পরের দিন এক সময় শবনমদের বাড়িতে গিয়ে তার মাকে বলল, চাচি একটা কথা বলতে এলাম। গতকাল রাত আটটার সময় শবনম ও আতাহারকে গুপ্তগঞ্জ বাজারের কাছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখলাম। শবনম সেয়ানা হয়েছে, তার কি এটা করা উচিত হয়েছে? আপনি ওর দিকে খুব লক্ষ্য রাখবেন। আপনাদের বংশের কত সুনাম। লোক জানাজানি হয়ে গেলে সমাজে মুখ দেখাবেন কি করে? তা ছাড়া ওর বিয়ে দিতে পারবেন? আতাহারের বাপ মারা যাওয়ার পর লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় চোরা কারবার করে। আর বলে কিনা চাকরি করে। সব মিথ্যে কথা। আমার বড় শালী ঢাকায় থাকে। কিছুদিন আগে তাদের ওখানে গিয়েছিলাম। আতাহার কি করে না করে তারা সব জানে। তাদের কাছেই আমি আতাহারের কীর্তিকলাপ শুনেছি।
যুবাইদা খানম অবাক হলেন। বললেন, আতাহার কেমন ছেলে তা আমার জানার দরকার নেই; কিন্তু শবনমের সঙ্গে তার দেখা হবে কি করে? গতকাল সকালে সে গুপ্তগঞ্জে তার খালার বাড়ি গিয়েছিল। সন্ধ্যের পর নাসির উদ্দিন তাকে নিয়ে এসেছে।
মুনসুর বলল, নাসির উদ্দিন তখন ওদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল। তার সঙ্গে আমি কথাও বলেছি, তারপর বলল, আচ্ছা চাচি নাসির উদ্দিন কি আতাহারের বোন কুলসুম ও খাদিজাকে প্রাইভেট পড়ায়?
কই না তো? সে ওদেরকে প্রাইভেট পড়াতে যাবে কেন? কে তোমাকে বলেছে?
কেউ বলেনি, পাশা-পাশি ঘর এমনিই জানা যায়। ওদেরকে পড়ায় জানতে পেরে আমি একদিন নাসির উদ্দিনকে বললাম, আমার দুটো ছেলেমেয়েকে পড়াবে? একশো টাকা বেতন দেব। নাসির উদ্দিন বলল, আমি কাউকে প্রাইভেট পড়াই না। আমি তখন ওদেরকে পড়াবার কথা জিজ্ঞেস করলাম। বলল, ওদেরকে তো বেতন নিয়ে পড়াইনি। বন্ধুর বোন হিসাবে পড়াগুলো একটু দেখিয়ে দিই। আপনি জানেন কিনা জানি না। আতাহারের একটা বোন বিয়ের লায়েক হয়ে উঠেছে। ওর মায়ের যা স্বভাব, আমার মনে হয়, নাসির উদ্দিনকে মেয়ে গচাবার তালে আছে।
যুবাইদা খানম বুঝতে পারলেন, নাসির উদ্দিনের সাহায্যেই গতরাতে ওদের সাক্ষাৎ হয়েছে। কথাটা বুঝতে পেরে শবনম ও নাসির উদ্দিনের উপর খুব রেগে গেলেন। কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ করলেন না। গম্ভীর স্বরে বললেন, কথাটা বলে তুমি ভালো করেছ। ঠিক আছে তুমি এখন যাও, যা করার আমি করব।
যুবাইদা খানম যে খুব রেগে গেছেন, তা বুঝতে পেরে মুনসুরের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। বলল, যাই চাচি, আমাকে আবার বাজারে যেতে হবে। ফিরে আসার সময় চিন্তা করল, এবার খেলাটা ভালভাবেই লাগবে।
মুনসুর যখন ঐসব কথা বলছিল, তখন শবনম ঘরে ছিল এবং সব কিছু শুনেছে; কিন্তু নাসির উদ্দিন ছিল না। সে আসার পর শবনম তাকে মুনসুর মাকে যা যা বলেছে। সব বলল।
নাসির উদ্দিন বলল, কালকেই তোকে বললাম না, লোকটা ভীষণ খারাপ।
শবনম বলল, আম্মা সেই থেকে খুব রেগে আছে। মনে হয় আমাদেরকে খুব বকাবকি করবে।
নাসির উদ্দিন বলল, কি আর করা যাবে। দোষ যখন করেছি তখন বকাবকি হজম করতে হবে।
রাতের খাওয়া দাওয়ার পর শবনম ও নাসির উদ্দিনকে ডেকে বললেন, তোরা দুভাই বোন কি বংশের মুখে চুন কালি দিবি? তারপর শবনমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোর লজ্জা শরম বলতে কি কিছু নেই? এখনো তুই আতাহারের সঙ্গে দেখা করিস? আজ মুনসুর এসে যে কথা বলে গেল, সে কথা পাঁচজন শুনলে কি হবে ভেবে দেখেছিস? আতাহার কি তোর উপযুক্ত? জামাই বলে গেল, সে বড় ঘরের শিক্ষিত ছেলের সঙ্গে তোর বিয়ে দেবার জন্য চেষ্টা করছে। তাই তোকে কলেজে পড়াবার কথা বলল। আর তুই কিনা আতাহারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিস? আতাহারের বাপের কি আছে? তোকে খাওয়াবে কি? তা ছাড়া মুনসুর ঢাকায় গিয়ে শুনে এসেছে, সে চোরা কারবার করে। ছিঃ ছিঃ এমন জঘন্য ছেলের সাথে তুই সম্পর্ক রেখেছিস। তারপর নাসির উদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে বললেন তোর কি জ্ঞান-গম্য বলতে কিছু নেই। বড় ভাই হয়ে ছোট বোনের অন্যায় কাজকে প্রশ্রয় দিস? তোকে তো কতবার বলেছি, আতাহারের সঙ্গে মিশবি না। তবু তার সঙ্গে মিশিস কেন? আর তুই নাকি আতাহারের দুই বোনকে রোজ পড়াতে যাস। আতাহারের এক বোন বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে। সেই জন্যে যাস বুঝি? দাঁড়া তোর আব্বা আসুক, তারপর তোদের দুজনের কি করি দেখবি।
নাসির উদ্দিন সাহস করে বলল, আম্মা মুনসুর কি জঘন্য ধরনের লোক তা জেনেও তার কথা বিশ্বাস করলে? তার কাজই হলো মানুষের দোষ খোঁজে বেড়ান। আর একটা দোষ পেলে তার সঙ্গে হাজারটা মিথ্যে মিশিয়ে প্রচার করা।
যুবাইদা খানম বললেন, তা আমি জানি। তোকে আর ফুট কাটতে হবে না। একটা দোষই বা তোরা করবি কেন? সত্য হোক, আর মিথ্যে হোক পাঁচকান হলে তোদের। আব্বার মান-সম্মান বাড়বে না কমবে? আজ বাদে কাল তোদের বড় ভাইয়ের বিয়ে। এখন যদি মুনসুর তোদের নামে এসব কথা পাঁচজনের কাছে বলে বেড়ায়, তা হলে কি হবে ভেবেছিস? এবার তোরা যা আমার সামনে থেকে। তারপর ভেবে রাখলেন, কাল আতাহারের মায়ের সঙ্গে দেখা করবেন।
পরের দিন যুবাইদা খানম ছোট ছেলে কলিম উদ্দিনকে সাথে নিয়ে যখন আতাহারদের ঘরে গেলেন, তখন আতাহার বাইরে ছিল।
রফিকা বেগম শবনম ও আতাহারকে নিয়ে এতকিছু ঘটনা ঘটেছে তা জানতে না। তাই যুবাইদা খানমকে দেখে খুশি হয়ে বসতে বলে বললেন, আমার কি সৌভাগ্য। আজ হঠাৎ কি মনে করে এলেন আপা?
