ইন্দুবালা ছোটো খোকার সামনে। তিনি জানেন এই ছেলে সহজে ছেড়ে দেওয়ার নয়। ইতুর বাড়ি যাওয়ার ফয়সালাটা সেরেই তারপর এখান থেকে উঠবে।
“কী চাস কি তুই?”
“পুজোয় খুকির কাছ থেকে ঘুরে এসো। ততদিন আমি হোটেল চালাবো”।
“তোর অফিস?”
“বন্ধ থাকে মা।”
“এর আগে কোনোদিন হোটেল চালিয়েছিস?”
“দেখেছি তো তোমাকে। তাছাড়া ধনাদা আছে। কিরে পারবো না?”
ধনা মাথা নাড়লে কড়া চোখে তাকান ইন্দুবালা।
“তুই পুজোতে এখানে পড়ে থাকবি…আর ছেলে মেয়ে বউ এরা কী করবে?”
“সেটা তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি সামলে নেবো।”
“আমাকে করুণা করছিস তাই না?”
“যাহ বাব্বা…করুণার ব্যাপার এলো কোথা থেকে?”
“আমার হোটেল নিয়ে তোমাদের কাউকে ভাবতে হবে না। যাও বেরিয়ে যাও এক্ষুনি বাড়ি থেকে।”
“যাবো না। তুমি কী করবে করে নাও।”
কেন খুকির বাড়ি ইন্দুবালা যাবেন না তাই নিয়ে অশান্তি চরমে উঠেছিল। সুদীপের বউ পর্যন্ত ছুটে এসেছিল। “কেন তোমরা মাকে জোর করছো? যেতে চাইছেন না যাবেন না। মিটে গেল। তুমি দাদাভাই দেখা করে এসো না ইতুর সাথে। আমি আর দিদিভাই না হয় দিল্লিতে গিয়ে ওদের সি অফ করবো।” ইন্দুবালার ছোটো ছেলের বউ খুব একটা এই বাড়িতে আসে না। পালা পার্বণে নমস্কার, খাওয়া দাওয়া ছাড়া বড় একটা ঘেঁষতে দেখেন না। কিন্তু খোঁজ রাখে ইন্দুবালার সে। দিনে অন্তত একবার ফোন করে। কী কী রান্না করলেন ইন্দুবালা, নতুন কিছু হল কিনা সব। তার সাথে কথা না হলেও ধনঞ্জয়ের সাথে তো হয়ই। বড় ছেলের মেয়ে সুনয়নী যখন বিদেশ থেকে অতদিন পরে এলো, সেই খবর প্রথমে পেয়েছিল এই ছোটো ছেলের বউ নন্দিতা। সেই সবাইকে জড়ো করে। বড় ছেলে, বউমারা রাগ মিটিয়ে আবার সুনয়নীকে টেনে নিয়েছিল নিজেদের মধ্যে। ছোটো খোকা যা রগচটা। এই বউ সামলে রেখেছে তাকে সব দিক থেকে। তাই মুখে কিছু না বললেও ছোটো বউকে সমীহ করেন ইন্দুবালা। আর সেও বেশ দূর থেকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা ভক্তি দেখায়। আর দেখাবেই বা না কেন। ইন্দুবালার সাথে তার যে আছে এক অন্তরের যোগ। সে অনেকদিন আগের কথা। নন্দিতা তখন কলেজের গণ্ডি সবে পেরিয়েছে। মল্লিক বাড়ির যে ছেলেটাকে সে ভালোবাসে তার সাথে বাড়িতে বিয়ে দিতে চাইছিল না মোটেই। মেয়ের সাথে বাবা-মায়ের মুখ দেখাদেখি যখন বন্ধ হবার যোগাড়, খবর কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে যখন বাড়ির সামনে ছেলের বাড়ির লোকজন এবং ছেলেরাও লাইন দিতে শুরু করেছে নন্দিতাকে দেখবে বলে। সেই রকমই একদিন সে সটান চলে এসেছিল এই ইন্দুবালা ভাতের হোটেলে। সুদীপ নামের যে ছেলেটাকে সে ভালোবাসে তার মায়ের সাথে কথা বলতে। সদর দরজা হাট করে ভোলা ছিল। ওটাই যে হোটেলে ঢোকার রাস্তা সে জানতো না। ঘরের মধ্যে ঢুকে খাবারের কাঠের পংক্তিগুলোর মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেলে ডান হাতে পড়ে রান্নাঘর। সেই ঘরে ঢুকে নন্দিতা দেখেছিল সন্ধ্যের আঁচে চিঁড়ের পায়েসের দুধ জাল দিচ্ছেন ইন্দুবালা। কয়লার আগুনের লাল আভা ছড়িয়ে আছে ভদ্রমহিলার সারা মুখ জুড়ে। এত শান্ত কেউ হতে পারে নন্দিতা ভাবতেও পারেনি। কারণ এমন মানুষের সংস্পর্শে সে এর আগে আসেনি। সব খুব একটা যে গুছিয়ে সেদিন বলতে পেরেছিল নন্দিতা তেমনটাও নয়। ইন্দুবালা এটুকু বুঝেছিলেন, তাঁর ছেলেকে ভালোবাসে এই মেয়েটি। বিয়ে করতে চায়। বাড়ির লোক দিতে চাইছে না বলে সোজা ছেলের মায়ের কাছে চলে এসেছে। তাও ছেলেকে না জানিয়ে অনেক আঁটঘাট বাঁধা বন্ধের চিন্তা না করেই। অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন নন্দিতার মুখের দিকে ইন্দুবালা। তাঁর কোনোদিন সাহস হয়নি বাড়িতে বলার যে, ভালোবাসেন মনিরুলকে। বিয়ে করতে চান। পালিয়ে বিয়ে করতে গিয়ে স্বর্ণলতাকে মরতে হয়েছিল পুকুরে ডুবে। মনিরুলকে ছেড়ে আসতে হয়েছিল কপোতাক্ষের তীরে। তাদের সবার প্রতিনিধি হয়েই কি মেয়েটা এই সন্ধ্যেবেলায় তাঁর কাছে এসেছে? চিড়ের পায়েসটা শেষ করে জানতে চেয়েছিলেন, তাকে ভালোবাসে তো তাঁর ছেলে? থাকতে পারবে তারা দুজনে সুখী হয়ে? মেয়েটা ঘাড় নেড়েছিল। আর ইন্দুবালা সেই সন্ধ্যের প্রথম আঁচে চিড়ের পায়েস নামিয়ে অল্প একটু অগ্নিকে উৎসর্গ করে বাটি ভরে এগিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর ছোটো বউয়ের দিকে। বলেছিলেন, “চিন্তা করো না। আমি বড় খোকাকে চিঠি লিখছি দিল্লিতে। সে এলে তাকে নিয়ে তোমাদের বাড়ি যাবো। কথা বলে আসবো তোমার বাবা মায়ের সাথে।” অবাক হয়েছিল মেয়েটি। এতো নির্বিবাদে কোনো প্রশ্ন না করে মেনে নিলেন সব কিছু ইন্দুবালা? কোনো প্রশ্ন করলেন না কোথায় থাকে নন্দিতা। কী জাত? বাবা মায়ের পরিচয়। আদৌ কিছু পড়ে কিনা। দু সপ্তাহ পরে ইন্দুবালা চলে গিয়েছিলেন বড় খোকা আর খুকিকে নিয়ে নন্দিতার বাড়ি। নন্দিতা অবাক হয়ে গিয়েছিল ওই একলা একটা ভাতের হোটেল চালানো মেয়েমানুষের কথা শুনে। যে মহিলাকে না দেখেই তার বাবা মা হতচ্ছেদা করেছে। সেই মহিলাই রাজি করিয়ে নিলেন বাড়ির লোককে। শুধু তাই নয় এক সপ্তাহের মধ্যে বাবা-মা বিয়ের পাকা কথা বলার জন্যে চলে এলেন ইন্দুবালা ভাতের হোটেলে। সেই থেকে নন্দিতা আরও অনেক কাছের হতে পারতো ইন্দুবালার। কিন্তু বিয়ের পরে কিছু দিন ছেনু মিত্তির লেনে থেকেই সে বুঝে গিয়েছিল এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছেন যাঁরা চিরকালের জন্য একা হয়ে যান। তখন তাঁরা সেই একাই একটা জগতের মধ্যে বাঁচতে ভালোবাসেন। ইন্দুবালার সেই নির্জন জগৎ হলো তাঁর ভাতের হোটেল। জোর করে তাই সেখানে প্রবেশ করতে চায়নি নন্দিতা। সুদীপকেও বুঝিয়েছিল তার মতো করে।
