প্রলয় গৰ্ম্মিতে আমরা একদিন মোটা চাদর গায়ে দিয়ে ফিলজফর সেজে বেড়াচ্ছি, এমন সময়ে নদে অঞ্চলের একজন মুহুরি বল্লে যে, “আমাদের দেশে হুজুক উঠেছে, ১৫ই কার্ত্তিক রবিবার দিন দশ বছরের মধ্যের মরা মানুষরা যমালয় থেকে ফিরে আস্বে”—জন্মের মধ্যে কৰ্ম্ম নিমুর চৈত্র মাসে রাসের মত সহরের বেণেবাবুরা সিংহবাহিনী ঠাকরুণের পালায় যেমন ছোট আদালতের দু চার কয়েদী খালাস কবেন, সেই রকম স্বর্গের কোন দেবতা আপনার ছেলের বিবাহ উপলক্ষে যমালয়ের কতকগুলি কয়েদী খালাস করবেন; নদের রামশর্মা অচার্য্যি স্বয়ং গুণে বলেছেন। আমরা এই অপরূপ হুজুক শুনে তাক হয়ে রইলেম! এদিকে সহরেও ক্রমে গোল উঠলো ‘১৫ই কার্ত্তিক মরা ফিরবে।’ বাঙ্গালা খবরের কাগজওয়ালারা কাগজ পুরাবার জিনিস পেলেন—একটি গেরো দিলে পূর্ব্বের গেরোটি যেমন আল্গা হয়ে যায়, বিধবাবিবাহ প্রচার করাতে সহরের ছোট ছোট বিধবাদের বিদ্যাসাগরের প্রতি যে ভক্তিটুকু জন্মেছিল, সেটুকু সেই প্রলয় হুজুকে ঋতুগত থারমোমিটরের পারার মত একেবারে অনেক ডিগ্রী নেবে গিয়ে, বিলক্ষণ টিলে হয়ে পড়লো।
সহরে যেখানে যাই সেইখানেই মরা ফেরবার মিছে হুজুক! আশা নির্ব্বোধ স্ত্রী ও পুরুষদলের প্রিয়সহচরী হলেন। জোচ্চোর ও বদমাইসেরা সময় পেয়ে গোছাল গোছাল জায়গায় মরা ফেরা সেজে যেতে লাগলো; অনেক গেরেস্তোর ধর্ম্ম নষ্ট হলো—অনেকের টাকা ও গয়না গেল। ক্রমে আষাঢ়ান্ত বেলার সন্ধ্যার মত–শোকাতুরের সময়ের মত, ১৫ই কার্ত্তিক নবাবিচালে এসে পড়লেন। দুর্গোৎসবের সময়ে সন্ধিপূজোর ঠিক শুভক্ষণের জন্য পৌত্তলিকেরা যেমন প্রতীক্ষা করে থাকেন, ডাক্তারের জন্য মুমূর্ষ রোগীর আত্মীয়েরা যেমন প্রতীক্ষা করে থাকেন ও স্কুলবয় ও কুঠিওয়ালারা যেমন ছুটীর দিন প্রতীক্ষা করেন—বিধবা ও পুত্রসহোদরবিহীন নির্ব্বোধ পরিবারেরা সেই রকম ১৫ই কার্ত্তিকের অপেক্ষা কবেছিলো। ১৫ই কার্ত্তিকই দিল্লীর লাড্ডু হয়ে পড়লেন—যাঁরা পূর্ব্বে বিশ্বাস করেন নি, ১৫ই কার্ত্তিকের আড়ম্বর ও অনেকের অতুল বিশ্বাস দেখে তাঁরাও দলে মিশলেন। ছেলেবেলা আমাদের একটি চিনের খরগোশ ছিল; আজ বছর অষ্টেক হলো, সেটি মরেচে–ভাঙ্গা পিঁজয়ের মাটী ঝেড়ে ঝুড়ে, তুলো পেড়ে বিছানা টিছানা করে তার অপেক্ষায় রইলেম।
১৫ই কার্ত্তিক মরা ফিরবে কথা ছিল, আজ ১৫ই কার্ত্তিক। অনেকে মরার অপেক্ষায় নিমতলা ও কাশীমিত্রের ঘাটে বসে রইলেন। ক্রমে সন্ধ্যা হয়ে গেল, রাত্রি দশটা বাজে, মরা ফির্ল না; অনেকে মরার অপেক্ষায় থেকে মড়ার মত হয়ে রাত্তিরে ফিরে এলেন; মরা ফেরার হুজুক থেমে গেল।
১.১১ আমাদের জ্ঞাতি ও নিন্দুকেরা
আমরা ক্রমে বিলক্ষণ বড় হয়ে উঠলেম, দু-চার জন আমাদের অবস্থার হিংসে কত্তে লাগলেন, জ্ঞাতিবর্গের বুকে ঢেঁকি পড়তে লাগলো–আমাদের বিপদে মুচ্কি হাসে ও আমোদ করেন, তাদের এক চোখ কাণা হয়ে গেলে যদি আমাদের দু চক্ষু কাণা হয়, তাতে এক চক্ষু দিতে বিলক্ষণ প্রস্তুত–সতীনের বাটিতে গু গুলে খেতে পারলে তার বাটিটি নষ্ট হয়, স্বয়ং না হয়, গু গুলেই খেলেন! জ্ঞাতি বাবু ও বিবিদেরও সেই রকম ব্যবহার বেরুতে লাগলো। লোকের আঁটকুড়ো হয়ে বনে একা থাকা ভাল, তবু আমাদের মতন জ্ঞাতির সঙ্গে এক ঘর ছেলে পুলে নিয়ে বাস করা কিছু নয়! আমাদের জ্ঞাতিরা দুর্য্যোধনের বাবা–তাদের মেয়েরা কৈকেয়ী ও সুর্পণখা হতেও সরেস! ক্ৰমে এক দল শক্র জন্মালেন, একদল ফ্রেণ্ডও পাওয়া গেল। যাঁরা শক্রর দলে মিশলেন, তাঁরা কেবল আমাদের দোষ ধরে নিন্দে কত্তে আরম্ভ কল্লেন। ফ্রেণ্ডরা সাধ্যমত ডিফেণ্ড কত্তে লাগলেন, শত্তুররা খাওয়া দাওয়া ও শোয়ার সঙ্গে আমাদের নিন্দে করা সংকল্প করেছিলেন, সুতরাং কিছুতেই থামলেন না; আমরাও অনেক সন্ধান করে দেখলুম যে, যদি তাদের কোন কালে অপরাধ করে থাকি, তা হলে অবশ্যই আমাদের উপর চটতে পারেন; কিছুই খুঁজে পেলুম না, বরং সন্ধানে বেরুলো যে, নিন্দুকদলের অনেকের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ পৰ্যন্তও নাই। লোকের সাধ্যমত উপকার করা যেমন কতকগুলির চিরন্তন ব্রত সেইরূপ বিনা দোষে নিন্দা করাও সহরের কতকগুলি লোকের কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম ও ব্রতের মধ্যে গণ্য;—আমরা প্রার্থনা করি, নিন্দুকরা কিছুকাল বেঁচে থাকুন, তা হলেই অনেকে তাদের চিনে নেবেন ও বক্তারা যেমন বকে বকে শেষে ক্লান্ত হয়ে আপনা আপনিই থামেন এরা আপনা আপনি থামবেন। তবে অনেকের এই পো বলেই যা হোক–পেসাদারের কথা নাই।
নানা সাহেব
মরা ফেরা হুজুক থামলে, কিছু দিন নানা সাহেব দশ বারো বার মরে গেলেন, ধরা পড়লেন, আবার রক্তবীজের মত বাঁচলেন। সাতপেয়ে গরু–দরিয়াই ঘোড়া–লক্ষ্ণৌয়ের বাদ্সা—শিবকেষ্টো বাঁড়ু্য্যে–ওয়েলস সাহেব–নীলবানুরে লঙ্কাকাণ্ডে লংএর মেয়াদ–কুমীর, হাঙ্গর ও নেকড়ে বাঘের উৎপাতের মত ইংলিশম্যান ও হরকরা নামক দুখানি নীল কাগজের উৎপত্তি—ব্রাহ্মধর্ম্মপ্রচারক রামমোহন রায়ের স্ত্রীর শ্রাদ্ধে দলাদলির ঘোঁট ও শেষে হঠাৎ অবতারের হুজুক বেড়ে উঠলো।
১.১৩ সাতপেয়ে গরু
সাতপেয়ে গরু বাজারে ঘর ভাড়া কল্লেন, দর্শনী দু পয়সা রেট হলো; গরু রাখবার জন্য অনেক গরু একত্র হলেন। বাকি গরুদের ঘণ্টা বাজিয়ে ডাকা হতে লাগলো, কিছুদিনের মধ্যে সাতপেয়ে গরু বিলক্ষণ দশ টাকা রোজগার করে দেশে গেলেন!
১.১৪ দরিয়াই ঘোড়া
দরিয়াই ঘোড়াও ঐ রকম রোজগার কত্তে লাগলেন; বেশীর মধ্যে বিক্রী হবার জন্যে দু-চার মাথালো মাখালো থামওলা সেপাইপাহারা ও গোরা কোচম্যান (যেখানে অন্দর মহলেও ঘোড়ার সর্ব্বদা সমাগম) ওয়ালা বাড়ীতে গমনাগমন কল্লেন। কে নেবে? লাখ টাকা দর! আমাদের সহরের কোন কোন বড়মানুষের যে ত্রিশ চল্লিশ লাখ টাকা দর, পিঁজরেয় পূরে চিড়িয়াখানায় রাখবারও তাঁরা বিলক্ষণ উপযুক্ত; কিন্তু কৈ? নেবার লোক নাই। এখন কি আর সৌখীন আছে? বাঙ্গালাদেশে চিড়িয়াখানার মধ্যে বর্দ্ধমানের তুল্য চিড়িয়াখানা আর কোথাও নাই—সেথায় তত্ত্ব, বৃত্ন, লস্কার, উল্লুক, ভাল্লুক, প্রভৃতি নানা রকম আজগুবি কেতার জানোয়ার আছে, এমন কি, এক আধটির জোড়া নাই।
১.১৫ লক্ষ্ণৌয়ের বাদসা
