হাবিব ডাক্তার তাকে জড়িয়ে ধরে আদর দিয়ে বলল, আল্লাহ তোমাকে হায়াতে তৈয়েবা দান করুক। তারপর বলল, তোমার নাম কি?
হাবিবুর রহমান।
নামের অর্থ জান?
জি, দয়ালুর বন্ধু। আল্লাহ দয়ালু, আমি তার বন্ধু।
সুবহান আল্লাহ, আল্লাহ তোমাকে তার বন্ধু হওয়ার তওফিক দান করুক। তারপর বলল, তোমার যে নাম, আমারও সেই নাম। তাই এখন থেকে তুমি আমার মিতা।
হাবিবুর রহমান বলল, মিতা কি আমি তো জানি না। মিতা মানেও বন্ধু।
হাবিবুর রহমান হাসি মুখে বলল, তা হলে আজ থেকে আপনিও আমার বন্ধু?
হাবিব ডাক্তার বলল, হ্যাঁ, তাই।
তা হলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন, বসুন। আমি কথাটা আম্মাকে জানিয়ে আসি। তারপর যেতে উদ্যত হলে চেয়ারম্যান বললেন, কারো সঙ্গে নতুন সম্পর্ক হলে মিষ্টিমুখ করাতে হয়। আম্মাকে বলে মিষ্টি নিয়ে এস।
চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে হেলথ কমপ্লেক্সে ফিরে এসে হাবিব ডাক্তার দেখল, নাদের আলি বসে আছে। সালাম ও কুশল বিনিময় করে বলল, কেন এসেছ বল।
নাদের আলি বলল, আপনার সঙ্গে কিছু আলাপ করতে এলাম।
বেশ তো, কি আলাপ করতে চাও বল।
আতিকার বিয়ের ব্যবস্থা হয়েছে। ছেলে ও ছেলেপক্ষ আতিকাকে পছন্দ করে গেছে।
হাবিব ডাক্তার মৃদু হেসে বলল, এরকমই কিছু আশা করেছিলাম। বিয়ের তারিখ কবে হয়েছে জান?
মাতব্বর চাচা দশ পনের দিনের মধ্যে করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু ছেলের বাপ রাজি হয় নি। ছেলের বড় ভাই বিদেশে চাকরি করে। মাস খানেক পরে ফিরবে। সে আসার পর দিন ঠিক হবে।
ছেলের বাড়ি কোথায়?
আনন্দবাস।
তুমি এসব জানলে কিভাবে?
আতিকা তাদের চাকর হালিমকে দিয়ে চিঠি লিখে পাঠিয়েছে।
ঠিক আছে, এখন যাও। কোনো দুশ্চিন্তা করো না।
কয়েকদিন পর চেয়ারম্যান একদিন বইরাপাড়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে মিটিং করার ব্যবস্থা করলেন। কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের সব গ্রামে মাইকিং করে মিটিং এর কথা জানিয়ে দেয়ার ব্যবস্থাও করলেন।
মিটিং এর দিন বিভিন্ন গ্রাম থেকে ধনী, গরিব, মধ্যবিত্ত ও গণ্যমান্যসহ বহু লোকের সমাগম হল। হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা প্রথমে কুরআন তেলওয়াত, হামদ ও নাত পাঠ করার পর চেয়ারম্যান বললেন, বর্তমানে আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশের শহরগুলোতে এমন কি গ্রামে, গঞ্জে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে সব মাদ্রাসা থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার হাফেজ তৈরি হচ্ছেন। তারা মসজিদের ইমামতি ও কুরআনিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। তবু অগণিত হাফেজ বেকার রয়েছেন। অবশ্য যারা অবস্থাপন্ন ঘরের, তারা বড় বড় মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা বেশি নয়। যারা হাফেজ হচ্ছেন, তারা কুরআনের অর্থ যেমন বোঝেন না, তেমনি হাদিস ফিকাহর জ্ঞানও তাদের নেই। তাই তাদের জন্য এক মহৎ লোক এখানে এমন একটা মাদ্রাসা করতে চান। যেখানে অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে হাফেজরাও সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারবে। তারপর হাবিব ডাক্তার যেসব কথা তাকে বলেছিল, সেসব বলে বললেন, ধর্মীয় লাইনে উচ্চ শিক্ষা নেয়ার একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হোক, এটা কি আপনারা চান?
প্রায় সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, হ্যাঁ চাই।
চেয়ারম্যান সবাইকে চুপ করতে বলে বললেন, এ ব্যাপারে আপনারা যদি কিছু বলতে চান, তা হলে বলতে পারেন।
কেউ কিছু বলার আগে মুশতাক বিশ্বাস বললেন, কিন্তু এরকম একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করাও পরিচালনা করার খরচপাতিতো আর কম না? উনি শুধু মুখে দেব বললে তো হবে না, বাস্তবে প্রমাণ দিতে হবে।
চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, সেকথা আমিও তাকে বলেছি। বললেন, আপনারা একটা কমিটি তৈরি করুন। কমিটির সদস্যরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করবেন। আরো বললেন, মাদ্রাসার নাম হবে “জোহরা খানুম আলিয়া মাদ্রাসা।” মাদ্রাসার গরিব ছাত্রদের জন্য এতিমখানা থাকবে আর অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলেদের জন্য থাকবে আবাসিক হোস্টেল। কমিটি গঠন করার পর সেক্রেটারি ও এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারির নামে প্রথমত দশ লাখ টাকা কার্পাসডাঙ্গা সোনালী ব্যাংকে জমা দিয়ে যৌথ একাউন্ট খুলে দেবেন। পরে আরো দেবেন। আমরা যদি সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই, তা হলে মাদ্রাসা চালু হওয়ার পর একটা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও করতে চান। সেখানে কারিগরি শিক্ষার সাথে সাথে উৎপাদনমূলক ব্যবস্থাও থাকবে। হাফেজ, মাওলানা, শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাই-এর কর্মসংস্থান হবে এবং এর আয় মাদ্রাসার একাউন্টে জমা হবে। এরকম একটা মহৎ কাজে ধনী-গরিব নির্বিশেষে আমাদের সাহায্য সহযোগিতা করা উচিত। আল্লাহ আমাকে যতটুকু তওফিক দিয়েছেন, তা থেকে দশ হাজার টাকা দেয়ার ওয়াদা করছি। এবার আপনারা বলুন, কে কত দেবেন? তার আগে বলে রাখি, এই হাফেজিয়া মাদ্রাসার কাছে যাদের জমি-জায়গা আছে, তাদেরকে অনুরোধ করব, টাকা দেন বা না দেন, আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার জন্য জমি দেবেন।
মিটিং এর দিন ঠিক করার আগে চেয়ারম্যান আজরাফ হোসেনের সঙ্গে সবকিছু আলাপ আলোচনা করেছিলেন।
এখন চেয়ারম্যানের কথা শেষ হতে আজরাফ হোসেন দাঁড়িয়ে বললেন, এখানে আমার দশকাঠা জমি আছে। সেই দশ কাঠা জমি ও বিশ হাজার টাকা ইনশাআল্লাহ আমি দেব। তারপর বসে পড়লেন।
