আরো কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পরও যখন আতাহার এল না তখন একদিন নাসির উদ্দিনকে সে এসেছে কিনা জিজ্ঞেস করল।
নাসির উদ্দিন বলল, আতাহার অনেক দিন থেকে কঠিন অসুখে ভুগছে। সে ঢাকায় হাসপাতালে আছে। তার মা কয়েকদিন হল তার কাছে গেছে। এখন কেমন আছে জানি না।
শুনে শবনম চমকে উঠল। তার মন কেঁদে উঠল। চোখে পানি এসে যেতে মেজ ভাই দেখলে কি মনে করবে ভেবে সেখান থেকে নিজের রুমে এসে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করল, আল্লাহ পাক, তুমি ওকে ভালো করে দাও। আমি চার জুম্মা রোযা রাখব, একশো রাকাত নফল নামায পড়ব। তুমি রহমানুর রহিম, তোমার রহমতের কোনো শেষ নেই। ওর উপর রহমত কর। তোমার হাবীবে পাকের উপর শতকোটি দরুদ ও সালাম পেশ করছি। তাঁরই অচিলায় তোমার এই নাদান বান্দীর দোয়া কবুল করো। আমিন। এরপর থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পর আতাহারের রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করতে লাগল। আর সেই সঙ্গে মানতের রোযা ও নফল নামায আদায় করতে লাগল।
দীর্ঘ দুইমাস অসুখে ভোগার পর সুস্থ হয়ে আতাহার গ্রামের বাড়িতে এল। সে অসুখের কথা শবনমকে জানায়নি। কারণ তার অসুখের কথা শুনে যদি শবনমের পরীক্ষার ক্ষতি হয়। আর পরীক্ষার পর সে স্কুলে যাবে না। চিঠি দিলে কাজ হবে না। ভেবে সুস্থ হওয়ার পরও দেয়নি। অসুখে পড়ে হাসপাতালে দুশ্চিন্তায় দিন কাটিয়েছে। আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে শবনমকে হেফাজতে রাখার দোয়া করেছে। তারপর আম্মার কাছে যখন শুনল, তার বিয়ে এখনো হয়নি তখন কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। বাড়িতে এসে কুলসুমের কাছে বিয়ে ভেঙ্গে গেছে শুনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে গিয়ে চোখে পানি ধরে রাখতে পারল না। সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুই কার কাছে শুনেছিস?
কুলসুম বলল, নাসির উদ্দিন ভাইয়ের কাছে।
আতাহার দুরাকাত শোকরানার নামায পড়ে আল্লাহপাকের কাছে মনের বাসনা জানাল। তারপর শবনমের সঙ্গে কি করে দেখা করবে সেই চিন্তা করতে লাগল।
বিকেলে নাসির উদ্দিন কুলসুমকে পড়াতে এসে আতাহারকে দেখে সালাম দিয়ে বলল, আল্লাহপাকের কাছে শুকরিয়া জানাই, তিনি তোকে সুস্থ করে দেশে আনলেন।
আতাহার সালামের উত্তর দিয়ে বলল, হ্যাঁ আল্লাহপাকের দয়ায় এ যাত্রা বেঁচে গেলাম, নচেৎ যে অসুখ হয়েছিল কবেই মরে যেতাম। তুই ভালো আছিস? তোদের বাড়ির সবাই ভালো?
আল্লাহর রহমতে আমরা সবাই ভালো আছি।
আতাহার বলল, আজ আর পড়িয়ে কাজ নেই, চল তোদের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।
নাসির উদ্দিন অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তোকে একটা কথা বলব, আমার উপর রাগ করবি না বল?
রাগ করব কেন? বল কি বলবি।
তোকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে আম্মা নিষেধ করেছে। কারণটা বলছি শোন, আমি তোর আর শবনমের ব্যাপারটা অনেক আগে থেকে জানি। এটাকে আমি খারাপ কিছু ভাবতাম না। কিন্তু তোর আব্বা মারা যাওয়ার পর তুই যখন লেখাপড়া বন্ধ করে দিলি তখন থেকে তাদের পরিণতির কথা ভেবে খারাপ লাগত। গতবারে এসে তুই চলে যাবার পর আপা তার বড় ননদের দেবরের সঙ্গে শবনমের বিয়ে দেবার কথা বলতে শবনম প্রতিবাদ করে বলেছিল, সে তোকে ভালবাসে এবং তোকে ছাড়া অন্য কোথাও বিয়ে বসবে না। শুনে আপা ও আম্মা শবনমকে মেরেছিল। তারপর আব্বা চরখলিফায় গিয়ে আপার ননদের দেবরের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা পাকা করে আসে। ঠিক হয়েছিল, শবনমের পরীক্ষার পর বিয়ে হবে। কিন্তু কেন কি জানি কিছুদিন আগে আপা আর দুলাভাই এসে জানাল, সেই ছেলে এখন বিয়ে করবে না বলে জানিয়েছে। সে সময় আব্বা অসুখে বাড়িতে ছিল। তাকে আপা ও দুলাভাই সেই কথা জানিয়ে বলল, শবনম পাশ করলে কলেজে পড়বে। সামসুদ্দিনের বিয়ের ব্যবস্থা করুন। এর মধ্যে তারা অন্য পাত্রের সন্ধান করবে। আব্বা শুনে বলল, আমার ইচ্ছা ছিল, শবনম আর সামসুদ্দিনের বিয়ে একসঙ্গে দেব। আল্লাহ যখন তাতে রাজি নয় তখন তোমরা যা বলছ তাই হবে। এবার তুই-ই বল, তোকে কি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া উচিত হবে?
আতাহার বলল, না উচিত হবে না। তারপর বলল, শবনম আমাকে বিয়ের কথা চিঠিতে লিখে জানিয়েছিল, তবে মারধর করার কথা বা এত কিছু ডিটেলস্ জানায়নি। সবকিছু জানিয়ে ভালই করলি। তুই শবনমের সঙ্গে অন্ততঃ একবার দেখা করার ব্যবস্থা করতে পারবি না?
নাসির উদ্দিন বলল, দেখ শবনম আমার বোন, আর তুই আমার বন্ধু। তোদের কারো মনে ব্যথা দেওয়ার ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু আমি তোদেরকে কোনো রকম সাহায্য করতে অক্ষম। তবে আজ হয়তো দেখা করার ব্যবস্থা করতে পারব। ভবিষ্যতের কথা আল্লাহ জানে। বলছি শোন, বড় খালা বেশ কিছু দিন থেকে অসুখে ভুগছে। আজ সকালে শবনম তাকে দেখতে গেছে। আমিও তার সঙ্গে গিয়েছিলাম। এখন আম্মা তাকে নিয়ে আসতে বলেছে। আমি বলেছি মাগরিবের নামাযের পর আনতে যাব। মাগরিবের নামায পড়ে তুই আমার সঙ্গে গিয়ে পথে অপেক্ষা করবি। আমি শবনমকে নিয়ে ফেরার সময় তোর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দিতে পারি।
আতাহার উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, তাই করিস, তোকে যে কি বলে কৃতজ্ঞতা জানাব, ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।
নাসির উদ্দিনের ঐ খালার বাড়ি গুপ্তগঞ্জে। সেদিন আর পড়ান হল না। দুবন্ধুতে গল্প করে, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়িয়ে গুপ্তগঞ্জ বাজারের মসজিদে মাগরিবের নামায পড়ল। তারপর নাসির উদ্দিন তাকে সঙ্গে করে কিছুদূর এসে বলল, তুই এখানে অপেক্ষা কর, আমি শবনমকে নিয়ে আসি।
