উম্মে কুলসুম লজ্জায় লাল হয়ে বলল, বড় ভাই হয়ে ছোট বোনকে এসব কথা বলতে বিবেকে বাধল না?
আব্দুস সাত্তার হাসি চেপে রেখে একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, তা হলে ছোট বোন হয়ে তুই কী করে বড় ভাইয়ের প্রেম কাহিনী শুনতে চাচ্ছিস?
ঠিক আছে, আমিও আলু আম্মুকে চিঠি দিয়ে জানাব, ছোট ভাইয়া একটা। আপটুডেট মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। কথা শেষ করে উম্মে কুলসুম ছুটে পালিয়ে গেল।
০৪. আপুর কথায় সায়মা রেগে
আপুর কথায় সায়মা রেগে ড্রইংরুমে এসে তখনই উম্মে কুলসুমের বাসায় ফোন করল।
উম্মে কুলসুমের ফুফু রাইসা বেগম ফোন ধরে বললেন, হ্যালো, কে বলছেন?
ভারী গলা শুনে সায়মা মনে করল, নিশ্চয় উম্মে কুলসুমের মা। সালাম দিয়ে বলল, খালাআম্মা, আমি উম্মে কুলসুমের বান্ধবী। ওকে একটু দিন তো?
রাইসা বেগম সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, ও তো বাসায় নেই। আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে মার্কেটিং করতে গেছে।
আব্দুস সাত্তার কে?
ওমা, তাও জান না? আব্দুস সাত্তার ওর ছোট ভাইয়া।
শুনে সায়মার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভাবল, তার অনুমানই ঠিক হল। জিজ্ঞেস করল, আপনি কে?
আমি ওদের ফুফু।
ওর সঙ্গে আমার জরুরী দরকার ছিল। আপনাদের বাসার নাম্বারটা ভুলে গেছি। দয়া করে একটু বলুন না।
তুমি কেমন মেয়ে, বান্ধবীর বাসার নাম্বার ভুলে যাও? এখানে কোনো দিন আস নি?
না ফুফুআম্মা, উম্মে কুলসুম অনেকবার যেতে বলেছে, যাব যাব করেও যাওয়া হয় নি। কত নাম্বার রাজারবাগ যেন বলেছিল?
তুমি তো খুব ভুলো মেয়ে দেখছি। বললে আবার ভুলে যাবে। কাগজ কলম নাও, বলছি।
একটু ধরুন বলে সায়মা কাগজ কলম এনে বলল, বলুন।
…..নাম্বার রায়ের বাজার।
লিখে নিয়ে সায়মা বলল, এবার রাখি ফুফুআম্মা?
রাখ বলে রাইসা বেগম রিসিভার রেখে দিলেন। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে উম্মে কুলসুমকে আব্দুস সাত্তারের রুমের দিক থেকে দৌড়ে আসতে দেখে বললেন, দৌড়াচ্ছিস কেন? দাঁড়া বলে জিজ্ঞেস করলেন, তোরা কখন ফিরলি?
এই তো কিছুক্ষণ আগে।
সায়মা নামে তোর এক বান্ধবী এক্ষুনি ফোন করেছিল। ফিরেছিস জানলে ডেকে দিতাম।
উম্মে কুলসুম আতঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন ফোন করেছিল কিছু বলেছে?
সায়মা যেসব কথা বলেছে, রাইসা বেগম বললেন।
উম্মে কুলসুম তাড়াতাড়ি ছোট ভাইয়ার কাছে এসে সে কথা জানাল।
আব্দুস সাত্তার ভেবেছিল, তাদের সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর নিজেকে রূপার কাছে প্রকাশ করবে। আজ ফোন নাম্বার দেওয়ার সময় মনে হয়েছিল, আর বোধ হয়। বেশি দিন আড়াল হয়ে থাকতে পারবে না। কিন্তু আজই ওরা জেনে যাবে ভাবে নি।
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে উম্মে কুলসুম বলল, কী ভাবছ ছোট ভাইয়া?
ভাবছি, ধরা যখন পড়েই গেলাম তখন আর লুকোচুরি করা ঠিক হবে না।
হ্যাঁ, সেটাই ভালো। আচ্ছা ছোট ভাইয়া, রূপা আপা তোমাকে ভালবাসে কিনা বুঝতে পেরেছ?
পেরেছি, তবে কতটা ভালবাসে বুঝতে পারি নি। বলতো, রূপাকে তোর কেমন মনে হয়?
শুধু ভালো নয়, খুব ভালো। ওঁর মতো মেয়ে দেখেছি বলে মনে হয় না। আব্বু আম্মু দেখলে পছন্দ করবেই।
আব্দুস সাত্তার ছোট একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, তা আমিও জানি। কিন্তু রূপার আব্বা কিছুতেই আমাকে পছন্দ করবেন না।
কেন?
সে অনেক কথা। পরে শুনিস।
উম্মে কুলসুম একটু অবাক হয়ে বলল, তুমি রূপা আপার আব্বাকে চেন তা হলে?
হ্যাঁ চিনি।
পরে নয়, এখনই বল, আমি শুনব।
রূপার আব্বার নাম রোকন উদ্দিন। রোকন উদ্দিনের আব্বা সালাউদ্দিনের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তোর শ্বশুরবাড়ির পাশের গ্রামে বাড়ি। সালাউদ্দিনের বাস্তুভিটে ছাড়া সামান্য ফসলী জমি ও একটা আম, কাঁঠাল ও সুপারির বাগান ছিল। রোকন উদ্দিনই তার একমাত্র সন্তান। তার উপর খুব ভালো ছাত্র। তাই ছেলেকে লেখাপড়া করাবার জন্য উনি ফসলী জমি ও বাগান দাদাজীর কাছে দশ বছরের জন্য সাফকওলা দিয়ে সেই টাকায় ছেলেকে লেখাপড়া করান। সে সব আর ছাড়িয়ে নিতে পারেন নি। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দাদাজী তাকে ডাকিয়ে এনে বললেন, তুমি তো টাকা ফেরত দিয়ে জমি ও বাগান ফিরিয়ে নিতে পারলে না, দলিল মোতাবেক ওগুলো এখন আমার। তখন উনি করুণ মুখে বললেন, তাতো বটেই। এখন থেকে আপনি ভোগ দখল করবেন, আমি আপত্তি করব কেন? হাইস্কুলে ভর্তির দিন থেকে রোকন উদ্দিনের সঙ্গে আব্বর গভীর বন্ধুত্ব। দু’জনেই তখন ইন্টার পড়তেন। যখন দাদাজী সালাউদ্দিনের সঙ্গে ঐসব। কথা বলছিলেন তখন আব্বুও সেখানে ছিলেন। তিনি জানতেন, ঐ জমির ফসল ও বাগানের আয়ে ওঁদের সংসার চলে। ওগুলো দাদাজী ভোগ দখল করলে ওঁদের সংসার কিভাবে চলবে ভেবে শিউরে উঠলেন। আব্বু সে কথা দাদাজীকে বলে বললেন, আপনি আরো কয়েক বছর ওঁকে সময় দিন। ওঁর ছেলে লেখাপড়া শেষ করে যখন রোজগার করবে তখন টাকা শোধ করে দেবেন। অথবা দলিলটা এখনই ফেরত দিয়ে বলুন, তোমাকে টাকাটা কর্জে হাসানা দিয়েছিলাম। যখন সামর্থ হবে তখন শোধ করে দিও। আর যদি কোনো দিন সামর্থ না হয়, তা হলে শোধ করতে। হবে না। আপনার সম্পত্তি আপনারই থাকবে। কর্জে হাসানা কি জিনিস, আপনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, তাই বললাম। এতে যদি আমার বেয়াদবী বা অন্যায় হয়ে থাকে মাফ করে দিন।
আব্বুর কথা শুনে দাদাজীর চোখে পানি এসে গেল। চোখ মুছে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে চুমো খেয়ে বললেন, “আল্লাহ তোকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে সামিল করুক।” তারপর সালাউদ্দিনকে দলিটা ফেরত দিয়ে বললেন, তোমার ছেলের বন্ধুর কথা তো শুনলে, ওকে দোয়া করো। আর যে টাকা তোমাকে দিয়েছি, তা কর্জে হাসানা দিয়েছি আজ থেকে মনে করবে।
