তোর যেমন কথা, ফোন নাম্বার ঠিক দিলে বাসার ঠিকানা ঠিক দেবে না কেন?
তোর তো পাকা বুদ্ধি, তাই ধরতে পারছিস না। আমার কাঁচা বুদ্ধিতে আমি ঠিক ধরেছি।
কী ধরেছিস বলতো?
আজ বলব না, কাল বলব।
আজ বলবি না কেন?
তুই বিশ্বাস করবি না। বলবি, এটা তোর কাঁচা বুদ্ধির প্রমাণ। মনে রাখিস, পাকা বুদ্ধিমতী হয়েও যে তুই পদে পদে ভুল করছিস, তা দু’একদিনের মধ্যে প্রমাণ করেই ছাড়ব। তারপর তার কাগজটা ফেরত দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
আড়াই বছরের ছোট বোন সায়মাকে রূপা ভীষণ ভালবাসে। তবে চান্স পেলে ছোট খাট ব্যাপার নিয়ে রাগায়। সায়মা বেশি রেগে গেলে কেঁদে ফেলে। তার ক্রন্দসী মুখটা দেখতে রূপার খুব ভালো লাগে, তাই মাঝে মাঝে রাগায়। যেদিন। রাগে কেঁদে ফেলবে, সেদিন সায়মা সারাদিন মুখ গোমড়া করে থাকবে; কারো সঙ্গে কথা বলবে না। রাতে ঘুমাবার সময় রূপা তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে রাগ মানাবে। সেই ছোটবেলা থেকে আজও তার পরিবর্তন হয় নি। ফোন নাম্বারের কাগজটা ফেরত দিয়ে চলে যাওয়ার পর রূপা ভাবল, আর একটু হলে কেঁদে ফেলত, তাই তাড়াতাড়ি চলে গেল।
.
মার্কেটিং করে বাসায় ফিরে উম্মে কুলসুম আব্দুস সাত্তারকে জিজ্ঞেস করল, তুমি ঐ মেয়ে দুটোর কাছে তোমার নাম আসিফ বললে কেন?
আব্দুস সাত্তার বলল, শোন, তোকে একদিন বলেছিলাম না, আমি একটা মেয়েকে ভালবাসি এবং তার সঙ্গে প্রতিদিন রাতে ফোনে কথা বলি? ঐ দুটো মেয়ের বড়টাকে, মানে রূপা হল সেই মেয়ে।
উম্মে কুলসুম খুব অবাক হয়ে বলল, কিন্তু ওঁর কথা শুনে তো মনে হল, তোমাকে চেনেন না। এমনকি তোমার নামও জানেন না। অথচ তুমি আমাকে এক বছর কি আরো দু’তিন মাস আগে কথাটা বলেছিলে। আজ আবার ওঁদেরকে নিজের নাম না বলে অন্য নাম বললে। ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না।
আব্দুস সাত্তার ও উম্মে কুলসুম কোলে-পিঠের ভাই বোন। ওদের বয়সের তফাৎ তিন বছর। দু’জনের মধ্যে খুব সদ্ভাব থাকলেও উম্মে কুলসুম ছোট ভাইয়ার। উপর খবরদারি করে। আব্দুস সাত্তার তা পছন্দ না করলেও ছোট বোনকে কিছু বলে না। উম্মে কুলসুম গ্রামের মাদ্রাসা থেকে আলিম পাশ করার পর আব্দুস সাত্তারের বন্ধু সদ্য পাশ করা ডাক্তার আব্দুল মজিদের সঙ্গে আকদ হয়। আব্দুল মজিদের বাড়ি ওদের বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল দূরে। তার বাবার আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো না। তার মামাদের অবস্থা খুব ভালো। তারাই ভাগ্নাকে ঢাকায় রেখে ডাক্তারী পড়িয়েছেন। আব্দুস সাত্তারের বাবা আব্দুল হামিদ প্রথমে রাজি হন নি। বলেছিলেন, ডাক্তারের চরিত্র ভালো না। তা ছাড়া ওর বাবার আর্থিক অবস্থা খারাপ। উম্মে কুলসুম কষ্ট পাবে। আব্দুস সাত্তার বন্ধুর উন্নত আখলাক, ধর্মভীরুতা ও তাদের বাড়ির ধর্মীয় পরিবেশের কথা বলে রাজি করিয়েছে।
আব্দুস সাত্তারের কথার সততা জেনে আব্দুল হামিদ খুশী হয়েছেন এবং জামাইয়ের কিডনীর উপর উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার ইচ্ছার কথা জানতে পেরে তাকে খরচ দিয়ে আমেরিকায় পাঠিয়েছেন। আব্দুল মজিদ যাওয়ার আগে বন্ধুকে বলেছিল, উম্মে কুলসুম যদি আরো পড়াশোনা করতে চায়, তা হলে ঢাকায় তোমার কাছে। রেখে আলিয়ায় ভর্তি করে দিও। তার কথামতো আব্দুস সাত্তার উম্মে কুলসুমকে ঢাকায় এনে ফাজিলে ভর্তি করে। এ বছর পাশ করে কামিল পড়ছে।
এখন তার কথা শুনে বলল, পরে তোকে সব কিছু বুঝিয়ে বলব। এখন শুধু এতটুকু শুনে রাখ, আমি রূপার সবকিছু জানলেও সে আমার নাম ছাড়া কিছুই। জানে না। এমনকি আমাকে একবারও দেখে নি।
উম্মে কুলসুম আরো অবাক হয়ে বলল, উনি তোমাকে দেখতে চান নি?
তা আবার চায় নি, বহুবার চেয়েছে, আমি ইচ্ছা করে দেখা দিই নি।
কারণটা বল।
পরে শুনিস। এখন যা বলছি শোন, তারপর সংসদ ভবন চত্বরের ঘটনা ও আজ চাইনিজ রেষ্টুরেণ্টে যেসব আলাপ হয়েছে, সে সব বলে বলল, দু’একদিনের মধ্যে ফোন করবে। তুই রিসিভ করলে আমাকে ডেকে দিবি। আমি ফুফু আম্মাকে বলে দেব, কেউ যদি ফোনে আসিফকে খোঁজে, তা হলে যেন আমাকে ডেকে দেয়।
উম্মে কুলকুম বলল, ওঁর বোন সায়মা আমার কাছ থেকে ফোন নাম্বার নিয়েছে। বাসা কোথায় জিজ্ঞেস করতে বলেছি, রাজারবাগ।
আব্দুস সাত্তার হেসে উঠে বলল, রাজারবাগ বললি কেন?
তোমাকে নাম পাল্টে বলতে শুনে ভেবেছিলাম, নিশ্চয় এর ভিতর কোনো কারণ আছে। তাই আমিও বাসার ঠিকানা পাল্টে বলেছি।
বলে অবশ্য আপাততঃ ভালই করেছিস; কিন্তু ওরা যখন জানতে পারবে তখন তোকে কী ভাববে বল তো?
আর তুমিও যে নিজের নাম না বলে অন্য নাম বললে, সেকথা জানলে তোমাকে কী ভাববে?
যখন জানবে তখন বুদ্ধি করে কিছু একটা বলে ম্যানেজ করা যাবে কী বলিস?
হ্যাঁ, তাই করো। তারপর বলল, তুমি যে পরে সবকিছু বলবে বললে, তা এখন বলো না।
আব্দুস সাত্তারের এখন আর কথা বলতে ভালো লাগছে না। রূপার অনিন্দ্য সুন্দর মুখটা বার বার মনে পড়ছে। তাই তাকে ভাগাবার জন্য বলল, তোর ডাক্তারের চিঠি টিঠি পেয়েছিস? প্রায় চার বছর হয়ে গেল, কবে ফিরবে-টিরবে কিছু জানায় নি? আমার বন্ধু কিন্তু আমাকে চিঠি দিয়েছে। সে তার বৌ এর জন্য কতটা। পাগল হয়ে আছে জানতে চাইলে চিঠিটা দিচ্ছি পড়ে দেখ। এই কথা বলে টেবিলের ড্রয়ার টেনে চিঠি বের করার ভান করল।
