নানা মুনির নানা মত! কেউ বল্লেন, সাহেবেরা হিন্দুর ধৰ্ম্মে হাত দেন, তাতেই এই মিউটীনি হয়েচে। তারকেশ্বরের মোহেন্তের রক্ষিতা, কাশীর বিশ্বেশ্বরের পাণ্ডার স্ত্রী ও কালীঘাটের বড় হালদারের বাড়ীর গিন্নীরে স্বপ্নে দেখেচেন, ইংরেজদের রাজত্ব থাকবে না! দুই এক জন ভটচাৰ্য্যি ভবিষ্যৎ পুরান খুলে তারই নজর দেখালেন!
ক্রমে সেপাইয়ের হুজুকের বাড়তি কমে গ্যালো–আজ দিল্লী দখল হলো–নানা পালালেন–জং বাহাদুরের সাহায্যে লক্ষ্ণৌ পাওয়া হলো। মিউটীনি প্রায় সমুদায় সেপাইরে ফাঁসিতে, তোপেতে ও তলওয়ারের মুখেতে শেষ হোলেন—অবশিষ্টেরা ক্যানিংয়ের পলিসিতে ক্ষমা প্রার্থনা করে বেঁচে গ্যালেন।
ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী পুরোণো বছরের মত বিদেয় হলেন—কুইন স্বরাজ্য খাস প্রক্লেম কল্লেন; বাজী, তোপ ও আলোর সঙ্গে মায়াবিনী আশা ‘কুইনের খাসে প্রজার দুঃখ রবে না’ বাড়ী বাড়ী গেয়ে বেড়াতে লাগলেন; গর্ভবতীর যত দিন একটা না হয়ে যায়, তত দিন যেমন ‘ছেলে কি মেয়ে’ লোকের মনে সংশয় থাকে, সংসার কুইনের প্রোক্লেমেশনে সেইরূপ অবস্থায় স্থাপিত হলো।
মিউটীনির হুজুক শেষ হলো–বাঙ্গালীর ফাঁসী-ছেঁড়া অপরাধীর মত সে যাত্রা প্রাণে প্রাণে মান বাঁচালেন; কারু নিরপরাধে প্রাণদণ্ড হলো, কেউ অপরাধী থেকেও জায়গীর পেলেন। অনেক বামুনে-কপাল ফলে উঠলো; যখন যার কপাল ধরে—ইত্যাদি কথার সার্থকতা হলো। রোগ, শোক ও বিপদে যেমন লোকে পতিগত স্ত্রীর মুল্য জানতে পারে, সেইরূপ মিউটীনির উপলক্ষে গবর্ণমেণ্টও বাঙ্গালী শব্দের কথঞ্চিৎ পদার্থ জানতে অবসর পেলেন; ‘শ্রীবৃদ্ধিকারীরা’ আশা ও মানভঙ্গে অন্তরে বিষম জ্বালায় জ্বলিতেছিলেন, এক্ষণে পোড়া চক্ষে বাঙ্গালীদের দেখতে লাগলেন–আমরাও স্কুল ছাড়লেম। আঃ! বাঁচলেম—গায়ে বাতাস লাগলো।
১.১০ মরা-ফেরা
আমরা ছেলেবেলাতেই জ্যাঠার শিরোমণি ছিলেম; স্কুল ছাড়াতে জ্যাঠামি, ভাতের ফ্যানের মতন, উথলে উঠলো; (বোধ হয় পাঠকেরা এই হুতোমপ্যাঁচার নক্সাতেই আমাদের জ্যাঠামির দৌড় বুঝতে পেরে থাকবেন) আমরা প্রলয়-জ্যাঠা হয়ে উঠলেম—কেউ কেউ আদর করে ‘চালাকদাস’ বলে ডাকতে লাগলেন।
ছেলেবেলা থেকেই আমাদের বাঙ্গালা ভাষার উপর বিলক্ষণ ভক্তি ছিল, শেখবারও অনিচ্ছা ছিল না। আমরা পূর্ব্বেই বলেছি যে, আমাদের বুড়ো ঠাকুরমা ঘুমোবার পূর্ব্বেই নানাপ্রকার উপকথা কইতেন। কবিকঙ্কণ, কৃত্তিবাস ও কাশীদাসের পয়ার আওড়াতেন। আমরাও সেইরূপ মুখস্থ করে স্কুলে, বাড়ীতে ও মার কাছে আওড়াতেম–মা শুনে বড় খুসী হতেন ও কখন কখন আমাদের উৎসাহ দেবার জন্যে ফি পয়ার পিছু একটি করে সন্দেশ প্রাইজ দিতেন; অধিক মিষ্টি খেলে তোৎলা হতে হয়, ছেলেবেলায় আমাদের এ সংস্কার ছিল; সুতরাং কিছু আমরা আপনারা খেতুম, কিছু কাগ ও পায়রাদের জন্যে ছাদে ছড়িয়ে দিতুম। আর আমাদের মঞ্জুরী বলে দিব্বি একটি সাদা বেড়াল ছিল, (আহা! কাল সকালে সেটি মরে গ্যাছে—বাচ্চাও নাই) বাকী সে প্রসাদ পেতো। সংস্কৃত শেখাবার জন্যে আমাদের এক জন পণ্ডিত ছিলেন, তিনি আমাদের লেখা-পড়া শেখাবার জন্যে বড় পরিশ্রম কত্তেন। ক্রমে আমরা চার বছরে মুগ্ধবোধ পার হলেম, মাঘের দুই পাত ও রঘুর তিন পাত পড়েই আমাদের জ্যাঠামোর সুত্র হলো; টিকী, ফোঁটা ও রাঙ্গা বনাতওয়ালা টুলো ভট্টাচাৰ্য্য দেখলেই তক্ক কৰ্ত্তে যাই, ছোঁড়াগোচের ঐ রকম বেয়াড়া বেশ দেখতে পেলেই তর্কে হারিয়ে টিকী কেটে নিই; কাগজে প্রস্তাব লিখি–পয়ার লিখতে চেষ্টা করি ও অন্যের লেখা প্রস্তাব থেকে চুরি করে আপনার বলে অহঙ্কার করি—সংস্কৃত কলেজ থেকে দূরে থেকেও ক্রমে আরও ঠিক একজন। সংস্কৃত কলেজের ছোকরা হয়ে পড়লেম; গৌরবলাভেচ্ছা হিন্দুকুশ ও হিমালয় পর্ব্বত থেকেও উঁচু হয়ে উঠলো—কখন বোধ হতে লাগলো, কিছুদিনের মধ্যে আমরা দ্বিতীয় কালিদাস হবো; (ওঃ বিষ্ণু, কালিদাস বড় লম্পট ছিলেন) তা হওয়া হবে না, তবে ব্রিটনের বিখ্যাত পণ্ডিত জনসন? (তিনি বড় গরীবের ছেলে ছিলেন, সেটি বড় অসঙ্গত হয়)। রামমোহন রায়? হাঁ, একদিন রামমোহন রায় হওয়া যায় কিন্তু বিলেতে মত্তে পারবো না।
ক্রমে কি উপায়ে আমাদের পাঁচজনে চিনবে, সেই চেষ্টাই বলবর্তী হলো; তারি সার্থকতার জন্য আমরা বিদ্যোৎসাহী সাজলেম—গ্রন্থকার হয়ে পড়লেম—সম্পাদক হতে ইচ্ছা হলো—সভা কল্লেম—ব্রাহ্ম হলেম-তত্ত্ববোধিনী সভায় যাই—বিধবাবিয়ের দলাদলি করি ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রভৃতি বিখ্যাত দলের লোকদের উপাসনা করি—আন্তরিক ইচ্ছে যে, লোকে জানুক যে, আমরাও ঐ দলের ছোট খাট কেষ্ট বিষ্টুর মধ্যে।
হায়! অল্পবয়সে এক একবার অবিবেচনার দাস হয়ে আমরা যে সকল পাগলামো করেছি, এখন সেইগুলি স্মরণ হলে কান্না ও হাসি পায়; অবিরি এখন যে পাগলামী প্রকাশ কচ্চি, এর জন্য বৃদ্ধবয়সে অনুতাপ তোলা রইলো! মৃত্যু-শয্যার পাশে যবে এইগুলির ভয়ানক ছবি দেখা যাবে, ভয়ে ও লজ্জায় শরীর দাহ কত্তে থাকবে, তখন সেই অনন্য-আশ্রয় পরমেশ্বর ভিন্ন আর জুড়াবার স্থান পাওয়া যাবে না! বাপ-মার কাছে মার খেয়ে ছেলেরা যেমন তাঁদেরই নাম করে, ‘বাবা গো–মা গো, বলে কাঁদে, আমরা তেমনি সেই ঈশ্বরের অজ্ঞা লঙ্ঘননিবন্ধন বিপদে পড়ে তার নাম ধরেই,—পাঠক! তোমায় ভেংচুতে ভেংচুতে ও কলা দেখাতে দেখাতে তরে যাব।
