খাতাটা এতটাই ভালো লেগে গিয়েছিল সুনয়নীর সারাদিন সেটা নিয়ে বসে থাকতো। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তো সব কিছু। দেখতো। নোট রাখতো তার আই প্যাডে। ঠাম্মিকে যেন একটু একটু করে চিনতে পারছিল সে। বারবার মনে হয়েছিল কেন আগে তার ঠাম্মিকে সে এত কাছ থেকে দেখেনি। কেন আরও অনেক অনেক কথা জানতে চায়নি। সবটা যে পেরেছিল তা নয়। কিন্তু সুনয়নী এটা বুঝেছিল তার চারপাশে দেখা মানুষগুলোর থেকে ইন্দুবালা কতটা আলাদা। চিন্তায়, ভাবনায়, জীবনে চলার পথে। এই খাতাটা নিয়ে সুচিন্তিত পরিকল্পনা ছিল তার। একদম যেমন আছে এই জাবদা খাতাটা ঠিক সেই ভাবে যদি তাকে ছাপানো যায়। তাহলে তো একটা সময়ের ইতিহাস বেরিয়ে আসবে। যে ইতিহাসের কথা কোন পাঠ্য বইতে লেখা থাকে না। এমনকি সমাজ ইতিহাসের গভীরে যাঁরা উঁকি দেন সেই সব গম্ভীর প্রবন্ধেও না। তার চেয়ে এই খাতাটা ছাপা হলে একজন একলা মহিলার পথ চলাটা বেশ পরিষ্কার ধরা পড়বে সময়ের নিরিখে। নিজের মতো করে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল সুনয়নী তার ঠাকুমাকে। এমনকি এটাও বলেছিল যেগুলো পছন্দ নয় সেগুলো রাখা হবে না বইটাতে। ইন্দুবালার একটুও পছন্দ হয়নি ব্যাপারটা। “হিসেবের খাতা কার কোন কাজে লাগে দিদিভাই? তুই আর নাড়াঘাঁটা করিস না ওটাকে। একেই যা অবস্থা।” সুনয়নী তবুও হাল ছাড়েনি। শেষ খড়কুটো আঁকড়ে থাকার মতো বলেছে, “অন্তত রান্নাগুলো ছাপাই। সবাই তো ভুলে গিয়েছে ঠাম্মি। তোমার মতো ছাঁচড়া কেউ রান্না করতে পারে? সেটাই না হয় জানুক লোকজন।” ইন্দুবালা হেসেছেন মেয়ের কথা শুনে। “ছ্যাঁচড়ার কথা কেউ পড়বে না দিদিভাই। তুই বরং তার লেখা পড়ার বই বার কর। সবাই পড়বে।” নাতনি থামতে চায় না। বারবার ফোন করে। বন্ধুদের দেখাবে বলে বায়না করে। ইন্দুবালা একদিন নিরুপায় হয়ে বলে দেন, “আমি আগে মরি, তারপর না হয় যা খুশি করিস তোরা”। এরপর আর কোনো কথা বলা যায় না। মোক্ষম বার্তাটা তাই এক্কেবারে শেষেই দ্যান। ইন্দুবালার হোটেলে যে কটা জিনিস সেই পুরোনো আমল থেকে রয়ে গেছে এই খাতা খানাও তার মধ্যেই পড়ে। সেটাকে কী করে তিনি বাইরের লোকের হাতে তুলে দেন? সুনয়নী পড়ছে পড়ুক। কিন্তু তার সাথে তার বন্ধু বান্ধবরাও পড়বে? রাজ্যের যত লোক জেনে যাবে ওই খাতাটার মধ্যে কী আছে। ওমা তাই কখনও হয় নাকি? ওর পাতায় যে জিরান দেওয়া আছে মনিরুলের বকুল ফুল। লছমীর বাড়ির তেজপাতা। তিন ছেলে-মেয়ের হাত ছাপ। অলোকের ফেলে যাওয়া নিষিদ্ধ ইস্তেহারের একটা পাতা। আরও যে কত কী, তা না দেখলে কল্পনাও করা যাবে না। অলোক খুব সুন্দর শিস দিয়ে একটা গান করতো। কীসের ভয় সাহসী মন লাল ফৌজে লাফিয়ে হই পার’। গানটাও লেখা আছে সেখানে। চোখ বন্ধ করেন ইন্দুবালা। সুরটা খোঁজার চেষ্টা করেন। পারেন না। কারেন্ট অফের সেই রাতগুলোকে হাতড়ান। কোথায় তারা? যে দিনগুলোকে ইন্দুবালা নিজেই ফিরে পান না, সেইসব কিছু তিনি দুহাত উজিয়ে দিয়ে দেবেন কী করে? থাকবার বলতে এইটুকুই তো তাঁর নিজের। স্মৃতির বিসর্জন মানে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়া।
ধনঞ্জয় ছাদ থেকে কাপড় তুলতে এলে বুড়িকে দেখে মায়া হয় তার। বারান্দায় মাদুর পেতে বসে বুড়ি ঝিমোচ্ছে। মাথা নেমে এসেছে পায়ের কাছে। একটা বালিশ নিয়ে রোদটায় শুলে কী হয়? সারা জীবন কারোর কথা কোনোদিন শুনলো না। দুপুরের পর কতবার সে বলেছে “ওগো মা একটু এলিয়ে এসো দিকিনি গা খানা বিছানায়”। বুড়ি কথা শোনেননি। এত কাজ কাজ করে মাথা খায় বুড়ি যে কারো দম ফেলার সময় থাকে না। ঘর থেকে বালাপোশটা এনে বুড়ির গায়ে চাপা দেয় ধনঞ্জয়। যত্ন করে পায়ের ওপর দিয়ে টেনে দেয় তা। মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে বসে থাকে। যার সব থাকতেও কেউ নেই। যার ঘর আলো করা সংসার। দুই ছেলে, মেয়ে তাদের সব বাচ্চারা। হইহই করে মাথায় করে তুলে রাখতো তোমাকে। এইভাবে কেন এত কষ্ট করে আছো মা? একবার মুখ ফুটে বললেই তোমার সন্তানরা চলে আসবে তোমার কাছে। যা চাইবে তাই দেবে। রাজরানী হয়ে থাকবে মা। এক বিশাল সংসারের মধ্যমণি হয়ে। ভালো লাগবে না তখন? চাল ধুতে ধুতে ইন্দুবালা ধনঞ্জয়কে বলেছিলেন, “ওরকমটা সবার মনে হয় রে ধনা। বোঝাকে বেশিক্ষণ মানুষ ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে রাখতে পারে না। মনে হয় কতক্ষণে নামাবে সে মাটিতে। আমি কারো বোঝা হতে চাইনা রে”। ধনঞ্জয় কী বুঝেছিল কে জানে, শুধু সেদিন আর আগ বাড়িয়ে ঝগড়া করতে যায়নি। বুড়ি নিজেই তার কাজ খুঁজে নিয়েছিল বিস্তর। যত খাটছিলেন ইন্দুবালা হোটেলকে নিয়ে, তত তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ছিল দিকে দিকে। এবেলার রান্না কোনদিন ওবেলা কাউকে খাওয়াননি তিনি। কোনো খাবার নষ্ট হতে দেননি কোনোদিন। বেঁচে যাওয়া খাবার কোথায় কোথায় যাবে তারও একটা নির্দিষ্ট ঠিকানা তৈরী করে ফেলেছিলেন। সেইসব মানুষগুলো আজও অনেক আশা নিয়ে বসে থাকে।
রান্নাঘরের উনুনটা এখনও আগের মতো নিজের হাতেই পরিষ্কার করেন। মাঝে মাঝে ধনঞ্জয় করে না এমনটা নয়। কিন্তু নিজে করলে সুখ পান ইন্দুবালা। যত্ন করে মাটির প্রলেপ বোলান উনুনের গায়ে। আজকের উনুন? কত জন্ম জন্মান্তর ধরে মল্লিক বাড়ির লোকজন এই উনুনে চাল ফুটিয়ে দুবেলা ভরপেট খেয়েছে। রান্না তো আর শুধু রান্না নয়। যেন অগ্নিকে উপাসনা। আঁচের একটু এদিক ওদিক হলে সব ভণ্ডুল হবে। নড়ে চড়ে বসে বুড়ি। বালাপোশের গরমে আরাম পেয়েই হোক কিংবা ঝিমিয়ে পড়া দুপুরে ঘুমন্ত আঁচের কথা ভাবতে ভাবতেই হোক ইন্দুবালার ঘুম কাটে। সামনে দেখেন হাঁ করে চুপটি করে বসে আছে ধনঞ্জয়। মুখের দিকে তাকিয়ে। ইন্দুবালা হাসেন। “এখনও বেঁচে আছি রে ধনা। মরিনি। এই দ্যাখ শ্বাস প্রশ্বাস চলছে এখনও”। বিকেলের শেষ আলো তখন জানলার ওপর ঘেঁষে চলে যাচ্ছে। ইন্দুবালা হুড়মুড় করে উঠতে যান। “আমার না হয় ভিমরতি ধরছে তাই বলে তোর কোনো আক্কেল জ্ঞান থাকবে না? বেলা যে পড়ে এলো। কাজ কত বাকি তার কি খেয়াল আছে?” ইন্দুবালা চাটাই গোটান। বালাপোশ ভাঁজ করেন। ধনঞ্জয় সুড়সুড় করে সরে পড়ে সেখান থেকে। বসে থাকলে বুড়ির গজগজ কানে শেলের মতো বিধবে। তখন আবার দুটো কথার উত্তর না দিয়ে ঝগড়া না করে স্বস্তি পাওয়া যাবে না।
