আতাহার বলল, ঠিক আছে যা।
প্রায় আধা ঘন্টা পর নাসির উদ্দিন শবনমকে নিয়ে আসার সময় তাকে বলল, আতাহার তোর জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করছে। আমি তার কাছে তোকে রেখে কাছাকাছি। থাকব।
শবনম অবিশ্বাস্য সুরে বলল, সত্যি বলছিস মেজভাই? দুষ্টুমী করছিস না তো?
হারে সত্যি। অন্য সময় তোর সঙ্গে দুষ্টুমী করলেও এখন করছি না।
গুপ্তগঞ্জে এখনও বিদ্যুৎ যায়নি। কিন্তু সেদিন ছিল চতুর্দশী। চাঁদের আলোয় চারদিক উজালা। কিছুদূর আসার পর নাসির উদ্দিন বলল, ঐ যে সামনে আতাহার দাঁড়িয়ে আছে। তুই যা আমি এখানে আছি।
শবনম একবার আতাহারের দিকে চেয়ে নিয়ে ভয়ে ভয়ে মেজভাইয়ের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
নাসির উদ্দিন বলল, কিরে দাঁড়িয়ে রইলি কেন? যা দেরি করিস না।
আতাহার তাদেরকে দেখতে পেয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল।
তাই দেখে নাসির উদ্দিন বলল, আতাহার এদিকে আসছে, আমি অল্প দূরে আছি বলে কিছুটা পিছিয়ে এসে রাস্তার ধারে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়াল।
আতাহার শবনমের কাছে এসে সালাম দিয়ে বলল, কেমন আছ?
প্রায় আট দশ মাস পর আতাহারের ভাঙ্গা শরীর দেখে শবনম নিজেকে সামলাতে পারল না। কোনো রকমে সালামের উত্তর দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, আল্লাহপাক আমার মনের আশা পূরণ করেছেন, সেজন্য তাঁর পাক দরবারে হাজার হাজার শুকরিয়া জানাচ্ছি।
তার কান্না দেখে আতাহারের চোখেও পানি এসে গেল। চোখ মুছে ভিজে গলায় বলল, অসুখে পড়ে কথামত আসতে না পেরে যা দুশ্চিন্তায় দিন কাটিয়েছি তা আল্লাহ মালুম। হাসপাতালে আম্মার মুখে তোমার বিয়ে হয়নি শুনে আল্লাহপাকের দরবারে লাখোকোটি শুকরিয়া জানিয়ে তোমাকে হেফাজতে রাখার জন্য ফরিয়াদ করেছি। তারপর বাড়িতে এসে কুলসুমের কাছে ও তোমার মেজ ভাইয়ের কাছে বিয়ে ভেঙ্গে গেছে শুনে শোকরানার নামায পড়েছি।
শবনম সামলে নিয়ে বিয়ে ভেঙ্গে যাবার নেপথ্যের কাহিনী না বলে বলল, কি করবে না করবে কিছু ভেবেছ? আবার যদি অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করে?
আতাহার বলল, ভেবে কিছু করার মতো এখন আমার শারিরীক ও মানসিক অবস্থা। নেই। আর আমার আর্থিক অবস্থার কথাও তুমি জান। তকদিরের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আল্লাহপাক যখন একটা ফাড়া কাটিয়েছেন তখন পরেরগুলোও কাটাবেন। তার উপর আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা রাখা ছাড়া অন্য কোনো পথ মাথায় আসছে না।
শবনম বলল, আমি একটা কথা বলব শুনবে?
বল।
এবারে ঢাকা যাবার সময় আমাকেও নিয়ে চল। সেখানে তো তোমার মামা-খালা আছেন। তারা সবকিছু জানার পর নিশ্চয়ই আমাদের বিয়ে দিয়ে দেবেন।
না শবনম তা হয় না। তুমি যা বললে তা হয়তো তারা করবেন। তবু এটা আমি পারব না। তোমাকে ভালবেসেছি বললে ভুল হবে, এক কথায় তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না, কিন্তু তাই বলে তোমার আম্মা-আব্বার ও তোমাদের বংশের মুখে চুন কালি লেপন করতে পারব না। তবে একথা বিশ্বাস রেখ, অন্য কোথাও বিয়ে ঠিক হওয়ার আগেই ইনশাআল্লাহ আমি কিছু একটা করবই।
সে বিশ্বাস আমার আছে আতাহার ভাই। তবু মাঝে মাঝে খুব ভয় হয়।
ভয়ের কি আছে? প্রত্যেক নামাযের পর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে। নাসির উদ্দিন বলছিল, রেজাল্ট বেরোবার পর তুমি কলেজে ভর্তি হবে। তখন তোমাকে কলেজের ঠিকানায় চিঠি দেব। বাড়িতে এলে যাতায়াতের পথে দেখা করব।
এমন সময় নাসির উদ্দিন তাদের কাছে এসে বলল, তোদের কথা শেষ হয়েছে? এবার চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
আতাহার শবনমকে বলল, এবার যাও।
তারপর নাসির উদ্দিনকে বলল, তোর এই উপকারের কথা সারাজীবন মনে থাকবে।
নাসির উদ্দিন শবনমকে নিয়ে চলে গেল।
আতাহার কিছুক্ষণ সেদিকে চেয়ে থেকে বাড়ির পথ ধরল।
আতাহারের ফুফাতো বোন রমিসা ও তার স্বামী মুনসুর শবনমদের সবাইকে চেনে। আতাহারের সঙ্গে শবনমের সম্পর্কের কথা মুনসুর একটু আধটু স্ত্রীর মুখে শুনেছে। কিন্তু প্রমাণ না পেয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। আজ সে সন্ধ্যের পর গুপ্তগঞ্জ বাজারে কিছু সদাইপাতি করতে গিয়েছিল। ফেরার পথে নাসির উদ্দিনকে রাস্তার ধারে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চিনতে পেরে জিজ্ঞেস করল, তুমি সাখাওয়াত হোসেন চাচার ছেলে নাসির উদ্দিন না? এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
নাসির উদ্দিন বলল, একটা লোকের জন্য অপেক্ষা করছি।
মুনসুর আর কিছু না বলে চলে গেল।
নাসির উদ্দিন জানে মুনসুর কি ধরনের লোক। ভাবল, যেতে যেতে ওদেরকে দেখলে আম্মাকে বলে দিতে পারে। এই কথা ভেবে বেশ আতঙ্কিত হয়ে একটু এগিয়ে এসে তার দিকে লক্ষ্য রাখল, ওদের দেখে কিছু জিজ্ঞেস করে কিনা। তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যেতে দেখে কিছুটা স্বস্তি পেল। ভাবল, ওদেরকে হয়তো দেখেনি। শবনমকে নিয়ে ঘরে ফেরার সময় জিজ্ঞেস করল, আতাহারের ফুফাতো দুলাভাই মুনসুর আমাকে দেখেছে। মনে হয় তোদেরকেও দেখেছে। আম্মাকে বলে একটা গোলমাল বাধাতে পারে।
শবনম বলল, লোকটা যা পাজী, বাধালেও বাধাতে পারে।
মুনসুর, আতাহার ও শবনমকে কথা বলতে দেখেছে ঠিক; কিন্তু তাদেরকে কিছু জিজ্ঞেস না করে চলে আসে। কারণ তখন তার মাথায় একটু কূটবুদ্ধি এসেছে। ভাবল, এতদিন ওদের ভালবাসার কথা শুনলেও প্রমাণ পাইনি। আজ যখন পেলাম তখন আতাহারকে জব্দ করে ছাড়বে।
