শুনুন, সেদিন আপনাকে ফ্রড বলে ভুল করেছি, সেজন্য ক্ষমা চাইছি।
ক্ষমা চাওয়ার দরকার নেই। আমি আপনার সঙ্গে দীর্ঘদিন যা করেছি, তা অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে করলে শুধু ফ্রড নয়, ইতর, ছোটলোক ও লোফার বলত।
তবু বলুন; ক্ষমা করেছেন?
কাল আমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর যদি সত্যি সত্যি ফ্রড বলে মনে হয়, তখন কিন্তু ক্ষমা চাওয়ার জন্য অনুশোচনা হবে।
সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার, আপনার মাথা না ঘামালেও চলবে। এখন ক্ষমা করেছেন কিনা বলুন।
আমিও কিন্তু প্রথমে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন, ফ্রড নই প্রমাণ দেখাতে পারলে ক্ষমা করবেন। কথাটা উইথড্র করলেও ক্ষমা করেছেন কিনা বলেন নি।
আপনাকে খুব চালক ভেবেছিলাম, এখন মনে হচ্ছে তা নন। এটাও বুঝতে পারেন নি, ক্ষমা না করলে রিসিভার তুলেই রেখে দিতাম?
আপনার কথা বোধহয় ঠিক। উম্মে কুলসুমও মাঝে মাঝে আমাকে বলে, আমার নাকি বুদ্ধি কম। আপনারও বোঝা উচিত ছিল, ঐদিন অপমানিত হয়েও কেন আজ ফোন করলাম।
ঠিক আছে, কালই প্রমাণ হবে, কে চালাক আর কে বোকা। এবার রাখি, সায়মা নড়াচড়া করছে। মনে হয় বাথরুমে যাওয়ার জন্য ঘুম পাতলা হয়ে আসছে। তা ছাড়া রাত কত হয়েছে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখুন।
দেড়টা বেজে গেছে দেখে আব্দুস সাত্তার সালাম বিনিময় করে লাইন কেটে দিল।
রূপা রিসিভার রেখে পড়ায় মন দিল। বইটা শেষ হতে কয়েক পৃষ্ঠা বাকি থাকতেই ফজরের আজান হল। তাড়াতাড়ি শেষ করে নামায পড়ে কুরআন তেলাওয়াত করতে বসল। কিন্ত ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। কুরআন তুলে রেখে ভাবল, এখন ঘুমালে আটটা নটার আগে ঘুম ভাঙবে না। আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে দেখা করার জন্য, সময় মতো যেতে পারবে না। তাই ঘুমাবার চিন্তা বাদ দিয়ে বাগানে হাঁটার মনস্থ করল।
সায়মা নামায পড়ে তার চোখ মুখ দেখে বলল, মনে হচ্ছে সারারাত পড়ে বইটা শেষ করেছিস?
রূপা মৃদু হেসে বলল, বইটা শেষ না করে কিছুতেই ঘুমাতে পারলাম না। দারুণ ভালো বই। তুইও পড়িস। ভাবছি, এই লেখকের সব বই কিনে নিয়ে আসব।
তাই কিনে আনিস। আমি নসিম হেযাজীর খুব নাম শুনেছি। বইগুলো আমিও পড়ব।
আপাততঃ এটা পড়িস।
কিনেছিস?
না, এক বান্ধবীর কাছ থেকে এনেছি।
ঠিক আছে, পড়ব। তারপর তাকে বেরোতে দেখে বলল, কোথায় যাচ্ছিস? নটা পর্যন্ত ঠেসে একটা ঘুম দে, দেখবি শরীর ঝরঝরে হয়ে গেছে।
আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে দেখা করার কথা তাকে জানাতে চায় না। তাই কিছু না বলে রূপা বেরিয়ে গেল। বাগানে এসে ভোরের ঠাণ্ডা মুক্ত বাতাস গায়ে লাগতে প্রাণ। জুড়িয়ে গেল। হাঁটার সময় দীর্ঘ দেড় বছর ধরে শুধু ফোনে কথা বলে যাকে ভালবেসে ফেলেছে, তাকে আজ সামনা-সামনি দেখবে ভেবে রোমাঞ্চিত হতে লাগল। সায়মার কথামতো আসিফ সাহেবই যদি আব্দুস সাত্তার হন, তা হলে সত্যিই সে ভাগ্যবতী। তার মতো সুপুরুষ খুব কম দেখেছে। আর তা যদি না হয়ে আব্দুস সাত্তার অন্য কেউ হন? তিনি যদি কুশ্রী বেঁটে অথবা খুব রোগা হন, তা হলে কি করবে ভাবতে লাগল। প্রায় আধঘণ্টা হাঁটার পর ফেরার সময় একটা ফুটন্ত। গোলাপ দেখতে পেল। ফুলটা আজ রাতে শেষ প্রহরে ফুটেছে, রূপা বুঝতে পারল। ফুলটা তুলতে গেলে হাতে কাটা বিধে গেল। উহ করে উঠে হাতটা টেনে নিল। তখন একটা কবিতা মনে পড়ল;
কাঁটা হেরী ক্ষ্যান্ত কেন কমল তুলিতে,
দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহিতে?
ফুলটা তুলে রুমে এসে টেবিলের ড্রয়ারে রাখল। তারপর গোসল করার জন্য বাথরুমে ঢুকল। সাওয়ার ছেড়ে দিয়ে সাবান মাখার সময় গুনগুনিয়ে উঠল—
তুমি অমাবস্যার রাতের মতো কালো হও,
কিংবা তুমি চাদ হও অথবা সূরয হও,
যা কিছু হও না কেন, তুমিই আমার জীবন মরণ,
বিধাতার বিধান ভেবে তোমারেই করিব বরণ।
গোসল সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আলমারী খুলে অনেকগুলোর মধ্য থেকে। ফিরোজা কালারের সালওয়ার কামিজ ও ওড়না বের করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এল। তারপর সেজেগুজে মায়ের কাছে এসে বলল, নাস্তা দাও।
দু’জন কাজের মেয়ে থাকা সত্ত্বেও মুমীনা বেগম রান্না নিজের হাতে করেন এবং স্বামী ও মেয়েদের খাওয়ান। প্রথম দিকে রোকন উদ্দিন সাহেব স্ত্রীকে অনেকবার বলেছেন, সংসারের সবকিছু করার জন্য দু’জন বুয়া রাখা হয়েছে, তবু তুমি কিচেনে যাও কেন? তা ছাড়া একসঙ্গে খেতেও বস না। টেবিলে সবকিছু থাকে, প্রয়োজন মতো সবাই নিয়ে খাব। মুমীনা বেগম মৃদু হেসে বলেছেন, নিজের হাতে রান্না করে স্বামী-সন্তানদের খাইয়ে যে কত সুখ, কত শান্তি, তা তুমি পুরুষ। হয়ে বুঝবে না। পরে রূপা ও সায়মা বাবার মতো বলেছে। তাদেরকেও মুমীনা বেগম একই কথা বলেছেন।
ওরা সবাই আটটায় একসঙ্গে নাস্তা করে। এখন সাতটা। তাই রূপা এখন নাস্তা খেতে চাইলে মুমীনা বেগম তার দিকে না তাকিয়েই বললেন, এত সকালে নাস্তা খেতে চাচ্ছিস কেন? কোথাও যাবি নাকি?
রূপা বলল, হ্যাঁ আম্মু। একজনের সঙ্গে আটটায় এ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।
মুমীনা বেগম এবার তার দিকে তাকিয়ে অবাক হলেন। এভাবে সেজেগুজে সায়মাকে বাইরে যেতে দেখলেও রূপাকে কখনও দেখেন নি। জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় এ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?
টি.এস.সিতে।
দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে কড়াইয়ের ভাজি নাড়তে নাড়তে বললেন, ভাজি হতে দেরি আছে। ডাইনিং টেবিলে যা, রুটি পাঠিয়ে দিচ্ছি। ফ্রিজে মিস্টি আছে, বুয়াকে দিতে বলিস।
