লোকজন মারহাবা মারহাবা বলে উঠল।
তিনি বসার পর হাফেজিয়া মাদ্রাসার সেক্রেটারি আব্দুল জব্বার দাঁড়িয়ে বললেন, এখানে আমার দু’বিঘে জমি ছিল, তার এক বিঘে আগেই ওয়াকফ করে সেই জমিতেই হাফেজিয়া মাদ্রাসা করে দিয়েছি। বাকি এক বিঘে জমি ও দশ হাজার টাকা ইনশাআল্লাহ দেব।
লোকজন তাকেও মারহাবা মারহাবা বলে অভিনন্দন জানাল।
মুশতাক বিশ্বাস আর চুপ করে থাকতে পারলেন না, তাকে টেক্কা দিয়ে অন্যরা নাম কিনবে তা সহ্য করতে পারলেন না। দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, আমি নগদ পঁচিশ হাজার টাকা ও এখানকার পাঁচ বিঘে জমি নতুন মাদ্রাসার নামে ওয়াকফ করে দেব।
এবার লোকজন আরো উচ্চস্বরে মারহাবা মারহাবা বলে অভিনন্দন জানাল।
চেয়ারম্যান এটাই আশা করেছিলেন, আশা পূরণ হতে দেখে মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে আজরাফ স্যারকে দানের পরিমাণ ও তাদের নাম লিস্ট করতে বললেন।
মুশতাক বিশ্বাস বসার পর কুতুবপুর ও অন্যরা গ্রাম থেকে যারা এসেছিলেন, তারা তাদের সামর্থ্য অনুসারে নানান অংকের টাকা দেয়ার কথা বলে নাম লেখাল। শেষে হিসাব করে দেখা গেল। সাড়ে ছয় বিঘে জমি ও সোয়ালাখ টাকা হয়েছে।
চেয়ারম্যান জমি ও টাকার পরিমাণ জানিয়ে বললেন, এবার কমিটি গঠন করতে হবে। তবে কমিটিতে সদস্য হওয়ার জন্য ঐ লোক শর্ত আরোপ করেছেন। যেমন ধার্মিক ও দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে। যদি তেমন লোক পাওয়া না যায়, তা হলে ধনী হোক আর গরিব হোক, গ্রামের লোকেরা যাকে ভালো বলে জানে, সে রকম লোক হলেও চলবে। তবে তাকে আস্তে ধীরে দ্বীনী এলেম হাসিল করতে হবে এবং সে সব মেনে চলারও চেষ্টা করতে হবে। এখানে বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন এসেছেন। আপনারা নিজেদের গ্রামের ভালো লোকদের মধ্যে দু’তিনজনের নাম লিখে আমাদের কাছে দিন। প্রায় ঘণ্টা খানেকের মধ্যে বাহান্নজনের নাম লিস্ট করা হল।
চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, লিস্টে বাহান্নজনের নাম আছে। তারা ছাড়া সবাই চলে যান। বাহান্নজনের মধ্যে কারা কমিটিতে থাকবেন এবং কে কি পদ গ্রহণ করবেন, সেটা আলাপ আলোচনার মধ্যে ঠিক করা হবে। অবশ্য পরে। আপনাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে।
লোকজন চলে যাওয়ার পর চেয়ারম্যান বাহানুজনকে নিয়ে আলাপ আলোচনা শুরু করলেন। অন্যান্য গ্রাম থেকে মাত্র পাঁচজন কমিটিতে থাকতে রাজি হলেন। আর কুতুবপুর গ্রামের এগারটাপাড়া থেকে একজন করে নিয়ে মোট ষোলজনকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হল। কমিটির সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে চেয়ারম্যানকে সেক্রেটারি আজরাফ স্যারকে এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ও মুশতাক বিশ্বাসকে সভাপতি ও বইরাপাড়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার সেক্রেটারি আব্দুল জব্বারকে ক্যাসিয়ার করা হল।
সভা শেষ হওয়ার পর মুশতাক বিশ্বাস চেয়ারম্যানকে বললেন, যিনি এরকম একটা মহৎ কাজের জন্য দশ লাখ টাকা দিচ্ছেন, তার পরিচয়টা বলবেন না?
চেয়ারম্যান বললেন, উনি পরিচয় প্রকাশ করতে নিষেধ করে ওয়াদা করিয়েছেন। আপনারাই বলুন, ওয়াদা খেলাপ করা কী উচিত? তবে যেদিন মাদ্রাসার ভীত দেয়া হবে, সেদিন উনি থাকবেন বলেছেন।
আব্দুল জব্বার বললেন, বাড়ি কোথায় বলেন নি?
চেয়ারম্যান বললেন, ওঁর সম্পর্কে কোনো কিছুই বলতে নিষেধ করেছেন। তবে আলাপ করে বুঝতে পেরেছি, উনি খুব জ্ঞানী, দ্বীনদার ও ধনীলোক। দয়া করে আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।
এরপর আর কেউ কিছু না বলে বিদায় নিয়ে যে যার পথে রওয়ানা দিল।
০৮. টাকা-পয়সা আদায় করার পর
টাকা-পয়সা আদায় করার পর কমিটির মেম্বাররা মাদ্রাসার ভীত দেয়ার জন্য ঐ লোককে আনার ব্যবস্থা করতে চেয়ারম্যানকে বললেন।
চেয়ারম্যান বললেন, ঠিক আছে, আমি সেই ব্যবস্থা করছি।
এরমধ্যে একদিন মুশতাক বিশ্বাস একটা উকিল নোটিশ পেলেন। নোটিশ পড়ে বুঝতে পারলেন, খাঁপাড়ার যে মেয়েকে তার দাদা গোপনে বিয়ে করেছিলেন এবং পরদাদাজী গুলি করে মেরে ফেলেছিলেন, তারই ছেলে সম্পত্তির দাবি করে কোর্টে মামলা করেছে। নোটিশ পড়ে যতটা না অবাক হলেন, তার চেয়ে বেশি রেগে গেলেন। অনেকক্ষণ থুম ধরে বসে রইলেন। এমন সময় পারভেজকে দেখতে পেয়ে কাছে ডেকে নোটিশের কাগজটা দিয়ে পড়তে বললেন।
নোটিশ পড়ে পারভেজের অবস্থা বাপের মতো হল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, এই নোটিশ নিয়ে একজন উকিলের সঙ্গে আলাপ করতে হবে।
একদিন মুশতাক বিশ্বাস ও পারভেজ চুয়াডাঙ্গা কোর্টের নামকরা উকিল শারাফাতের কাছে গিয়ে নোটিশটা দিয়ে পরামর্শ চাইলেন।
শারাফাত খুব নামকরা উকিল। বয়স প্রায় পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন। তার বাবা বিলায়েত হোসেনও নামকরা উকিল ছিলেন। মুশতাক বিশ্বাসের পরদাদা ছেলের বৌকে গুলি করে যে খুনীর আসামী হয়েছিলেন, সেই কেস তিনি ড্রিল করে আসামীকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।
নোটিশ পড়ে শারাফাত উকিল বললেন, অনেক আগে একদিন বাবার মুখে শুনেছিলাম, কুতুবপুরের বিশ্বাসদের কেউ একজন পুত্রবধূকে গুলি করে খুন করেছিলেন। মনে হচ্ছে, সেই মেয়ের ছেলেই বাদি, তাই না?
মুশতাক বিশ্বাস বললেন, হ্যাঁ আপনি ঠিক ধরেছেন। আব্বার মুখে শুনেছি, সে সময় আপনার বাবাই পরদাদাজীকে বাঁচিয়েছিলেন। তাই তো আপনার কাছে এলাম। তারপর বললেন, দাদাজীর মুখেই শুনেছি, ঐ মেয়ের দু’মাসের একটা ছেলে ছিল।
