ওদিকে চণ্ডীমণ্ডপে ততক্ষণে মা দুগগার চোখ আঁকা হচ্ছে। কুমুদ পাল তার শিল্পী হাতের ছোঁওয়ায় দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করছেন। কপোতাক্ষের মাটির ঠাকুরও যেন জ্যান্ত হয়ে উঠছে একটু একটু করে। কিন্তু এইসব তখন আর ভালো লাগছে না ইন্দুবালার দেখতে। মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেছে তার। বাড়ি চলে যাচ্ছে ইন্দুবালা। কেন অমন করে বলতে গেল সে মনিরুলকে? কী ক্ষতি হতো মনিরুল দুগগার চোখ আঁকা দেখলে? সবাই তো দেখছিল। ওই অতসীটাই হচ্ছে যত নষ্টের গোড়া। ইন্দুবালাকে বলে কিনা ছেলে ঢলানি? যত রাগটা সে অতসীর দিকে নিয়ে যেতে চায় তত রাগ গড়িয়ে আসে নিজের দিকে। ঠিক করলো কী ইন্দুবালা? নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে অমন করে বললো সে? প্রত্যেক বছরই তো মনিরুল চণ্ডীমণ্ডপে আসে। ওদের সাথেই ঠাকুরের রঙ করা দেখে। এবার কেন মনিরুলকে তার অন্যরকম মনে হচ্ছে? কেন বারবার মনে হচ্ছে এইসব কিছু আসলে মনিরুলের জন্যে করছে সে। মা দুর্গার চোখ আঁকা দেখে এসে ভেবেছিল সে একটা বড় চিঠি লিখবে মনিরুলকে। এবার যদি মনিরুল সেখানেই এসে গেল তাহলে লিখবে কী করে? আর যদি লেখেও তাহলে কী থাকবে সেই চিঠিতে! এমন কিছু তো আর নেই যা দেখেনি মনিরুল! “আমি তোকে ওইভাবে বলতে চাইনি মনিরুল। আমি আসলে আমার আনন্দগুলো তোকে লুকিয়ে চিঠিতে লিখতে চেয়েছিলাম”। থমকে দাঁড়ায় ইন্দুবালা অন্ধকারে আমলকি গাছটার নীচে। এইসব কী ভাবছে সে? নিজের গোপন আনন্দগুলো লিখতে চায় মনিরুলকে? ভালোবেসে ফেললো নাকি ছেলেটাকে? অন্ধকারে পুকুর পাড়ের সেই আমলকি গাছের তলায় দাঁড়িয়ে নিজেই যেন নিজের মুখ চাপা দেয় ইন্দুবালা। কী বলছে সে? এক মুসলমান ছেলের সাথে এক হিন্দু মেয়ের বিয়ে? এই গ্রামের কেউ হতে দেবে না। কোনোদিন না। ঠিক সেই সময়ে ঝোঁপ থেকে বুড়ো তক্ষকটা যেন বলে উঠছিল ঠিক ঠিক। এই নিস্তব্ধ রাত্রে পুকুরে জলের মধ্যে ঢেউ তুলে সেই কবে রিয়াজকে ভালোবাসতে গিয়ে মরে যাওয়া স্বর্ণলতা ভেসে উঠে বলেছিল “সাবধান ইন্দু… সাবধান..ওরা তোকে বাঁচতে দেবে না…।” প্রচণ্ড ভয়ে সেই আঁধার রাতে ছুটেছিল ইন্দুবালা। প্রথম ভালোবাসার আবিষ্কার যেন তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল গোটা পথ জুড়ে।
খিড়কির দরজা খুলে তার মনটা অবশ্য ভালো হয়ে গেল। ঠাম্মা উঠোন জুড়ে বসে নারকেল কুরছে। আর একদিকে দুধ জ্বাল দিচ্ছে কাঠের উনুনে। “কী করবে ঠাম্মা?” ঠাম্মা হাসে “দ্যাখ না কী করব”। ইন্দুবালা নাছোড়। না আমাকে বলতেই হবে কী করছো তুমি”। ঠাম্মা বলে “ওই বারকোষটা তোল তো ইন্দু”। এগিয়ে যায় ইন্দুবালা। বারকোষ তোলে। তার নীচে সাজানো ছোটো ছোটো ছাঁচ। কোনোটা ময়ূর। কোনোটা পান পাতা। কোনোটা আলপনার নক্সা। ইন্দুবালার মুখটা যেন এই অন্ধকারে আরও আলো হয়ে ওঠে। “তুমি চন্দ্রপুলি গড়বে ঠাম্মা?” সরাসরি কোনো উত্তর দেয় না ইন্দুবালার ঠাম্মা। “মা দুগগাকে দেখেছিস তো দিদিভাই? কেমন এক চালার নীচে স্বামী সন্তানদের নিয়ে শান্তিতে আছে। ওই শান্তিটাই বড় জিনিস। ওটা না থাকলে জীবনে কিছুই থাকবে না”। ইন্দুবালা নড়ে চড়ে বসে। “অশান্তির কী হলো ঠাম্মা? আমি কি কিছু করেছি?” ঠাম্মা নারকেল বাটতে বাটতে বলে “না তুই কেন করবি দিদিভাই। মানুষ করে। মানুষ মানুষের নামে বদনাম রটায়। এতো রাতে সোমত্ত মেয়ে বাইরে থাকলে বাড়ির অমঙ্গল হয়। গাঁয়ের লোকে দু চার কথা বলে”। ইন্দুবালার চোখ ফেটে জল আসে। “আমি কিছু করিনি ঠাম্মা। মনিরুলকে চলে যেতে বলেছিলাম।”। মেয়ের সরলতা দেখে ঠাম্মা কী করবে বুঝতে পারে না। বাড়ির ভেতরে যাতে আওয়াজ না যায় তাই তক্ষুনি ইন্দুবালার হাতে ধরিয়ে দেয় হাতাখানা। “দুধটা আস্তে আস্তে ঘন হয়ে উঠছে দিদিভাই। যতক্ষণ না ক্ষীর হচ্ছে নাড়তে হবে। তলায় লেগে গেলেই মুশকিল। ধরা দুধের গন্ধ হলে চন্দ্রপুলি কেউ খাবে না যে”।
নারকেল কোরা হয়ে গেছে ইন্দুবালার। এই বয়সে দশটা নারকেল কোরা চাড্ডিখানি কথা নয়। ঘামছেন তিনি। এবার বাটতে হবে শিলে ফেলে পুরোটা। মিহি করে। যাতে একটু এবড়ো খেবড়ো কুচি না পড়ে মুখে। জিভে দেওয়ার সাথে সাথে যাতে গলে যায় চন্দ্রপুলি। দিনের বেলা হলে ধনঞ্জয় জোর করে মিক্সিতে বাটতে বলতো। কিন্তু ইন্দুবালা জানেন প্রাচীন এক শিলায় নারকেল বাটা আর যন্ত্রে বাটার মধ্যে অনেক তফাত থাকে। পাথরের ওই স্বাদটা কি তিনটে স্টেনলেস স্টিলের ব্লেড দিতে পারে? কখনোই না। ইন্দুবালা তাঁর শ্বশুরবাড়ির সেই কবেকার ভারি শিলখানা পাতেন। বাটতে বসেন। আর ওই দিকে তখন কবেকার যুগ এফাল ওফাল করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে বড় খোকা, ছোট খোকা তার কোলে আবার খুকি। “আমরাও খাবো মা”। ইন্দুবালা বলেন “আগে হোক। তারপর খেও। এখন ঘুমিয়ে পড়ে যাও”। কিন্তু কেউ যেতে চায় না। তিনজনেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে ইন্দুবালার দিকে। ইন্দুবালা বুঝতে পারেন এরা এখান থেকে কেউ নড়বে না। মায়ের জেদ আর ধৈর্য দুটোই তারা পেয়েছে যে। বড় ছেলেকে উনুনে দুধটা নাড়তে দিয়ে ছোটো ছেলেকে এলাচ ছাড়াতে বলেন। মেয়েটা কোলে ঢুললেও বারবার জেগে উঠছে। ছোটোর দিকে তাকিয়ে দাদ-দা বলছে। ও বাবা বলতে শেখেনি। কারণ বাবাকে ও দেখেনি। তাছাড়া এই বাড়িতে বাবা বলে কেউ কাউকে ডাকে না। তাই ওই শব্দটা আপাতত ওর জীবন থেকে উধাও। দুধ উথলে ওঠার মতো হলে বড় খোকা ফুঁ দেয়। ইন্দুবালা বকেন। “ওইভাবে মুখের হাওয়া দিতে আছে? ঠাকুর খাবে না?” ছোটো খোকা “এলাচ ছাড়াতে ছাড়াতে বলে, “তাহলে আমরা কখন খাবো মা?” মেয়েটা কোল থেকে “মা…মা..” বলে ডেকে ওঠে। ইন্দুবালা নারকেল বেটে চলেন। রাত বাড়তে থাকে। ঘন দুধ ক্ষীর হলে তার মধ্যে ওই নারকেল বাটা চিনি দিয়ে ভালো করে নাড়তে থাকেন। যতক্ষণ না মণ্ডটা শক্ত হয়। ছেলে দুটো ততক্ষণ বসে থাকে। রান্নাঘরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ঢোলে। মেয়েটা ঘুমের মধ্যে কাদা। ছোটো ছোটো ছাঁচে পুরগুলো পোরেন ইন্দুবালা। বড় কাঁসার থালায় ভর্তি হতে থাকে ময়ূর, নক্সাকাটা নৌকা, পাঁপড়ি মেলা ফুল, জলের মধ্যে হাঁস, পদ্মপাতার আলপনা আরও কত কত কী! ঘুম থেকে তুলে দেখান দুই ছেলেকে। মেয়েটার তো তখন অত বোঝার বয়েস হয়নি। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ছেলে দুটো। অবাক হয়ে। আর ইন্দুবালার ঠিক সেই মুহূর্তে কান্না পায়। ভীষণ কান্না। ফাঁকা রান্না ঘরে থালা ভরা চন্দ্রপুলি নিয়ে সত্তর পেরোনো ইন্দুবালা মুখে কাপড় খুঁজে হাহাকার করেন। পাছে ধনঞ্জয় শুনতে পায়। ছেলেদের ফোন করে ডাকে। ওরা যদি জেনে যায় ওদের মা সত্যি কত ভালোবাসে। ইন্দুবালা জানতে দিতে চান না তাঁর এই ভালোবাসা কাউকে। যাঁদেরই ভালোবাসতে গেছেন তারাই চলে গেছে পৃথিবী ছেড়ে। এটা যে অভিশাপ তাঁর জীবনে। উনি এই বয়সে সন্তান শোক পেতে চান না।
