অনেক রাতে শুতে এসে প্রতি বছরের মতো এই বছরেও ইন্দুবালা তার হিসেবের খাতা টেনে নেন। একটা সাদা পাতায় লাল কালিতে লেখেন ‘শুভ বিজয়া। সেটা যে কাকে লেখেন, কেন লেখেন আজ পর্যন্ত কেউ জানে না।
৮. কচু বাটা
৮. কচু বাটা
বয়েস বাড়ার সাথে সাথে বেশ কিছু উপসর্গ দেখা দিয়েছে ইন্দুবালার জীবনে। যেগুলো আগে ছিল না। কিন্তু এখন আছে। সারাদিন এক নাগাড়ে কাজ করে বেড়ানো মানুষটার এখন বেলার দিকে একটু ঝিমুনি ধরে। ইদানিং ভাত খেয়ে উঠলে হয়। তখন ইন্দুবালার আর কিছু করতে ইচ্ছে করে না। শরীর যেন আর চলে না। তার সাথে কলকাতার বাতাসে উত্তরের শিরশিরানি খেললে শরীরটা একটু রোদ চায়। হাত-পাগুলো মনে হয় রোদে পোহাই। কিন্তু সেই ফুরসত কি আছে ইন্দুবালার? তাঁর হোটেলে আসা মানুষগুলো তো সবে ভাত খেয়ে যে যার কাজে গেছে। দুপুরের পড়ন্ত রোদে তার একটা হিসেব রাখার আছে। কজন খেলো। কজন এলো না। কারা আবার ওবেলা আসবে। কাদের বাড়িতে পাঠাতে হলো। কাদের শুধু ঘন্ট আর পোস্তোর বড়া অর্ডার হলো। কতটা বাঁচলো। কতটা না। এইসব বিস্তারিত লেখালেখির একটা খাতা ইন্দুবালার আছে। সেই একাত্তর সন থেকে। এটা যদি হিসেবের খাতা হতো তাহলে কিছু বলার ছিল না। কিন্তু এখানে টাকার অঙ্কে কিছু মেলানো থাকে না। যা থাকে তাতে আরও নানান কিছু যোগ হয়। এত পুরনো এক জাদা খাতা এতদিনে শেষ হয়ে যাবারই কথা ছিল, কিন্তু হয়নি। তার কারণ বছর বছর ইন্দুবালা সেই খাতার সঙ্গে আবার পাতা জোড়েন। মোড়ের মাথায় গণেশ বাইণ্ডিং থেকে আগে হারান আসতো। পয়লা বৈশাখের আগের দিন সেই খাতায় বড় ঝুঁচ ঢুকিয়ে ফুটো করে জোড়া হতো পাতা। সেলাই করে আবার খাতার গায়ে জামা করে দিতেন ইন্দুবালা। সেই নতুন জামা আবার পরের বছরে পালটে যেত। গেলবার হারান চোখ বোজার পর তার ছেলে শিব আসে। ইন্দুবালা নিজে সেই খাতা নাড়া চাড়া করতে পারেন না এখন আর। ওপরের ঘরে টেবিলের ওপরে রাখা থাকে। প্রতিদিন সেই খাতায় ইন্দুবালা নানা কিছু লিখে রাখেন। তার সাথে ফুল তোলা নক্সা। সোয়েটারের মাপ। দিদা বলে ঝাঁপিয়ে পড়া ছেলে-মেয়েগুলোর ফোন নাম্বার, আরও কত হিজিবিজি।
ধনঞ্জয় বলে ওটা নাকি চিত্রগুপ্তের খাতা। বুড়ি পরপারে গিয়েও হিসেব মেলাবে। কিন্তু কী হিসেব, সেটা ধনঞ্জয় জানে না। বড় নাতনি সুনয়নী একবার দেখেছে সেই খাতায় আছে নানা রান্নার কথা। কিছু কিছু ইন্দুবালার কথাও। সেই যে গেলবার সে বিদেশ থেকে এসে তার ঠাম্মার কাছে থাকলে বেশ কয়েকমাস তখন এটা সেটা নেড়ে চেড়ে দেখেছে মেয়ে। আর অবাক হয়েছে। এতো সুন্দর গুছিয়ে লিখতে পারে তার ঠাম্মি? একটা সাদা কালো ছবিও পেয়েছিল সে খাতাটার মধ্যে। ইন্দুবালার বিয়ের আগের ছবি। কোনো এক নড়বড়ে স্টুডিওতে গিয়ে তোলা। তাঁকে দেখালে বলেছিলেন কলাপোতা থেকে নৌকা করে টাউনে গিয়ে কোনো এক স্টুডিওতে তুলেছিলেন ছবিটা। এই ছবি দেখেই নাকি তাঁর শাশুড়ি শেফালীরানীর পছন্দ হয়েছিল। সুনয়নী জানতে চেয়েছিল “আর দাদু? তিনি কিছু বলেননি?” ইন্দুবালা কোনো উত্তর দেননি নাতনির কথার। “কাজের সময় বিরক্ত করিস না” বলে বড়জোড় একটু ধমকে দিয়েছিলেন। সুনয়নী এই বাড়িতে তার দাদুর ছবি দেখেনি। এমনকি বাবা, কাকা, পিসি কারও কাছেই নয়। “কেমন ছিল দাদুকে দেখতে ঠাম্মি? কেন দাদুর ছবি একটাও নেই বাড়িতে?”পাগল করে দিত মেয়েটা প্রশ্ন করে করে। এমনকি বিয়ের একটা ছবি পর্যন্ত নেই কেন? আশ্চর্য হতো সুনয়নী। এটা কিছুতেই সে বুঝতে পারতো না থাকবে কী করে? সেই অজ গাঁয়ে কি আর ফটোগ্রাফার ছিল? খুলনা শহর থেকে কিংবা ঢাকা থেকে নিয়ে আসতে হতো তাদের। ইন্দুবালাকে বিয়ে দিতে গিয়ে বাবার আর একটুও খরচ করার মতো অবস্থা ছিল না তখন। ছেলেকে পণ না দিতে হলেও মেয়ের গয়না গড়ার ছিল। ইণ্ডিয়াতে মেয়েকে পাঠানোর খরচ ছিল। তার সাথে আশেপাশে গ্রামের মানুষদের আপ্যায়ন, খাতির যত্নে কম খরচ হয়েছে নাকি? কাজেই কোনো ছবি ওঠেনি। এমনকি শ্বশুরবাড়িতে এসেও না। বউভাত হয়নি। লোকজন আসেনি। তাহলে আর ছবি উঠবে কোথা থেকে? ফুলশয্যার দিন অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিলেন মাস্টার রতনলাল মল্লিক। তার পরদিন বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে আবার বেরিয়ে গিয়েছিলেন। শাশুড়ি কতবার বলেছিলেন ছেলেকে, “রতন বৌমাকে নিয়ে একটা ফটো তুলে আয় বাবা”। আজ যাবো কাল যাবো বলে আর যাওয়া হয়নি রতনের। নিমতলা শ্মশানে যেদিন মড়ার খাট ধরে বসেছিলেন ইন্দুবালা, একটি সিঁড়িঙ্গে মতো লোক গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে এসে বলেছিল “কি গো মা ছবি তুলবে নাকি? শেষ স্মৃতি বলে কথা”। লছমীর মুখ ঝামটায় পালানোর পথ পায়নি সে। কাজেই ইন্দুবালার এই বাড়িতে তাঁর স্বামীর কোনো ছবি নেই। আলতা ছাপ পায়ের চিহ্ন নেই। যাবতীয় যা কিছু তিনি সেই শ্মশানেই অস্থির সাথে ভাসিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সত্যিই কি তাই? তার বংশরাই তো ঘুর ঘুর করে বেড়াচ্ছে চোখের সামনে। ঠাম্মা, দিদা, মা বলে ডেকে চলেছে। জানতে চাইছে মাস্টার রতনলাল মল্লিকের ছবির কথা। এইসব কিছু ওই খাতায় লেখা নেই। ইন্দুবালা লেখেননি। নিজের মনের রাগ, দুঃখ, অভিমান, কষ্ট সেগুলো বড় আপনার। নিজের কাছেই রেখে দিতে হয়। না হলে যে মানুষটাকে তার বংশের কেউ দেখলো না জানলো না তার সম্পর্কে খারাপ কথা তাদের মনে বাজবে। ইন্দুবালা কোনোদিন ছেলে মেয়েদের কাছে তার বাবার কোনো প্রসঙ্গ উত্থাপন করেননি। নিন্দা মন্দও না। এই বাড়ির রেওয়াজ মেনে শুধু মৃত্যুদিন পালন হয়েছে। শাশুড়ির আমলে ব্রাহ্মণ খাওয়ানো হতো। সবাই চলে যাওয়ার পর ইন্দুবালা সেইসব প্রথা তুলে দিয়েছেন। অনেক দিন পরে সুনয়নী প্রশ্ন করলে একবার ভেবেছিলেন সব বলবেন। তারপর ভাবলেন থাক। যা মা গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে এসেছেন তার দিকে ফিরে তাকাবেন না। ওটা নিজের কাছে খুব সংগোপনে থাক।
