শারাফাত উকিল বললেন, বাদি যদি প্রমাণ করতে পারেন, উনিই সেই ছেলে, তা হলে তার ও তার মায়ের প্রাপ্য অংশ আপনাকে দিতে হবে।
মুশতাক বিশ্বাস চিন্তিত গলায় বললেন, আপনার কী মনে হয়, বাদি প্রমাণ করতে পারবে?
মামলা যখন করেছেন, তখন প্রমাণ জোগাড় করেই করেছেন।
মুশতাক বিশ্বাস বললেন, মামলা চললে অনেক টাকাপয়সা খরচ হবে। তা ছাড়া বংশের মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়বে। বাদিকে কিছু টাকা পয়সা দিয়ে মামলা মিটিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করুন।
তা করতে পারব; যদি বাদি রাজি হয়। তা ছাড়া বাদি যদি মোটা অংকের টাকা দাবি করেন, আপনারা দেবেন তো?
পারভেজ এতক্ষণ চুপ করেছিল, এবার আব্বা কিছু বলার আগে বলল, আপনি বাদির সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে দেখুন। তিনি কত টাকা দাবি করেন। তারপর যা করার আমরা আপনার সঙ্গে পরামর্শ করে করব।
শারাফাত উকিল বললেন, ঠিক আছে, আপনারা এখন যান। আমি বাদির সঙ্গে যোগাযোগ করে আপনাকে জানাব।
শারাফাত উকিল একদিন বাদির বাসার ঠিকানায় গেলেন। তিনি ব্যারিস্টার খলিলুর রহমানকে চেনেন। কিন্তু তিনিই যে বাদি হাসিবুর রহমানের ছেলে, তা জানতেন না। জানার পর যা বোঝার বুঝে গেলেন। তাদের সঙ্গে কেসের ব্যাপারে আলাপ করে মুশতাক বিশ্বাসের কথা মতো টাকার কথা তুলে কেস মিটিয়ে ফেলার কথা বললেন।
বাবা কিছু বলার আগে ব্যারিস্টার খলিলুর রহমান বললেন, দাদি ও বাবার অংশের সম্পত্তির মূল্য বাবদ পাঁচ লাখ, আর দাদিকে খুন করার জন্য পাঁচ লাখ, মোট দখ লাখ টাকা পেলে আমরা মামলা তুলে নিতে পারি। আর যদি দশ লাখ টাকা দিতে মুশতাক বিশ্বাস রাজি না হন, তা হলে, খুব শিঘ্রি আমরা খুনের মামলাও দায়ের করব। আমাদের দাবি ন্যায্য কিনা উকিল হিসাবে আপনি নিশ্চয় জানেন!
শারাফাত উকিল আর কিছু না বলে বিদায় নিয়ে ফিরে এলেন। তারপর একদিন মুশতাক বিশ্বাসকে খবর দিয়ে আনিয়ে সবকিছু জানালেন।
টাকার অংক শুনে মুশতাক বিশ্বাস ভিমরি খেয়ে চুপ করে রইলেন, আর রাগে ফুলতে লাগলেন।
পারভেজও আব্বার সঙ্গে এসেছে। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল, যিনি খুন করেছেন তিনি ও তার ছেলে অনেক আগে মারা গেছেন। দাদাজী ও মারা গেছেন, মরা মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা যায়?
শারাফাত উকিল বললেন, দেখুন বাদি বিরাট ধনী। তার এক ছেলে ব্যারিস্টার। হাইকোর্টে ওকালতি করেন। এ ব্যাপারে ওঁদের সঙ্গে পেরে উঠবেন না। কি করবেন না করবেন, চিন্তা ভাবনা করে আমাকে জানাবেন। আমি সেই মতো ব্যবস্থা করব। তবে আমার মনে হয়, আপনারা নিজে গিয়ে ওঁদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে মীমাংসা করে ফেলাই ভালো।
মুশতাক বিশ্বাস রাগের সঙ্গে বললেন, তা কখনই সম্ভব নয়। দুশমনদের সঙ্গে আলাপ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। ধনী হলে কী হবে? ছোটলোকের বাচ্চা তো, তাই টাকার এত লোভ।
শারাফাত উকিল বললেন, তা হলেতো আপনাকে নির্দিষ্ট দিনে কোর্টে হাজির হয়ে নোটিশের বিরুদ্ধে জওয়াব দাখিল করতে হবে?
এ ব্যাপারে পরে আপনাকে জানাব বলে মুশতাক বিশ্বাস ছেলেকে বললেন চল, এবার ফেরা যাক। তারপর বিদায় নিয়ে ফিরে এলেন।
কার্পাসডাঙ্গায় বাস থেকে নেমে হাবিব ডাক্তারের সঙ্গে দেখা। সে রুগী দেখে ফিরছিল। তাদেরকে দেখে সাইকেল থেকে নেমে সালাম বিনিময় করে বলল, কোথায় গিয়েছিলেন মাতব্বর সাহেব?
মুশতাক বিশ্বাস তার কথার উত্তর না দিয়ে বললেন, অনেক দিন আমাদের ওদিকে আপনাকে দেখি নি। ঢাকায় গিয়েছিলেন নাকি?
হ্যাঁ গিয়েছিলাম, আব্বা ফোন করে যেতে বলেছিলেন। তবে দু’দিন পরেই চলে এসেছি। তারপর বলল, আপনাদের ওদিকে রুগী না থাকলে যাওয়া হয় না। তবে গত সপ্তাহে বইরাপাড়ায় কাদের আলির বাড়িতে রুগী দেখতে গিয়েছিলাম। আপনাদের কারো সঙ্গে দেখা হয় নি। হেলথ কমপ্লেক্সে চলুন না, চা-টা খেয়ে যাবেন। সেই সঙ্গে আলাপও করা যাবে।
মুশতাক বিশ্বাসের হঠাৎ মনে পড়ল, ডাক্তারের বাবা ব্যারিস্টার। ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে তার সঙ্গে কেসের ব্যাপারে আলাপ করলে কেমন হয়?
কি ভাবছেন মাতব্বর সাহেব? গেলে খুশি হতাম।
ঠিক আছে চল বলে মুশতাক বিশ্বাস পারভেজকে আসতে বলে এগোলেন।
হাবিব ডাক্তার তাদেরকে নিজের রুমে এনে বসাল, তারপর একজন আয়াকে ডেকে চা-নাস্তা দিতে বলল।
নাস্তা খেয়ে চা খাওয়ার সময় মুশতাক বিশ্বাস হাবিব ডাক্তারকে বললেন, একটা কেসের ব্যাপারে এক উকিলের কাছে গিয়েছিলাম। উনি বললেন, এই কেস চালান তার দ্বারা সম্ভব নয়। তারপর চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে নামিয়ে রেখে বললেন, শুনেছি, তোমার বাবা হাইকোর্টের উকিল। ভাবছি তাকে দিয়ে কেসটা চালাব। তুমি যদি আমাদেরকে তার কাছে নিয়ে যেতে, তা হলে ভালো হত।
হাবিব ডাক্তার বলল, বেশ তো নিয়ে যাব। এই কয়েকদিন আগে ঢাকা গিয়েছিলাম। সপ্তাহ দুই পরে আবার যাব। তখন না হয় নিয়ে যাব।
মুশতাক বিশ্বাস বললেন, ঠিক আছে, যাওয়ার আগের দিন আমাকে জানাবে। তারপর বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলেন।
বাড়িতে পৌঁছে দেখলেন, বৈঠকখানায় ঘটক বসে আছে।
ঘটক মাতব্বর সাহেবকে আসতে দেখে বসা থেকে দাঁড়িয়ে উঠেছিল। কাছে এলে সালাম দিয়ে বলল, কেমন আছেন?
সালামের উত্তর দিয়ে মুশতাক বিশ্বাস বললেন, ভালো আছি। তারপর একটা চেয়ারে বসে তাকেও বসতে বলে বললেন, তা কি খবর নিয়ে এসেছ বল।
