বউয়ের কথা মতো সুদীপ ফোন করে মায়ের সাথে কথা বলিয়েছিল খুকির। ভেবেছিল খুকি ঠিক রাজি করিয়ে নিতে পারবে মাকে। উলটে মা-ই কাঁদিয়ে ছাড়লো খুকিকে। কেমন যেন মেনে নিতে পারে না সুদীপ। দুই ভাইয়ের বোন অন্ত প্রাণ যে! “সব কিছুর একটা লিমিট আছে মা। খুকিকে এইভাবে না বললেও পারতে।” ভারী ফ্রেমের চশমায় ছোটো খোকাকে কেমন যেন মাস্টার রতনলাল মল্লিকের অল্প বয়সের মতো লাগে ইন্দুবালার। হাব ভাব, ঘাড় ঘুরিয়ে কথা বলা। ঠাকুরের কৃপায় শুধু স্বভাবটা বাবার মতো না। চলে যাচ্ছিল রেগে মেগে সুদীপ। ইন্দুবালা খেয়ে যেতে বললেন। থেকে যেতেই হলো সুদীপকে। মুখের ভাতকে অগ্রাহ্য করার মতো সাহস তার নেই। মাকে অসম্মান করা তো নয়ই। তাছাড়া অনেক দিন সে মায়ের হাতে মাছের টক খায়নি। ছোটো ছেলে এসেছে। বলে ইন্দুবালা সেদিন জম্পেশ করে বেঁধেছিলেন মুড়ি ঘন্ট। সুদীপ বড় ভালোবাসে যে। গরম মশলার হালকা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল সারা ঘরটা জুড়ে। আসন পেতে বাবু হয়ে বসে খেতে ভালো লাগে সুদীপের। যদিও বাত ধরতে শুরু করেছে তারও। রান্না ঘরের মেঝেতে থালার পাশে যখন বাটিগুলো সাজিয়ে দিলেন ইন্দুবালা, চোখে জল এল ছোটো খোকার। খেতে খেতে বিষম খেলে বার দুয়েক ষাট ষাট বললো তার মা। মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বারবার মনে মনে সুদীপ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলো তার মা যেন এইভাবেই রয়ে যায় চিরটা কাল। ভর দুপুরে এক পেট খেয়ে, ইন্দুবালার দোতলার ঘরে খাটের ওপর টানটান হয়ে ঘুমিয়ে সন্ধ্যের সময় যখন বাড়ি যাবে বলে নীচে নামলো সুদীপ, তখন সত্যি তার আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছিল না। ওই সন্ধ্যেতেই ইন্দুবালার উনুনে নতুন আঁচের কয়লা পড়েছিল। তার সত্তর পেরেনো মা কতকগুলো নাতির বয়সী ছেলে মেয়ের আবদার মেটাচ্ছিল। আর সুদীপের সেই মুহূর্তে খুব হিংসে হচ্ছিল ছেলে মেয়েগুলোকে। সেও যদি তার মায়ের চারপাশে এইভাবে ঘুরে বেড়াতে পারতো। তার স্ত্রী নন্দিতা ঠিকই বলে “তোমাদের থেকেও মা ভালোবাসেন ওই হোটেলটাকে। ওর থেকে মাকে আলাদা করার কথা স্বপ্নেও ভেবো না। তাহলে আর বেশি দিন রাখতে পারবে না মাকে।” ইন্দুবালা ছোটো খোকার হাতে ধরিয়ে দেন খাবারগুলো। ছোটো বউমা, নাতি নাতনিরা খাবে। রাতে ফোন করে বোনকে সুদীপ বোঝাতে পেরেছিল “মা যেমন আছে থাকতে দে। পারলে তোরা বিদেশ যাওয়ার আগে একবার দেখা করে যাস। সেটাই ভালো হবে”।
অনেক রাতে শুতে এসে ইন্দুবালা ভেবেছিলেন ছোটো খোকাকে বললে সে কি থেকে যেতো আজকে? কতদিন তো দুই ছেলে, মেয়েকে পাশে নিয়ে ঘুমোননি তিনি। তালপাতার পাখা নেড়ে নেড়ে বাতাস করেননি। বড় খোকাকে তো ডেকে নেওয়া যেত ফোন করেই। দুই ছেলেকে পাশে নিয়ে ইন্দুবালা শুয়ে আছেন। নিজের ভাবনাতেই কেমন যেন খটকা লাগে তার। যা তিনি সন্তানদের ছোট্ট বেলাতেই করেননি আজ কেন সেগুলো করতে চাইছেন? তাহলে এই কি তাঁর সত্যিকারের শেষের সময়? ছ্যাঁৎ করে ওঠে গা টা। তিনি না থাকলে এই বাড়িটার কী হবে? কী এক বিষণ্ণতা যেন ঘিরে ধরে ইন্দুবালাকে। এমন পাথর কেন হয়ে গেলেন তিনি? এই বাড়িটায় থাকতে থাকতেই এমনটা হলো কি? আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে গেলেন এই বাড়িটার সাথেই? কোথাও কোনোদিন তাঁর যাওয়া হল না। সেটা কি নিজের ইচ্ছেতেই? নাকি সত্যি তাঁর যাওয়ার জায়গা ছিল না। চিলেকোঠার ছাদ থেকে বাড়ির পেছনের বাগান। হোটেলের রান্নাঘর। খাবার ঘর। রাস্তার ওপারে কাশী মুদির দোকান। বড়জোর রেল লাইনের ধারে সকালের বাজার। এইটুকু ভৌগোলিক আলোছায়ার মধ্যে ইন্দুবালা নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিলেন। কেন রেখেছিলেন? তাহলে বাইরে যেতে ভয় করতো কি তাঁর? ধুর কী সব ভাবছেন। ফুরসত পেতেন না অন্য কোথাও যাওয়ার। প্রাপ্তবয়েস না হওয়া পর্যন্ত ছেলে-মেয়েদেরও কোথাও যেতে দেননি তিনি। আগলে রেখে ছিলেন কঠিন কঠোর শাসনে। কারণ তিনি জানতেন এই মল্লিক বাড়ির রক্ত খারাপ। একটু আলগা দিয়েছো কি সবাই মাস্টার রতনলাল মল্লিক তৈরী হবে। ইন্দুবালা তাই তাঁদের কবেকার খুলনার বাড়িতে বসা দাদুর টোলটাকে ওপরের ঘরে গড়ে তুলেছিলেন নিজের মতো করে। ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলোকে নিয়ে এক পুব বাংলার বিধবা যখন হোটেল চালাচ্ছে তখন তাঁর বাড়ি থেকে ভেসে আসছে কচি গলায় পড়ার আওয়াজ। “ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দেয় বেগুনী রঙের শাড়ি…চেয়ে চেয়ে চুপ করে রই…তেপান্তরের পার বুঝি ওই…”। বড় খোকা হেরিকেনের আলোয় পড়ছে সহজ পাঠ। ছোটো খোকা স্লেটে লিখছে অ আ ক খ। আর পুঁচকে মেয়েটা কাঁথায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে অকাতরে। জাগলেই দাদারা কেউ না কেউ তাকে দুধ খাইয়ে দেবে। আর ইন্দুবালা তখন দুটো গনগনে উনুনের সামনে। কোনোটাতে ফুটছে সোনা মুগের ডাল। কোনোটাতে বা ভাত। এটা ছিল খুব চেনা একটা ছবি। ইন্দুবালার ভাতের হোটেলের অনেক দিনের খদ্দের যাঁরা তাঁদের কারও কারও মনে থাকার কথা। গরিবের একমাত্র হাতিয়ার লেখাপড়া। সেটা যদি তাঁর সন্তানরা করে উঠতে পারে তাহলে এই যে দিন রাতের পরিশ্রম করছেন ইন্দুবালা তা সার্থক হয়।
বোনকে বেশ খানিকটা বড় করে তুলেছিল দাদারাই। তাই মেয়ে মায়ের থেকেও দাদাদের ন্যাওটা বেশি। সেই ছোটো থেকেই। দাদারাও খুকি বলতে প্রাণ। তিনজনের বড় হয়ে ওঠাটা একে অন্যকে অবলম্বন করে। তার মাঝে খাড়া হয়ে বট গাছের মতো আছে যেন মা। ঝুরির সাথে বট গাছের যেমন সম্পর্ক ঠিক তেমনি ছিল ইন্দুবালার সাথে ছেলে মেয়েদের সম্পর্ক। মা আছে জানলে ওরা নিশ্চিন্ত হতো। আর ইন্দুবালা নিশ্চিন্ত হতেন ওদের সারাক্ষণ চোখের সামনে দেখে। খুব যে হুজ্জতি ওরা করতে তেমনটা নয়। সেই সময়ও ওরা পেত না। ছোটো থেকেই ওরা জেনে এসেছে ওদের মা বাবা একজনই। আর তিনি হলেন ইন্দুবালা। যার আবার একটা হোটেল আছে। সেই হোটেল না চললে ওদের ভাতও জুটবে না। কেমন করে যেন ফুস মন্তরের মতো কানে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন ইন্দুবালা। তাই ছোটো থেকেই ওদের চাহিদা ছিল খুব কম। মাঝে মাঝে নিজেই অবাক হয়ে যেতেন। ওরা যখন একটু একটু করে বড় হচ্ছিল ওদের দেখে নিজের ছোটোবেলার কথা মনে পড়তো তাঁর। নিজেও তো ভাইকে একদিকে দিদি আর একদিকে মায়ের মতো বড় করে তুলছিলেন। তবুও যেটুকু স্নেহ পরশ শীতের হিমের মতো তাঁদের গায়ে লেগে থাকতো এই বাচ্চাগুলোর কপালে তাও জোটেনি। সেই স্নেহ কোমলতা ইন্দুবালা নিজের শরীরের অন্তঃপুরে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কখনও কোনো দুর্বলতার মুহূর্তেও তিনি প্রকাশ করেননি। ইন্দুবালাকে কোনোদিন কাঁদতে দেখেনি তাঁর তিন ছেলে মেয়ের কেউই। শুধু তারা দেখেছে মায়ের অমানুষিক পরিশ্রম। নিয়মের একটু এদিক ওদিক হতে দেননি তিনি। ছোটো, বড় নানা অনুশাসনে মানুষ হয়েছে প্রদীপ, সুদীপ আর ইতু। পান থেকে চুন খসার জো ছিল না। মিথ্যে কথা বলা ছিল আরও অপরাধের। কোনো দিন অবশ্য তা বলতে হয়নি তাদের। চোখের দিকে তাকাতেই মা কেমন যেন বুঝে যেত মনের কথা সব। নিয়মিত ছেলেদের স্কুলে গিয়ে খোঁজ খবর নিতেন ইন্দুবালা। ঠিক মতো পড়ছে কিনা। বড় ছেলেও সামলাতে অনেকটা। কিন্তু সেও তো তখন অনেক ছোটো। শুধু স্কুলের ভরসাতেই বাচ্চাদের লেখাপড়া ছেড়ে দেননি ইন্দুবালা। বাড়িতে এক সময়ে তাঁকে পড়াতেন বাবা। তারও আগে দাদু। কিন্তু এখানে তাঁর বাচ্চাদের কে পড়াবে? ইন্দুবালার হাতে সময় নেই একটুও। তা সত্ত্বেও বর্ণপরিচয় নিজেই পড়িয়েছিলেন ছেলেদের। আর ছেলেরা পড়িয়েছিল বোনকে। স্কুলে ভর্তি করার অনেক আগেই বাড়িতে রেখেছিলেন পড়ানোর জন্য মাস্টার। খোঁজ নিয়েছিলেন ছেনু মিত্তির লেনে পুব দিকে যে স্কুলটা আছে সেটা নাকি কর্পোরেশানের স্কুল। ওখানে পড়তে টাকা পয়সা তো লাগেই না তার ওপরে আবার কোন এক সংস্থা থেকে দুপুর বেলা বাচ্চাদের ভাত খেতে দেয়। ওই স্কুলের এক অঙ্কের স্যার মাঝে মাঝেই ইন্দুবালার হোটেলে খেতে আসতেন। ইন্দুবালা তাঁর কাছ থেকে সব নিয়ম নীতি শুনে স্কুলে চলে গিয়েছিলেন নিজেই। দুই ছেলেকে সেই স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। প্রথম দিকে ধনা গিয়ে দিয়ে আসতো তাদের। কয়েকদিনের পরে নিজেরাই যেতে শিখলো।
