চেয়ারম্যান হাবিব ডাক্তারের গুণের কথা আগেই শুনেছেন, এখন তার মহৎ উদ্দেশ্যের কথা শুনে ভীষণ আনন্দিত হলেন। বললেন, কারো সামনে তার প্রশংসা করতে নেই জানা সত্ত্বেও না বলে পারছি না, “আপনার মতো একজন বিলেত ফেরত ডাক্তারকে ইসলামের অবক্ষয় রোধের পথে সংগ্রাম করতে দেখে যেমন অবাক হয়েছি, তেমনি আনন্দে বুকটা ভরে গেছে। আল্লাহ আপনার সমস্ত নেক কামনা-বাসনা পূরণ করুক। আপনাকে ইহকালে ও পরকালে সফলতা দান করুক। কথা দিচ্ছি, শুধু আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে নয়, মাদ্রাসার ব্যাপারেও ইনশাআল্লাহ সাহায্য করব।”
সুবহান আল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলে হাবিব ডাক্তার বলল, আল্লাহ আপনারও ইহকালে ও পরকালে সফলতা দান করুক।
আচ্ছা, যা কিছু বললেন, এসব এখানকার আর কারো সঙ্গে আলাপ করেছেন নাকি?
হাবিব ডাক্তার অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, পশ্চিমপাড়ার আজরাফ স্যারকে এখানে আসার উদ্দেশ্যের কথা বলেছি। তবে মাদ্রাসার ব্যাপারে কিছু বলি নি।
উনি শুনে কি বললেন?
আপনার মতো একই কথা বলেছেন।
আর একটা কথা, গ্রামের দু’একজন আমাকে জানিয়েছে, আপনি পশ্চিমপাড়ার হাশেম আলির বাড়িতে যান। মাঝে মাঝে রাতেও থাকেন। কথাটা কী সত্য? তারা আপনাকে খুব ভক্তি সম্মান করে। তাই আর কারো কাছে না। বলে আমার কাছে বলেছে।
জি, তাদের কথা সত্য।
শুনেছি, আপনি চিকিৎসা করে হাশেম আলিকে সুস্থ করেছেন। সেটা খুব ভালো কথা; কিন্তু তার বাড়িতে ঘনঘন যান, রাতও কাটান, এটা কী ভালো? এসব জিনিস বেশি দিন গোপন থাকে না। অন্যরা জেনে গেলে আপনার মান সম্মান থাকবে? অবশ্য তার একটা বিধবা যুবতী মেয়ে না থাকলে কেউ কোনো কথা বলতে পারত না।
যীনাতকে বিয়ে করেছে, কথাটা এখনই চেয়ারম্যানকে বলবে কিনা হাবিব ডাক্তার চিন্তা করতে লাগল।
তাই দেখে চেয়ারম্যান বললেন, আমি অবশ্য মানুষের কথায় কান দিই না। হাশেম আলির একটা বিধবা যুবতী মেয়ে আছে, তাই হয়তো মানুষজন কথাটা আমাকে জানিয়েছে। আপনার মতো মানুষের নামে কোনো অপবাদ রটুক, তা আমি চাই না। তাই জিজ্ঞেস করলাম।
আমি হাশেম আলির মেয়েকে কয়েকমাস আগে বিয়ে করেছি, কথাটা হাশেম আলি তার এক চাচাত ভাইপো, আজরাফ স্যার ও তার স্ত্রী, আর যিনি বিয়ে পড়িয়েছেন, এই পাঁচজন ছাড়া কেউ জানে না। আমার উদ্দেশ্য সফল না হওয়া পর্যন্ত ব্যাপারটা গোপন রাখতে বলেছি।
চেয়ারম্যান সাহেব সুবহান আল্লাহ, বলে হাসি মুখে বললেন, আমি এরকমই কিছু অনুমান করেছিলাম। মেয়েটার নাম যেন কী?
যীনাত বেগম।
হ্যাঁ হ্যাঁ, যীনাত। ও যখন স্কুলে পড়ত তখন থেকে চিনি। খুব গুণবতী ও ধার্মিক মেয়ে। ওর মাও খুব ধার্মিক ছিল শুনেছি। হাশেম আলিও খুব ধার্মিক ও সৎ। কিন্তু আল্লাহর কি কুদরত মেয়েটার দু’বার বিয়ে হল, দু’টো স্বামীই বিয়ের রাতে মারা গেল। তাই মেয়েটাকে কেউ দেখতে পারে না, সবাই অপয়া বলে। হাশেম আলি মেয়ের চিন্তায়ই পঙ্গু হয়ে গেল। এসব কথা কী বিয়ের আগেই জেনেছিলেন?
জি, আজরাফ স্যারের স্ত্রীর অসুখের সময় চিকিৎসা করতে গিয়ে যীনাতকে দেখে আমার পছন্দ হয়। তারপর আজরাফ স্যারের কাছেই তাদের সবকিছু শুনে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রস্তাব দিই।
আচ্ছা, আপনি যে এখানে এসে যা কিছু করছেন ও বিয়ে করেছেন, এসব আপনার মা-বাবা বা ভাইয়েরা জানেন?
জি, জানেন। তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই সবকিছু করছি। আপনি বইপাড়ার হাফেজিয়া মাদ্রাসার পাশে অথবা কাছাকাছি নতুন মাদ্রাসার জন্য জমি দেখুন।
তা দেখব, তবে আপনি এ ব্যাপারে আজরাফ হোসেনের সঙ্গে কথা বলে দেখুন উনি কি বলেন। আর একটা কথা, বইরাপাড়ার হাফেজিয়া মাদ্রাসার কাছাকাছি মুশতাক বিশ্বাসের বেশ কিছু ধানী জমি আছে। ওখানকার লোকেরা সে সব জমি ভাগ চাষ করে। মুশতাক বিশ্বাসকেও মাদ্রাসা করার কথা বলে জমি দান করতে বলুন। উনি নামের কাঙাল, মনে হয় দান করতে পারেন। আর যদি দান করতে না চান, তা হলে টাকা দিয়ে কিনে নেবেন।
পরামর্শ দেয়ার জন্য শুকরিয়া। আমার বড় মা, মানে দাদাজীর মায়ের নাম জোহরা খানুম। আমি তার নামে মাদ্রাসার নাম রাখতে চাই। আমার একান্ত অনুরোধ এই মাদ্রাসার ব্যাপারে সবকিছু আপনাকেই করতে হবে। আমি শুধু টাকার ব্যবস্থা করব। আমার কথা যেন এতটুকু প্রকাশ না হয়, সে ব্যবস্থাও আপনি করবেন। তবে আজরাফ স্যারকে জানাতে পারেন। বলুন, আমার এই অনুরোধটুকু রাখবেন?
চেয়ারম্যান কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, আপনাকে সাহায্য করব বলে কথা যখন দিয়েছি তখন ইনশাআল্লাহ নিশ্চয় রাখব। কিন্তু একদিনতো আপনার কথা। প্রকাশ হবেই।
হাবিব ডাক্তার আনন্দিত হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলল, ততদিনে ইনশাআল্লাহ আমার এখানে আশার উদ্দেশ্য সফল হয়ে যাবে। তারপর এবার আসি হলে বলে দাঁড়িয়ে পড়ল।
এমন সময় হাবিবুর রহমান আব্বার হাত ধরে এসে সালাম দিয়ে বলল, দাদু, আমার অসুখ আল্লাহ ভালো করে দিয়েছে।
চেয়ারম্যান সাহেব তাকে বুকে জড়িয়ে চুমো খেয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বললেন, এই ডাক্তার সাহেবের অসিলায় আল্লাহ তোমার জ্বর ভালো করে দিয়েছেন। যাও কদমবুসি কর বলে তাকে ছেড়ে দিলেন।
হাবিবুর রহমান কয়েক সেকেন্ড হাবিব ডাক্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে কদমবুসি করতে গেল।
