ওটাতো গার্জেনদের ব্যাপার; রূপা আপা যদি তোমাকে ঘৃণা করে, তা হলে কী করবে ভেবেছ?
আব্দুস সাত্তার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, ভাবি নি যে, তা নয়। তাই তো তাকে পরিচয় ও দেখা না দিয়ে প্রেমের বীজ বপন করেছি এবং চারাও যে গজিয়েছে তাও বুঝতে পেরেছি। কিন্তু সেই চারা এতদিনে কত বড় হয়েছে, তা না জানা পর্যন্ত দেখা দিলেও আসল পরিচয় দেব না ভেবেছি।
একটা মহৎ উদ্দেশ্যের কথা বললে বলে বাধা দিলাম না। নচেৎ শুধু রূপের মোহে যদি তুমি তাকে ভালবাসতে, তা হলে নিশ্চয় কঠিন বাধা দিতাম। কারণ আমার ধারণা, রূপা আপা তোমাকে যতই ভালবাসুক না কেন, তিনি যখন জানবেন, তুমি রাজাকারের ছেলে এবং সেই কারণে তার ও আমাদের আব্বুর সঙ্গে শত্রুতা তখন তোমাকে ঘৃণা করবেই। তাই তোমার জন্য আমার খুব ভয় হয়। বড় ভাইয়াকে আল্লাহ দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছেন। এখন তুমিই আমাদের একমাত্র ভাই, রূপা আপার কারণে তোমার কিছু হলে আম্মু, আব্ব, আমরা কেউ-ই সহ্য করতে পারব না। আমি মনে করি, সে রকম পরিস্থিতি আসার আগেই রূপা। আপাকে তোমার পরিচয় দেওয়া উচিত।
আব্দুস সাত্তার বলল, ঠিক আছে, তুই এখন যা। ভেবে দেখি কী করা যায়।
.
আব্দুস সাত্তারের ফুফুর সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর সায়মা চিন্তা করল, এখন। আপুকে বললে কিছুতেই বিশ্বাস করবে না। তার চেয়ে কাল সকালে তাকে নিয়ে ওদের বাসায় গিয়ে চাক্ষুস প্রমাণ দেখাবে।
সন্ধ্যের পর থেকে সায়মার মাথা ব্যথা করছিল। তাই দশটায় খাওয়ার পর একটা প্যারাসিটামল খেয়ে শুয়ে পড়ল।
।রূপা আজ বান্ধবী আসমার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল। তার রুমের টেবিলে নসিম হেযাজীর “কায়সার ও কিসরা” নামে একটা বেশ বড় বই দেখে কয়েক পাতা উল্টে বুঝতে পারল, ঐতিহাসিক উপন্যাস। এই ধরণের বই পড়তে তার খুব ভালো লাগে। ফেরার সময় আসমার কাছ থেকে বইটা এনেছিল। সন্ধ্যে থেকে প্রায়। অর্ধেক পড়ে ফেলেছে। খেয়ে এসে সায়মাকে ঘুমাতে দেখে কিছু বলল না। আগেই। তার মাথা ব্যথার কথা শুনেছে। টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে বইটা নিয়ে বসল।
ইসলামকে দুনিয়া থেকে মিটিয়ে দেওয়ার জন্য খৃষ্টান, ইয়াহুদী ও নজুসীদের রাজ্য জয়ের লোভ, যুদ্ধের হানাহানি ও তিন চার জোড়া নায়ক-নায়িকা নিয়ে সুখ-শান্তি, দুঃখ-বেদনা ও বিরহ-মিলনের অদ্ভুত কাহিনী। একবার পড়তে শুরু করলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত পড়া ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা কারো হবে না।
রূপা পড়ার মধ্যে ডুবে গিয়ে সময়ের জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ফোন বেজে উঠতে চমকে উঠে ঘড়ি দেখল, সাড়ে বারটা। সঙ্গে সঙ্গে হার্টবিট বেড়ে গেল। সামলাবার জন্য কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল। তারপর রিসিভার তুলে সালাম দিল।
সালামের উত্তর দিয়ে আব্দুস সাত্তার খুব নরম সুরে বলল, সেদিন আর কখনও বিরক্ত করব না বলা সত্ত্বেও করলাম। সেজন্য ক্ষমা চাইছি।
রূপা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
বুঝতে পারছি, আপনি আমার উপর খুব রেগে আছেন; কিন্তু কী করব বলুন, আপনার সঙ্গে কথা না বললে আজও সারা রাত জেগে কাটাতে হত। গত সাত আট দিন একফোঁটা ঘুমাতে পারি নি। প্লীজ, কথা বলুন।
আপনি যে ফ্রড নন, প্রমাণ করতে পারবেন?
ইনশাআল্লাহ পারব। কী প্রমাণ চান বলুন।
কাল আপনার মুখোমুখি হতে চাই।
আব্দুস সাত্তার বুঝতে পারল, সায়মা ঘটনাটা তাকে এখনও বলে নি। বলল, বেশ তো কোথায় কখন হতে চান বলুন।
সকাল আটটায় টি.এস.সির মোড়ে থাকবেন, আমি আসব।
ঠিক আছে, থাকব।
আপনাকে চিনব কী করে?
আপনাকে চিনতে হবে না, আমিই এগিয়ে এসে কথা বলব। এবার একটা। কথা বলব, কিছু মাইন্ড করবেন না বলুন?
মাইন্ড করার মতো কথা বললে, মাইন্ড করাই তো স্বাভাবিক।
না, মানে বলছিলাম কী, আপনি একা আসবেন।
ও এই কথা? আপনি না বললেও আমি একাই আসতাম।
এখনও জেগে ছিলেন মনে হচ্ছে?
হ্যাঁ, একটা বই পড়ছিলাম।
কী বই?
নসিম হেযাজীর কায়সার ও কিসরা।
আমি নসিম হেযাজীর সব বই পড়েছি। ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়তে আমার খুব ভালো লাগে। আপনি কী ওঁর সব বই পড়েছেন?
না, এটাই প্রথম।
ওঁর লেখা সব বই আমার কালেকসানে আছে। নিয়ে পড়তে পারেন।
নেব কী করে? আপনি তো ধরাই দেন না।
ইনশাআল্লাহ কাল তো ধরা দিচ্ছি।
এখন তো পড়াশোনা নেই, তবু এতরাত জেগে রয়েছেন কেন?
একটু আগে কী বললাম ভুলে গেলেন?
না, ভুলি নি।
তবু জিজ্ঞেস করলেন কেন?
মানে জেগে জেগে কী করছিলেন, তা জানার জন্য।
আপনাকে ফোন করব বলে।
আমারও তো এখন পড়াশোনা নেই, আরো আগে করতে পারতেন।
তা পারতাম, নিরিবিলিতে অনেকক্ষণ আলাপ করা যাবে না ভেবে করি নি। তা। ছাড়া সায়মা যা চালাক, জেগে থাকলে আপনি কী এতক্ষণ আলাপ করতে পারতেন?
সায়মা খুব চালাক, আর আমি বুঝি খুব বোকা?
না, তা নয়। আপনি আমার মতো।
আপনার মতো মানে?
মানে, আমি বোকাও নই, চালাকও নই। আপনিও তাই।
আমার তো মনে হয় আপনি ভীষণ চালাক।
কী করে বুঝলেন?
ভীষণ চালাক না হলে আজ দেড় দু’বছর আমাকে নাকানি চুবানি খাওয়াতে পারতেন না।
ছি ছি, এ আপনি কী বলছেন? বরং আমিই কুলুর বলদের মত দেড় দু’বছর আপনার পিছনে ঘুরছি।
আর কতদিন ঘুরে আমাকে নাকানী চুবানি খাওয়াবেন?
বার বার একই কথা বলে নিজেকে ছোট করছেন কেন? আপনি কী, তা আমার জানতে বাকি নেই। অন্য কোনো মেয়ে হলে আমার বারটা বাজিয়ে ছাড়ত।
