। দেখল, সেখানে ঘৃণা বিদ্রুপ বা রাগের লেশমাত্র নেই। যা আছে, তা দেখে বাস্তব জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
কতক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল রূপা জানতে পারল না। যখন চোখ দুটো পানিতে ঝাপসা হয়ে এল তখন বুঝতে পেরে দৃষ্টি নিচের দিকে করে নিল। কোনো কথা বলতে পারল না।
ততক্ষণে আব্দুস সাত্তারও বাস্তবে ফিরে এল। বলল, চলুন পার্কের ভিতরে গিয়ে বসি। রাস্তার লোকজন আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখছে।
ওড়নার খুঁটে চোখ মুছে যেতে যেতে রূপা বলল, অনেক ভুগিয়েছেন। নিজে অপমানিত হয়েছেন, আমাকেও অপমান করেছেন; কড়া মাশুল দিতে হবে।
