ছেলেদের হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন ঘরের কাজ। রান্না-বান্না। কাপড় কাঁচা। বাসন মাজা। বড়টা অতটা গুছিয়ে করে উঠতে না পারলেও ছোটোটি শিখেছিল খুব মন দিয়ে। তার ওইসব বেশ ভালো লাগতো। বড়টা আগলে রাখতে শিখেছিল ভাই বোনকে। কখনও কখনও মাকেও। কাজ না পারা নিয়ে বড় খোকা কম মার খেয়েছে ইন্দুবালার কাছে? ধনঞ্জয়ের আবার এইসব কিছু সহ্য হতো না। “ওইটুকু ছোটো ছোটো হাতে ছাই ঘাঁটবে মা?” ইন্দুবালার জবাব ছিল, “না হলে পদ্ম হবে কী করে?” ইন্দুবালা ছেলে মেয়েদের সামনে যে কঠোর কঠিন অনুশাসন রেখেছিলেন আমাদের বাঙালি ঘরে সেটা বড় একটা দেখা যায় না। কেন এমন কঠোর হয়েছিলেন ইন্দুবালা? তাঁকে তো এমন অনুশাসনের মধ্যে বড় হতে হয়নি। একটা নয় একাধিক কারণ এর পেছনে ছিল। তিনটে নদী পেরিয়ে যেদিন তিনি কলকাতায় এসে এই মল্লিক বাড়িতে ঢুকেছিলেন সেদিন থেকেই বুঝেছিলেন তার ভাগ্য কলাপোতায় যেমন টিমটিম করে জ্বলছিল এখানে এসে বুঝি তা নিভলো। কলকাতার বাবুরা বিকেলে গলায় পাউডার মেখে তাস পেটায়। রাতে বউ পেটায়। ভোরে সোহাগ করে। আর গোটা দিন পাশ বালিশ বুকে জড়িয়ে ঘুমোয়। কিংবা চিৎপুরে কোনো মনের মানুষের বাড়িতে মাছের তেল চচ্চড়ি খেয়ে গা-হাত-পা মালিশ করায়। ইন্দুবালার এই বাড়িতে নানা রকমের প্রতিবন্ধকতা ছিল। জীবনের নানা চড়াই উতরাই বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে ইন্দুবালাকে করে দিয়েছিল ক্ষতবিক্ষত। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যদি কোনোদিন কোনো সন্তান আসে তাঁর জীবনে তাহলে এই বাড়ির কোন পূর্ব পুরুষের ছায়া তিনি তাদের ওপর পড়তে দেবেন না। বড় ছেলে যখন পেটে শাশুড়ি তখন সবে তাঁর চলৎশক্তি হারাতে বসেছেন। তাও তাঁর খানদানি মেজাজে তখনও বয়সের জং পড়েনি। নাতির মুখ যে বুড়ি দেখতে পাবেন সেই আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি। কাজেই বাড়িতে পিতৃপুরুষের মুখে জল দেওয়ার লোক এসেছে শুনে তিনি আহ্লাদিত হয়েছিলেন। কিন্তু নাতিকে তেল মাখানো ছাড়া বড় বেশি সোহাগ করার সময় পাননি। ছোটো ছেলে যখন হলো শাশুড়ি বিছানা নিলেন। আর মেয়েকে দেখে যাওয়ার অবকাশ তাঁর হয়নি। যে বাড়িতে মা ষষ্ঠী বিরূপ বলে দোজবরে ছেলের আবার বিয়ে দিয়েছিলেন সেই বাড়ির উঠোন জোড়া বাচ্চাদের কলকাকলি শুনে যাওয়ার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। কিন্তু মনে মনে এক পরম শান্তির গিঁট দিয়েছিলেন তিনি। এক গুষ্টি ঘটির মাঝে এক বাঙাল মেয়ে নিয়ে আসার দূরদর্শিতার বাহবা দিতে দিতে বুড়ি চোখ বুজেছিলেন। মাস্টার রতনলাল মল্লিক পরলোকে গিয়েছিলেন তারও কিছুদিন পরে। ইন্দুবালা নিজে হাতে মুখাগ্নি থেকে শুরু করে শ্রাদ্ধ শান্তি তো করে ছিলেনই এমনকি এখনও পর্যন্ত প্রত্যেক মহালয়ায় বাড়িতে পুরোহিত ডেকে বাপের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ির স্বর্গীয় আত্মীয়স্বজনদের জলের ব্যবস্থা করেন। নিজে দিতে পারেন না বলে পুরোহিতকে দিয়ে দেওয়ান। ছেলেমেয়েদের সেই দিকে ঘেঁষতে দেন না একটুও। বড় হলেও না। এই নিয়ে তাদের অনেক প্রশ্ন ছিল। সব জবাব থেমে যেত ইন্দুবালা যখন বলতেন “আগে মরি তারপর নিজেরাই সব সামলিও”। প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ছেলেরা মল্লিক বাড়ির শেকড়ের উৎস সন্ধানে নিজেরা যখন আগ বাড়িয়ে গেছে আশেপাশের আত্মীয়স্বজনের সাথে মিশতে তখন হোঁচট খেয়েছে বারে বারে। তারা বুঝতে পেরেছে মা কেন তাদের বাড়ির চারপাশের জমাট অন্ধকার থেকে এইভাবে দূরে রেখেছে। কেন তাদের কাছে স্বপ্নের মতো হয়ে উঠেছে। খুলনার কোন এক অখ্যাত অজ গাঁ কলাপোতা। বাবার থেকে তারা না-দেখা মামার বাড়ির গ্রামটাকে যেন বেশি করে চেনে। মাস্টার রতনলাল মল্লিক তাদের কাছে বাবা হিসেবে কাগজে কলমে পরিচয় ছাড়া আর কিছুই কোনো দিন ছিলেন না। মাঝে মাঝে ঝোড়ো হাওয়ার মতো শ্বশুরবাড়ির কোনো দূর সম্পর্কের বদ আত্মীয় এসে সম্পত্তি বাগাতে চেষ্টা করেছে। ছেলেদের উস্কিয়ে দিয়েছে। লোভ দেখিয়েছে। ইন্দুবালা নিজে সেই সব ফাটল মেরামতি করেছেন। এখানে এইগুলো হয়তো বিস্তারে বলা যেতে পারতো তাহলে আর পাঁচটা ঘরের কূটকচালির মতো শোনাতো ব্যাপারটা। লাউয়ের খোসা পোস্ত দিয়ে ভাজার স্বাদটা আর থাকতো না। গরম ভাতও হয়ে যেত জুরোনো। ছোটো থেকে বাচ্চারা এই ছেনু মিত্তির লেন ছেড়ে বেরোয়নি খুব একটা। বাবা বাছা করে আদর করেনি তাদের কেউ। মামার বাড়ি থেকে আসেনি তাদের জন্য কোনোদিন পুজোর জামা। কিংবা বাবার দিকের কোনো কুটুম পয়লা বৈশাখে পাঠায়নি মিষ্টির হাঁড়ি। অথচ তারা জানতো খুলনা বলে একটা জায়গা আছে। কলাপোতা বলে একটা গ্রাম। সেই গ্রামে একটা বড় উঠোনওয়ালা বাড়ি আছে। সেই বাড়িতে একটা তুলসী মঞ্চ আছে। কপোতাক্ষ নদের পাড়ে আছে মায়ের স্কুল। একটা নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুকে নিয়ে বাংলা ভাষার জন্য তাদের মামা, দিদা সবাই শহীদ হয়েছে। তাদের মা আসলে শহীদ পরিবারের মেয়ে।
আদর আহ্লাদে ইন্দুবালা বড় করেননি ছেলে মেয়েদের ঠিকই তাই বলে ভাব ভালোবাসা ছিল না বললে কথকের পাপ বাড়বে। ইন্দুবালার ভালোবাসা সেই ছোট্ট থেকে ছেলে মেয়েরা বুঝে গিয়েছিল অন্যরকম ভাবে। তাদের জন্য বড় বড় বয়ামে, কাঁচের শিশিতে, অ্যালুমিনিয়ামের কৌটোয় ইন্দুবালা যত্ন করে কত কিছু যে খাবার করে রাখতেন। কোনটাতে নাড়ু, কোনটাতে মুড়ির মোয়া, চিড়ে ভাজা, কুচো নিমকি, গজা। আরও কত কী যে! আজ তা নিজেও মনে করতে পারেন না। বড় ছেলে যেবার বি এ পরীক্ষা দিল সেবার নিজে গিয়ে কালীঘাটের মায়ের কাছে পুজো দিয়ে এসেছিলেন। বলে এসেছিলেন কোনোদিন নিজের জন্য তিনি কিছু চাননি কিন্তু ওকে দাঁড়াবার জায়গাটুকু করে দিও মা। ছেলে ভালোভাবে পাশ করেছিল। ইন্দুবালা জানতেন একটাকে দাঁড় করাতে পারলে বাকিগুলোও ঝপঝপ করে দাঁড়িয়ে পড়বে। বাস্তবে তাই হয়েছিল। বড় ছেলে প্রথম চাকরির মাইনে সবটাই মাকে মানি অর্ডারে পাঠিয়ে ছিল দিল্লি থেকে। ইন্দুবালা খুশি হয়েছিলেন মনে মনে। কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করেননি। টাকা তো তিনি নেননি। বরং কয়েক মাসের মধ্যে ছেলের বিয়ে দিয়ে আলাদা করে দিয়েছিলেন। বাকি দুটো কথা শোনাতে এলে ইন্দুবালা তাদের মুখের ওপর সোজাসাপটা বলে দিয়েছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে এবার নিজেদের পথ দেখতে হবে। তাঁর চারপাশে থেকে ভিড় বাড়ানো বরদাস্ত করবেন না তিনি। বড় রুক্ষ মনে হয়েছিল সেদিন কি ইন্দুবালাকে? তা তো হয়েছিলই। কিন্তু তিনি জানতেন প্রথম থেকে দূরে না সরালে আর কোনোদিনই যে ওরা নিজেদের গুছিয়ে উঠতে পারবে না। নিজের সংসার হবে না। মাথা গোঁজার জায়গাও।
