ঠাম্মা তাকিয়ে থাকে ফর্সা হয়ে আসা আকাশের দিকে। কাঠের উনুন প্রায় নিভে গেছে। উঠোনখানা ভর্তি হয়ে আছে হাতে গড়া ঠাম্মার চন্দ্রপুলিতে। “মেয়ে মানুষের এত কান্না কিসের? বুকে পাথর না বসাতে পারলে মেয়ে মানুষ হয়েছিস কী জন্য তুই? যা সাজি ভরে শিউলি ফুল তুলে নিয়ে আয়তো দিদিভাই। বোধনের পুজোতে লাগবে। সঙ্গে কয়েকটা চন্দ্রপুলি নিয়ে যা। যাকে ভালো লাগবে তাকে দিস। জীবনে বিলিয়ে দেওয়ার চেয়ে আনন্দ আর কিছুতে নেই রে”। ইন্দুবালা শাড়ির আঁচলে বাঁধে চন্দ্রপুলি। সাজি নিয়ে সারা রাত না ঘুমোনো চোখে কন্যে চলে ফুল তুলতে। কিন্তু কোনদিকে যাচ্ছে সে? এ তো ভটচাজ পাড়া নয়। বিশালক্ষ্মী তলা পেরিয়ে সে যাচ্ছে মোক্তার পাড়ায়। কেন যাচ্ছে সে? অনেক ভোরে মোক্তার পাড়ার মাঠে শিউলি গাছটার নীচে কারা যেন সাদা চাদর মেলে বসে থাকে। সেই চাদরের টুকরোগুলো কুড়িয়ে সাজিতে ভরতে ভালো লাগে ইন্দুবালার। শরতের এই ভোরেও কেমন যেন হেমন্তের হাওয়া দিচ্ছে। শিরশির করছে গা। চারিদিকে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মতো কুয়াশা জমাট বেঁধে আছে। থমকে দাঁড়ায় ইন্দুবালা শিউলি গাছটার সামনে এসে। কে ওখানে দাঁড়িয়ে? কে? এগিয়ে আসে মনিরুল। “এতো ভোরে এখানে কী করছিস?” কোনো কথা না বলে চলে যাচ্ছিল মনিরুল। যদিও সে জানতো এই গাছেরই ফুল কুড়োতে আসবে ইন্দুবালা। তাকে আসতেই হবে। সারা রাত তো ঘোরের মধ্যে এঁকেছে ইন্দুবালার চোখ। কাজল দিয়ে। টানা টানা। ইন্দুবালা ডাকে “মনিরুল…”। দাঁড়িয়ে পড়ে ছেলেটা। এগিয়ে আসে ইন্দুবালা। মনিরুল বিড়বিড় করে। কোনো এক শরৎ সকালে জীবনের প্রথম ভালোবাসার জন্য মিথ্যে কথা বলে “আমি জানতাম না তুই এখানে আসবি…। আমি তো…।” ইন্দুবালা হাত দিয়ে চাপা দেয় মনিরুলের ঠোঁট। যেন ছ্যাঁকা লাগে মনিরুলের। এতো তাপ কীসের? ইন্দুবালার হাত কাঁপছে। সে তাকিয়ে আছে মনিরুলের দিকেই। “আমাদের ঠাকুর ঘরে নবদ্বীপ থেকে আনা অনেক পুরোনো একটা কেষ্ট ঠাকুর আছে। ঠাম্মার শাশুড়ি তার শাশুড়ির ঠাকুর সেটা। তুই তার মতো চোখ কেন পেলি রে মনিরুল? সারাক্ষণ আমার চোখে ভাসে।” আস্তে আস্তে সরিয়ে নিয়েছিল ঠোঁটের ওপর থেকে হাতটা। বাড়ি ফিরে কতবার সেই হাত নিজের ঠোঁটের উপর রেখেছিল ইন্দুবালা। তার আগে শাড়ির খুঁট খুলে মনিরুলের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল সারা রাত ধরে তার আর ঠাম্মায় মিলে করা চন্দ্রপুলি। “ঠাম্মা বলেছে যাকে ভালো লাগবে তাকে দিস”। আর একটাও কথা না বলে, একটাও শিউলি ফুল না কুড়িয়ে খালি সাজি নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিল মেয়ে। সেবার ইন্দুবালা বিছানায় শুয়ে কাটিয়েছিল পুজোটা। ধুম জ্বরে দশমীর সকালে দেখেছিল তার জানলার কাছে রাখা আছে এক মুঠো শিউলি ফুল। ছোট্ট চিরকুটে লেখা ছিল, “মা দুগগা বললো যাকে ভালো লাগে তাকে দিও”। সেদিন মনিরুলের হাতের লেখা চিনতে একটুও দেরি হয়নি ইন্দুবালার। দুজনের ভালো লাগা কোনো এক শরতের সকালে চন্দ্রপুলি আর শিউলি ফুলে মিলে গিয়েছিল। তারও অনেক দিন পরে কোনো এক শরতের মন কেমন করা দিনে কপোতাক্ষের পলি কাদা মেখে পড়ে ছিল মুক্তিযোদ্ধা মনিরুলের দেহ। সে বছর সেই গ্রামে কোনো দুর্গাপুজো হয়েছিল কিনা জানেন না ইন্দুবালা। সেই বছর তো যুদ্ধ। নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন সবার চোখে। সেই চোখগুলো খুঁজে খুঁজে গঙ্গা জলে কালো তিল দিয়ে তর্পণ করেন ইন্দুবালা। পুজোতে তাই মন ভালো থাকে না তাঁর। পুজো কাটে বিষণ্ণতায়।
সকালে উঠে ধনঞ্জয় দেখে কাঁচের বয়ামে ভর্তি করে রাখা আছে চন্দ্রপুলি। ইন্দুবালা তখন কুচো গজা ভাজছেন। ঠিক করে রেখেছেন ওবেলায় লবঙ্গ লতিকা করবেন। ধনঞ্জয় বুঝতে পারে না এটা কি ইন্দুবালার পাগলামো না জেদ? “সারা রাত এইসব করে তুমি তো মরবেই। তোমার ছেলেরা আমাকে জেলে দেবে।” ইন্দুবালা কুচো গজা ছাঁকনি দিয়ে তুলে চিনির রসে ভিজিয়ে দিয়ে বলেন, “আহা ধনা তুই ওইভাবে বলিস না। ছেলে-মেয়েগুলো বিজয়ার পরে এসে একটু মিষ্টি মুখ করবে না? ওই যে চাঁদা তুলতে এসেছিল নন্টু পিন্টু। বাজারের লোকগুলো। কালেক্টার অফিসের বাবুরা। এদের একটু দেবো না হাতে তুলে?” হোটেল যবে থেকে শুরু হয়েছিল সেই বছর পুজো থেকেই বিজয়ার মিষ্টি শুরু করেছিলেন ইন্দুবালা। সেই সময়ে লছমী থাকতো। হাতে হাতে কাজগুলো করে দিত মাঝে মাঝে। দুই ছেলে, মেয়েও সাহায্য করতো অল্প স্বল্প। একটু বড় হলে তারা ঠাকুর দেখার নাম করে কেটে পড়তো যে যার মতো। শুধু ইন্দুবালা থেকে যেতেন একা। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী কেটে যেত তাঁর রান্নাঘরে বিজয়ার মিষ্টি তৈরীতে। তাঁর না ছিল নতুন কাপড় পরা। না ছিল প্যাণ্ডেলে গিয়ে অঞ্জলি দেওয়া। সেসব তিনি বিয়ের আগে কলাপোতার কপোতাক্ষে বিসর্জন দিয়ে এসেছিলেন অনেক দিন আগেই।
দশমীর সন্ধ্যেতে বৃষ্টি নামে ঝমঝম করে। সেই বৃষ্টির মধ্যেই ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের সামনে এক এক করে গাড়ি এসে দাঁড়ায়। বড় খোকা আসে। ছোটো খোকা। তাদের বউরা। নাতি-নাতনি সবাই। প্রণাম করে। একতলা থেকে দোতলা সবাই হইচই করে দাপিয়ে বেড়ায়। মায়ের হাতে তৈরী চন্দ্রপুলি, কুচোগজা, লবঙ্গ লতিকা, নিমকি সবাই পেট পুরে খায়। ব্যাগ ভর্তি করে নিয়ে যায়। ওরা সবাই গল্প করে। ওদের মাঝে বসেই ইন্দুবালা চুপ করে শোনেন সেই গল্প। কোথায় কোন ঠাকুর কত বড় হলো। কে প্রাইজ পেলো। তাঁতের সবচেয়ে দামি শাড়িটা পরতে গিয়ে বড় বউয়ের কী হলো? নাতি নাতনিরা কীভাবে পুজো কাটালো। কোথায় কত লোক হলো। অঞ্জলি দিতে গিয়ে পুরোহিত কেমন বাজে করে মন্ত্র পড়ছিল। ছোটো বউরা কোন রেস্টুরেন্টের খাবার খেতে গিয়ে একেবারে মুখে তুলতে পারেনি এইসব। তার মধ্যে খুকি ব্যাঙ্গালোর থেকে ভিডিও কল করলে ওদের নিজেদের মধ্যে গল্প আরও বাড়ে। সবাই সবার সাথে কথা বলে। কিন্তু ওদের সবার মধ্যে বসে থেকেও ইন্দুবালার কিছু গল্প করার থাকে না। ছেলেরাও একবারের জন্যেও জানতে চায় না তাদের মা কোথাও গিয়েছিল কিনা। অঞ্জলি দিয়েছে কিনা। তারা জানে তাদের মায়ের ধর্ম কর্ম সব ওই একটিই। ইন্দুবালা ভাতের হোটেল। ঠাকুরের আপ্ত বাক্য যা সারা জীবন ধরে মেনে চলেছেন, “জীবে প্রেম’। আর কে না জানে খাওয়া ছাড়া প্রেম সম্পূর্ণ হয় না? তাই ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’ নামের এক নির্জন দ্বীপে ইন্দুবালা সেই ভালোবাসার পসরা সাজিয়ে রাখেন। সবাই আসে তাদের ভালোবাসা ভাগ করে নেয়। কিন্তু ইন্দুবালার কিছু ভাগ করার থাকে না। তিনি শুধু অফুরন্ত বিলিয়ে চলেন তাঁর স্মৃতি রান্নার এক পদ থেকে অন্য পদে। যারা বুঝতে পারে তারা একটু বেশি আনন্দ পায়। আর যারা খাবারের সাথে মজে থাকে তারা শুধু রসনায় মজা পায়। ভেতরের মানুষটার নয়।
