হলেই বিপত্তি ঘটে। ধনঞ্জয় বার বার তখন জিজ্ঞেস করে, “হাঁ গো মা, তোমার শরীর ঠিক আছে তো? বড় খোকাকে ফোন করি? ডাক্তার ডাকুক।” এর উত্তরে ইন্দুবালা মুখ ঝামটা দিলে ধনঞ্জয় ভাবে, না বুড়ি ঠিক আছে। সুস্থ আছে। কোনো অসুবিধে কিছু নেই।
পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন খিটখিটে হয়ে যান। পইপই করে ধনঞ্জয় বলেছিল, “খুকি ডাকছে এত করে, ঘুরে এসো।”ইন্দুবালার একমাত্র মেয়ে ইতু থাকে ব্যাঙ্গালোরে। এ বছরেই তাদের সেখানকার পাট উঠবে। জামাই চলে যাবে ইউক্রেনে। মেয়ে তার ছেলেপুলে নিয়ে এসে উঠবে দিল্লির শ্বশুরবাড়িতে। তারপর সেখান থেকে সোজা স্বামীর কাছে। তাই ওরা বারবার বলেছিল একবার আসতে। বিশেষ করে জামাই সুকান্ত। “একবার আসুন মা। অনেকদিন আপনার সাথে দেখা হবে না।” আবদার করেছিল। ছোটো খোকা ধরিয়ে দিয়েছিল হাতের ফোনটা। সেখানেই তিনি ভিডিও কলে দেখতে পাচ্ছিলেন জামাইকে, খুকিকে, তাদের ছেলেপুলেদের। সবাই চাইছিল ইন্দুবালা যেন ওদের ওখানে যান। একটু থেকে আসেন ওদের সংসারে। খুকি কেঁদেছিল, “সেই কবে বিয়ে দিয়েছ একবার দেখতে পর্যন্ত আসেনি। এবার বাইরে চলে যাচ্ছি আবার কবে
দেখা হবে …” কথা শেষ করতে পারেনি খুকি। ইন্দুবালা খুব শান্তভাবে বলে দিয়েছিলেন, “এবার ছুটি দে না তোদের মাকে। আর ধরে রাখিস না। এই তো তুই, ছোটো খোকা, বড় খোকা সবাই কেমন মিলেমিশে আছিস। সেইভাবেই থাকবি। আমাকে ছেড়ে দে।” খুকি এরপরে একটুও কথা বলতে পারেনি। তার কান্না আরও বেড়েছিল। জানতো তার মা কোনদিন আসবেন না তার কাছে। দাদাদের কাছেই যায়নি। তার কাছে আসবে কেন? কিন্তু এবার যে চলে যাচ্ছে সে অনেক দূর। হুট করে মায়ের কিছু হলে আসতে তো তিন দিন চলে যাবে।
ফোন রেখে দেওয়ার পরে ছোটো খোকা সুদীপ বেশ কড়া করেই বকে দিয়েছিল ইন্দুবালাকে। একমাত্র তিন ছেলে মেয়ের মধ্যে সুদীপই একটু শাসন করে ইন্দুবালাকে। বিভিন্ন সময়ে নানা ঘটনা ঘটলে, মনোমালিন্য চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে দাদা, বোন যখন কেউ পারে না সামাল দিতে মাকে তখন সব শেষে আসে সুদীপ। ছোট খোকা এসে বেশি কিছু করে না। হোটেলের রান্না ঘরে একটা মোড়া নিয়ে চুপ করে বসে থাকে গ্যাঁট হয়ে। শুধু নজর রাখে ইন্দুবালাকে পুলিশ ইন্সপেক্টারের মতো। যদিও অনেক ছোটো থেকে সে তার দাদা বা বোনের চেয়ে এই ঘরে কাটিয়েছে অনেকটা সময়। রান্না করতে ভালোবাসে সুদীপ। মায়ের অনেক রান্না তার জানা। বাড়ির লোকজনও বেজায় খুশি হয় তার রান্না খেয়ে। অনেকে বলে ইন্দুবালার রান্নার হাত নাকি এই ছেলেই পেয়েছে। একটু বড় হওয়ার পরে সুদীপের খুব ইচ্ছে ছিল হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়ার। ইন্দুবালা সেসব হতে দেননি। কে যেন তাঁর মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ভালো করে পড়ে, সরকারি পরীক্ষায় বসে বাঁধা চাকরির কথা। হয়তো কালেক্টার অফিসের বাবুদের দেখে তাঁর মাথায় আসতে পারে। কাজেই সুদীপকে সরকারি পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল। চাকরি করতে হয়েছিল মায়ের কথা শুনেই। তিন ভাইবোন কেউই মায়ের অবাধ্য ছিল না। তারা একটু সময়ের জন্যেও মাকে কষ্ট দেয়নি। যা বলেছেন ইন্দুবালা তাই করেছে। এমনকি বিয়ে দিয়ে আলাদা করে দিলেও মুখে কিছু বলেনি। কিন্তু সুদীপ তাও মাঝে মাঝে এসে গায়ের ওপরে পড়ে থেকেছে। হম্বিতম্বি করেছে। আরও দুটো বেশি কাজের লোক রাখতে বলেছে। টেবিলগুলো সানমাইকা দিয়ে ঠিক করতে বলেছে। মিস্ত্রি নিয়ে এসে বসে থাকলেও ইন্দুবালা নিজের হোটেলে তাকে নাক গলাতে দেননি। তিনি জানেন ভালোবেসেই করছে সে। তবুও তাঁর রক্তরা যেন আর এই ছেনু মিত্তির লেনের মায়া জালে না জড়ায় আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। আর তত দুই ছেলে, মেয়ে সবাই খুঁজে বেড়িয়েছে তাদের চিলেকোঠা, আচারের বয়াম, নীচে রান্না ঘরে ঝুড়ি চাপা দেওয়া মাছের ডিমের বড়া। মায়ের কাঠের আলমারিতে থরে থরে সাজানো নাড়, নিমকি, কুচো গজা। এর থেকে তাদের যে নিস্তার নেই। সুদীপ মোড়াটা এগিয়ে আরও উনুনের ধারে নিয়ে এসেছিল। “দাও দেখি মৌরলা মাছগুলো ভাজি”। ইন্দুবালার প্রচণ্ড অস্বস্তি হয়। বাইরের কাপড়ে, স্নান না করে তুই রান্না ঘরে বসিস কী করে?” সুদীপ বলে “যাই তাহলে স্নান করে আসি। রান্না করতে দেবে তো?” ইন্দুবালা বলেন “কক্ষনও না। নিজের কাজ করোগে যাও।” রান্নার সময়ে কেউ যদি তাকে বিরক্ত করে মোটেই সহ্য হয় না তাঁর। সেটা সুদীপ জানে। আর জানে বলেই সে ইচ্ছে করেই আজ এইসব করছে। “টক করবে না ঝোল? আর একটু বড় সাইজের কেনা উচিত ছিল মা তোমার।” সকালে মাছগুলো দেখে ইন্দুবালার মনে হয়েছিল একবার। টকের জন্য আর সামান্য বড় হলে ভালো হতো। নিজের মনের কথাগুলো যেন পড়ে ফেলছে ছোটো ছেলে। লছমী বলতো “ওটাকেই তুই বেশি ভালোবাসিস মা।” ইন্দুবালা বলতেন, “ধুর ওইভাবে ভালোবাসা ভাগ হয় নাকি। একটাকে বেশি আরেকটাকে কম। বলতে পারিস আমি কাউকেই ভালোবাসি না।” লছমী চোখ বড় বড় করে বলেছিল “আচ্ছা? তাই তুই ওদের জন্য এতো কিছু করিস তাই না?” ইন্দুবালাও চুপ করে থাকার মানুষ ছিলেন না। জীবনটাকে যে দেখে ফেলেছেন অনেকটা, “কর্তব্য করি রে লছমী। এইটুকু যদি ওরা মনে রাখতে পারে, তাই অনেক।” মনে রেখেছিল সন্তানরা। ভোলেনি কেউই। ছোটোবেলায় সুদীপ যখন এসে দাঁড়াতো মায়ের সামনে। বায়না করতো একসাথে বাজার যাওয়ার। ইন্দুবালার মোটেই সেগুলো প্রশ্রয় দিতেন না। “যখন যা বলবো সেটাই করবে। বাড়তি কাজের তো দরকার নেই। সেই সময়টা পড়াশুনা করো”। ছেলেটা লুকিয়ে চুরিয়ে তবুও চলে যেত ধনঞ্জয়ের সাথে। বাজার করতো। ইন্দুবালা অবাক হয়ে যেতেন অত ছোট্ট ছেলের গুছিয়ে বাজার করা দেখে। পরীক্ষার পরে অন্যান্য বন্ধুরা যখন নানা খেলায় মেতে আছে; দাদা, বোন সবাই আঁকার ক্লাসে, তখন সুদীপ রান্না ঘরে। মায়ের সাথে পোস্ত বড়া করেছে। প্রচণ্ড রেগে গেলেও, চিৎকার চেঁচামেচি করলেও ছোটো খোকাকে নিরস্ত করতে পারেননি। মাছের টকে বড় না ছোটো মাছ সেই দিকে আলোচনা না এগিয়ে, উনুন থেকে কড়া নামিয়ে এসে বসলেন
