সালাউদ্দিন যেন হাতে স্বর্গ পেলেন। দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দে তার চোখে পানি এসে গেল। তবু খুব অপমান বোধ করে মাথা নিচের দিকে করে। রইলেন।
দাদাজী তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন, তুমি যখন জমি ও বাগান। সাফ কওলা দিয়ে টাকা নিতে এসেছিলে তখন কর্জে হাসানার মর্তবার কথা জানা থাকা সত্ত্বেও শয়তান সম্পত্তির লোভ মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। এখন আব্দুল হামিদের কথা শুনে আল্লাহ আমার জ্ঞান ফিরিয়ে দিয়েছেন। সে জন্যে তার পাক দরবারে শুকরিয়া জানাচ্ছি। কুরআন পাকে আছে, “মুমিনগণ একে অপরের ভাই” তুমি আমার মুমীন ভাই। অভাব বা বিপদের সুযোগ নিয়ে এক ভাই অন্য ভাইয়ের সম্পত্তি গ্রাস করা কোনো মুমীনের কাজ নয়। বরং অভাব বা বিপদের সময় তাকে সাহায্য করাই প্রত্যেক মুমীনের কর্তব্য। আর ভাইয়ের সাহায্য নেওয়া কোনো অপমানের কাজ নয়।
সালাউদ্দিন আপুত কণ্ঠে বললেন, আপনি আল্লাহর খাটি বান্দা। দোয়া করুন, “আল্লাহ যেন টাকাটা পরিশোধ করার তওফিক দেন।”
তারপর থেকে এম.এ. পাশ করা পর্যন্ত আব্ব, বন্ধু রোকন উদ্দিনকে টাকা দিয়ে অনেক সাহায্য করেছেন। এম.এ. পাশ করার পর আব্ব কলেজে শিক্ষকতা করতে ঢুকলেন; আর রোকন উদ্দিন ঢাকায় এসে ভাগ্যগুণে একটা বড় চাকরিতে ঢুকলেন। চার পাঁচ বছরের মধ্যে দাদাজীর টাকা পরিশোধ করে দেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতে উনি স্বপরিবারে ভারতে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। ভারতে যাওয়ার সময় আল্লুকেও যেতে বলেছিলেন। কিন্তু আবু যান নি। বরং পাক হানাদারদের সাহায্য করেছিলেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কিছু করেন নি। এমন কি যদি উনি জানতে পারতেন, অমুক দিন অমুক গ্রামে পাক সৈন্যরা হামলা করবে। সঙ্গে সঙ্গে সেই গ্রামে লোক পাঠিয়ে গ্রাম ছেড়ে লোকজনদের চলে যেতে বলেছেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রোকন উদ্দিন যখন দেশে ফিরলেন তখন আমাদের ও আশপাশের গ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা আব্বুকে রাজাকার বলে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। রোকন উদ্দিন মুক্তিবাহিনীর কমান্ডিং অফিসার ছিলেন। তাঁরই হস্তক্ষেপের ফলে আবু বেঁচে গেলেন। কিন্তু সবাই রাজাকার বলত। সে সময়। আব্ব অনেকদিন বাড়ির বাইরে কোথাও যেতেন না। শুধু কলেজে যেতেন, আর লোকজনের দ্বারা চাষ-বাসের কাজ করাতেন। একদিন রোকন উদ্দিন আব্বুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আব্বু আগেই জেনেছিলেন, ওঁর জন্যই মুক্তিযোদ্ধারা তাকে। কিছু বলে নি। তার দু’হাত ধরে আলু ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং নাস্তাপানি খাওয়াবার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু উনি একগ্লাস পানিও খান নি। দাদাজী মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার ছ’মাস আগে ইন্তেকাল করেন। দাদি বেঁচে ছিলেন। তিনি রোকন উদ্দিনকে বললেন, তোমাকে আমি আব্দুল হামিদের মতো দেখি। ওকে মাফ করে দিয়ে কিছু খাও। নচেৎ আমি দুঃখ পাব।
রোকন উদ্দিন সাহেব বললেন, আমিও আপনাকে মায়ের মতো জানি। আপনার কথায় ওকে মাফ করে দিলাম। তবে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে রাজাকারের বাড়িতে কিছুতেই খেতে পারব না। সেজন্য আপনার কাছে মাফ চাইছি। তারপর ফিরে আসার সময় বাইরে এসে আব্বকে বলেছিলেন, তুমি জীবনে আর কখনও আমাকে বন্ধু ভাববে না। আমাদের বাড়িতে যেন তোমার পা পড়ে।
সেদিন ওঁর কথায় আব্বু ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন। সে সময় আমার বয়স পাঁচ আর তোর দুই কি আড়াই বছর হবে। বড় হয়ে যখন কলেজে পড়ি তখন একদিন আম্মুর মুখে এসব শুনেছিলাম। এখন তুই-ই বল, সেই রোকন উদ্দিন সাহেব কি আমাকে জামাই করবেন?
উম্মে কুলসুম একটু রেগে উঠে বলল, তুমি জেনেশুনে কেন তার মেয়ের প্রেমে পড়লে?
আব্দুস সাত্তার বলল, কেন পড়েছি বলছি শোন, প্রায় তিন বছর আগে গ্রীন সুপার মার্কেটে একদিন রূপাকে দেখে মুগ্ধ হই। তখন থেকে ওর কথা এক মুহূর্তও ভুলতে পারি নি। এর ছ’মাস পর পাবলিক লাইব্রেরীতে দেখি। সেদিন ওর সঙ্গে আমার এক ক্লাসমেটের বোন ছিল। পরে ঐ ক্লাসমেটের বোনের কাছ থেকে ওর বায়োডাটা জেনে মন খুব খারাপ হয়ে যায়। ওকে পাওয়া দুরাশা ভেবে মন থেকে ওর স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করি। কিন্তু কিছুতেই সফল হতে পারলাম না। এভাবে আরো ছ’মাস কেটে গেল। একদিন রাতে ওর কথা মনে পড়তে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। হঠাৎ মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেল, কোনো রকমে যদি রূপার মন। জয় করতে পারি, তা হলে বিয়ের মাধ্যমে হয়তো আব্বুর সঙ্গে ওর আব্বার সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছে, তা আবার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। পরের দিন ঐ। ক্লাসমেটের বোনের মাধ্যমে রূপাদের ফোন নাম্বার জেনে আজ দেড় বছর ওর সঙ্গে ফোনে আলাপ করছি। আলাপ করে ওর মন জয় করতে পেরেছি বলে মনে হয়। কিন্তু কতটা পেরেছি তা জানি না।
কিন্তু উনি যখন তোমার আসল পরিচয় জানতে পারবেন তখন তো তোমাকে ঘৃণা করবেন।
তা করতে পারে, আবার নাও পারে। আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত শত্রুর ছেলে মেয়ের মধ্যে অনেক প্রেমের ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে যেমন শত্রুতা আরো বেড়েছে, তেমনি শক্রতার অবসানও হয়েছে।
তোমার ক্ষেত্রে যদি প্রথমটা হয়?
তা হতে পারে। তবে চেষ্টা করতে দোষ কি? তকদিরে থাকলে সাকসেসফুল হতে পারি। আব্বুর কাছ থেকে বাধা এলেও আম্মুকে দিয়ে তাকে ম্যানেজ করতে পারব। কিন্তু রূপার আব্বা পাহাড়ের মতো বাধা হয়ে দাঁড়াবেন।
