আস্তে আস্তে বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল ইন্দুবালার। জীবনটা তো তারও অনেকদিন আগেই ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। ধনঞ্জয় শাপশাপান্ত করলো। “কেমন মা তুমি? ছেলে মেয়েদের দূর করে দিলে? মরার সময় জল পাবে না দেখে নিও”। ভর সন্ধেবেলায় ধনঞ্জয়ের কথাটা বুকে বড় বেজেছিল। কিন্তু ইন্দুবালা জানতেন তাঁর দুই কূলে কেউই মরার আগে জল পায়নি। তিনিও যে পাবেন সেই আশাও করেন না। ইন্দুবালা তাই প্রতি বছর মহালয়ায় পিতৃপক্ষে কালো তিলের সাথে গঙ্গাজল উৎসর্গ করেন। কলাপাতার ডোঙায়, কুশের আংটি পরে পিতামহ থেকে শুরু করে মাতামহ, শ্বশুর বাড়ির তিনকূলের কেউই বাদ পড়ে না। এমনকি মনিরুল, সেই কবেকার একাত্তরের যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া নিজের প্রথম প্রেমকে পর্যন্ত সারাদিন নির্জলা থেকে ইন্দুবালা জল দেন। প্রথম প্রথম লোকজনের খুব চোখ টাটিয়ে ছিল। “মেয়ে মানুষ আবার তর্পণ করবে কি গো?” আত্মীয় কুটুমরা যাঁরা তখনও সাপে নেউলের মতো পেছনে পড়েছিল, কথা শোনাতে ছাড়েনি। ইন্দুবালা কারোর কথা কিছু শোনেননি। একটা লম্বা নামের তালিকা তৈরী করে চারপাশের অসংখ্য পরিচিত অপরিচিত আত্মার মুখে কালো তিল আর গঙ্গা জল কুশের আংটি পড়ে ঢেলে গেছেন। “তোমরা যারা জল পাওনি জল খাও। ইন্দুবালাকে ক্ষমা করে দিও।” গড় হয়ে প্রণাম করে শেষে এই কথাগুলো বলতেন তিনি। কাজেই যাদের কাছে মহালয়া ছিল সকালে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের চণ্ডীপাঠ, “জাগো তুমি জাগো…” গানের ধুয়ো। ইন্দুবালার কাছে ছিল সেটা মৃত্যুর উৎসব। অতি প্রিয়জন থেকে শুরু করে অচেনা লোকদের আবাহন করা। এক বিস্মৃত স্মৃতির পথে নিরন্তর পরিক্রমণ। মনটা ঝুপ করে খারাপ হয়ে যায় ইন্দুবালার। ধনঞ্জয় সেটা বুঝতে পারে। বিরক্ত করে না তখন সে একটুও। নিজে নিজে উনুন ধরায়। সবজি কাটে। আটা মাখে। ইন্দুবালা নীচে নামেন অনেক দেরি করে। মহালয়ায় ইন্দুবালার হোটেলের মেনু সাদা তিলের বড়া, নারকেল ডাল, কুচো মাছের চচ্চড়ি আর চালতার চাটনি। মেসের ছেলে মেয়েগুলো হাপুস হুপুস করে খেয়ে আঙুল চাটতে চাটতে চলে যায়। চাঁদপানা মুখগুলো আবার কয়েকদিন দেখতে পাবেন না ইন্দুবালা। সবাই বাড়ি যাবে যে পুজোর ছুটিতে। যাওয়ার আগে কেউ প্রণাম করে। কেউ আবার বা আদর করে জড়িয়ে ধরে। কেউ চুমু খায়। কেউ আবার সেলফি তোলে। দিদাকে তারা নাকি খুব মিস করবে। “ভালো থেকো তুমি। আর পুজোয় একদম ভালো ভালো রান্না করো না। তাহলে ওই ধনাদাই সব খাবে”। কত কী সব কলবল করতে করতে বেরিয়ে যায় ওরা। আরও ফাঁকা হয়ে যায় ইন্দুবালার চারপাশ।
কিচ্ছুটি মুখে না দিয়ে ইন্দুবালা ওপরের ঘরে গিয়ে চুপটি করে বসেন। কাদের জন্য তার এত ফাঁকা ফাঁকা লাগে? সব্বাইকে নিয়ে থাকলে আজ এই নিশুতি রাতে বাড়ি গমগম করতো। কোনো ঝগড়া নেই, ঝাঁটি নেই, মনের কোনো মালিন্য নেই। তবুও ছেলে মেয়েগুলোকে এত দূরে সরিয়ে রেখে কি পেলেন তিনি? একা বাঁচার সুখ? কার ওপর অভিমান করে একা হয়ে গেলেন তিনি? বাবা? মনিরুল? মাস্টার রতনলাল মল্লিক? নাকি অদৃষ্ট? দম বন্ধ হয়ে আসে তাঁর। রাতগুলোতে দুচোখের পাতা এখন আর এক করতে পারেন না। ঘুম যেন তাঁর থেকে দূরে পালায়। সাত পাঁচ চিন্তা মাথার মধ্যে পাক খেতে থাকে কপোতাক্ষের ঘোলা জলের মতো। ঠিক এইরকম সময়ে ইন্দুবালার যেটা হয় তিনি আর চুপ করে বসে থাকতে পারেন না। কাজ করতে হয় তাঁকে। প্রচুর কাজ। মনে পড়ে যায় দশটা নারকেলের কথা। কিলোটাক ক্ষোয়া ক্ষীর। কেজি খানেক চিনি। ধনঞ্জয় মাঝরাতে শুনতে পায় রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে খড়খড় আওয়াজ। চোর ঢুকলো নাকি পুজোর আগে রান্নাঘরে। একটা বড় গামলা নিয়ে গেলেও তো অনেক। পা টিপে টিপে এগিয়ে দেখে দরজা হাট করে খোলা। রান্নাঘরের মেঝেতে সব কিছু সাজিয়ে নিয়ে নারকেল কুরছেন ইন্দুবালা। খিঁচিয়ে ওঠে ধনঞ্জয়। “নিজে তো শান্তি পাবেই না। আমাকেও শান্তি দেবে না তুমি?” ইন্দুবালা মুখ না তুলেই বলেন “তুই শুতে যা ধনঞ্জয়। আর যাওয়ার সময় রান্না ঘরের দোরটা দিয়ে যা”। ধনঞ্জয় যেতে চায় না। “কাল সকালে এইসব নিয়ে বসলে হতো না? এই এতো গুলো নারকেল এখন কুরবে? বাটবে?” ইন্দুবালা বলেন “আমার ঘুম আসছে না।” ধনঞ্জয় বিরক্ত হয়। “তা আসবে কেন? ঘুমের ওষুধ খেয়েছো?” ইন্দুবালা এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেন না। অনেকবার তাকে ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছে কিন্তু তিনি একবারের জন্যেও সে ওষুধ খাননি। তাঁর মনে হয় একবার খেলে আর যদি কোনোদিন ঘুম না ভাঙে? এই তো কয়েকদিন পরেই হয়তো ঘুমিয়ে পড়বেন চিরকালের জন্যে। তার আগে ওষুধ খেয়ে কী হবে? তার চেয়ে এই ভালো। সারা রাত ধরে কাজ করবেন। ধনঞ্জয়ের মেজাজ তিরিক্ষে হয়। “ওঠো তো এবার। যাও ঘরে যাও। ঘুম না আসে তো ছেলে মেয়েরা পুজোয় কত কী পাঠিয়েছে সেগুলো দেখো গিয়ে। প্যাকেট পর্যন্ত খোলার সময় হয়নি তোমার।” প্রত্যেক বছর ছেলের বউরা কত দামি দামি শাড়ি দেয়। সেগুলো পরা হয় না তেমন ইন্দুবালার। আলমারি ঠাসা হয়ে পড়ে থাকে। বড় নাতনি সুনয়নী আলমারি খুলে একবার অবাক হয়ে গিয়েছিল। এত এত কাপড় তার ঠাম্মি জমিয়ে রেখে দিয়েছে? ইন্দুবালা হেসে বলেছিলেন “একটা সময় ছিল দুটো কাপড়ে সারা বছর চালিয়েছি। এখন ওগুলো দেখেও সুখ। কোথাও কি যাই যে পরবো?” সুনয়নী তাঁকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল কোথাও না সিনেমা দেখতে। “যাবে ঠাম্মি? একবার চলো না। কী বিশাল বড় মল। তার মধ্যে সিনেমা হল। চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে তোমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবো দোতলায়। মোটা গদিওয়ালা সিটে হেলান দিয়ে বসবে।” ইন্দুবালা যাননি। লছমীও তাকে বলেছিল সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবে সেবার। টিকিট কেটে এনেছিল। কিন্তু কলকাতা তখন জ্বলছে। সিনেমার হলের সামনে থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল তিনটে বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে। বোম পড়েছিল। কারা যেন বাসে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। একটা বড় মিছিলের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছিল। কোন রকমে বাড়ি পৌঁছাতে পেরেছিলেন ওরা। তারও অনেক পরে অলোকরা ভাত খেতে এলে বুঝেছিলেন কলকাতার পরিস্থিতি। না হলে এই ছেনু মিত্তির লেনে দিন দুনিয়ার খবর তিনি পাবেন কী করে? ধনঞ্জয় আবার ঘ্যানঘ্যান করে। “ঘুম না এলে সেলাই-ফোঁড়াই করো। সেটাও ভালো না লাগলে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকো। আমি গরম জল করে হট ব্যাগে ঢেলে দিচ্ছি। পিঠে নিয়ে শোও আরাম পাবে”। ইন্দুবালা খুব শান্তভাবে তাকান ধনঞ্জয়ের দিকে। এই সময়ে তাঁর একটুও ঝগড়া করতে ইচ্ছে করে না। “আমি কী করবো না করবো সব তুই বলে দিবি নাকি ধনা?” ইন্দুবালার এই চাহনি ধনঞ্জয় চেনে। মনে যা ভেবেছে তাই করবে। সে দাঁড়ায় না। রান্নাঘরের দোর এঁটে চলে যায়। নারকেল কুরতে কুরতে কোথা থেকে ইন্দুবালা যেন বাতাসে পান শিউলি ফুলের গন্ধ। চোখ বন্ধ করলে হরি বোষ্টমীর গান ভেসে আসে। “যাও গিরিরাজ আনিতে গৌরী… উমা আমার কত কেঁদেছে”। ঠাম্মার হাতে সিধে। মায়ের চোখ জলে ভরো ভরো। কপোতাক্ষের ধার ধরে কাশ ফুলের মাঠ পেরিয়ে আসছে ঢাকির দল। বাবা এনেছে নতুন শাড়ি ইন্দুর জন্য। লাল পাড়ের ওপর ডুরে কাটা। কখন সেটা পরবে ভেবেই আর ঘুম আসছে না তার। ওদিকে চণ্ডীমণ্ডপে অধিবাসের ঘট বসে গেছে। মহালয়াতে পুজোও হয়েছে কাঁসর ঘন্টা পিটিয়ে। তিনটে গ্রাম পেরিয়ে ঠাকুর গড়তে আসা কুমুদ পালের তখনও চোখ আঁকা হয়নি মা দুর্গার। তাঁর ছানাপোনাদের। অনেকের সাথে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ইন্দুবালাও চণ্ডীমণ্ডপে থামের সামনে। টিমটিম করে জ্বলছে কুপি। কুমুদ পাল তোরজোড় করছে কাজ শুরু করার। ঠিক সেই সময়ে কেউ একজন খোঁচা মারে ইন্দুবালাকে। সে বিরক্ত হয়। পেছন ফিরে দেখে অতসী। স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। তারই দিকে তাকিয়ে। “মুখে বল না অতসী ওমন খোঁচাচ্ছিস কেন?” অতসী ফিসফিস করে বলে, “বাড়ি চল। মেয়েদের ন্যাংটা হঠাকুর দেখতে নেই। মা বলেছে”। ইন্দুবালা বলে “তোর মা বলেছে যখন তুই যা না। আমি এখন চোখ আঁকা দেখবো। তারপর দুগগার শাড়ি পরাও”। অতসী মুখ বাঁকায়। “এইজন্যে সবাই তোকে ঢুলুনি বলে। ব্যাটাছেলেদের গায়ে পড়া। ওই দ্যাখ কে এসেছে। ডাকছে তোকে”। ইন্দুবালা ফিরে তাকায়। দূরে অন্ধকারে বড় জাম গাছটার নীচে টিপ টিপ জোনাকির আলোর মধ্যেই সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মনিরুল। যদিও মনিরুল তাকে ডাকছে না একটুও। অনেক দূর থেকে সে দেখছে ঠাকুরের রঙ করা। তার সমবয়সী অনেক মুসলমান ছেলে এইসব দেখা হারাম বলে এই পথ মাড়ায় না বড় একটা। কিন্তু মনিরুলের কেমন যেন অদ্ভুত ভালো লাগে। ওই টানা টানা চোখ দুটোতে লাল কালির কাজল পরানো। কোন মায়া যেন তাকে ডাকে। ঠিক তার ইন্দুবালার চোখ দুটোর কথা মনে পড়ে যায় তখন। ভাবতে অবাক লাগে তার একটা মাটির তাল কীভাবে হয়ে ওঠে ঠিক রক্ত মাংসের মানুষের মতো। তার মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায়। ঘরের মেয়ে বলে পুজো করা হয় তাকে। হনহন করে এগিয়ে আসে ইন্দুবালা মনিরুলের দিকে। এত রাতের আঁধারে ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার রাগটা যেন চড়াং করে মাথায় ওঠে। “এখানে কী করছিস তুই?” মনিরুল যে তৈরী ছিল না এই অতর্কিত আক্রমণের জন্য। সে ভেবেছিল তাকে যদি দেখতে পায় ইন্দুবালা, তাহলে হয়তো ভালো লাগবে তার। কিন্তু যেভাবে ইন্দুবালা ঝাঁপিয়ে এসে পড়লো তার সামনে ব্যাপারটা একটুও সুবিধের বলে মনে হলো না মনিরুলের। এমনিতেই হিন্দু পাড়ায় পুজোর সময়ে চণ্ডীমণ্ডপের সামনে ঘোরাঘুরি অনেকেই পছন্দ করে না। এমনকি তার ধর্মের মাতব্বর লোকজনও না। কাজেই বেশ ঝুঁকি নিয়েই আসে মনিরুল। তার ওপরে আবার ইন্দুবালার রাগ। আমতা আমতা করে বলে, “ঠাকুরের রঙ করা দেখছিলাম ইন্দু।” ইন্দুবালা আরও রেগে যায়। “তোর আবার ঠাকুরের রঙ করা দেখার কী আছে? আমি যা করবো তোকেও তাই করতে হবে মনিরুল?” রাগলে মেয়েটার নাকটা ফুলে ওঠে। মনিরুলের সেটা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু এখন একটুও তাকাতে পারছে না সে ইন্দুবালার মুখের দিকে। সবে গোঁফ ওঠা ছেলেটা মাথা নীচু করেই বলছে “তোর খারাপ লাগবে জানলে আসতাম না”। ইন্দুবালা আরও ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে “আসবি না”। চলে যাচ্ছে মনিরুল আস্তে আস্তে সাইকেল নিয়ে হেঁটে হেঁটে। ইন্দুবালাও ফিরে যাচ্ছে চণ্ডীমণ্ডপে। কিন্তু সে দেখতে তো পাচ্ছে না মনিরুলের চোখে তখন শরতের জলে ভরা মেঘ। দু চোখ ছাপিয়ে গাল বেয়ে নামছে জলের ধারা। সবে ওঠা দাড়িগুলো ভিজে যাচ্ছে ভালোবাসার অভিমানে। জোনাকিগুলো ফিসফিস করে বলছে “ভালোবাসিস নাকি মনিরুল তুই ইন্দুকে…?”
