কুয়ো খনন করেছিল। ততদিনে অবশ্য তার ছেলে মেয়েতে সংসার ভরে উঠেছে। এই গ্রামে সেই প্রথম কুয়ো। যে কুয়োতে ইন্দুবালার ভাই একটা কচ্ছপ পুষেছিল। নাম রেখেছিল কুমড়ো। ওপর থেকে মুড়ি দিলে কুমড়ো ভেসে উঠতো। ছোট্ট হাঁ করে জলে ভেজা মুড়িগুলো গিলে গিলে খেতো। ঠাম্মার কূর্ম অবতারের গল্প হয়তো মনে ছিল তার। সবাই আজ একটু তাড়াতাড়ি স্নান সেরে আসে। বাবা, ইন্দু, ভাই। মাকেও খেতে বসে যেতে বলে ঠাম্মা। গরম ভাতের সাথে আজ যে শুধু চিংড়ির হলুদ গালা ঝোল সেই কবেকার গল্প হয়ে যাওয়া জ্যোৎস্নাময়ীর লোহার কড়ায়। লোহার কড়াই ইন্দুবালার হোটেলেও আছে। কিন্তু জ্যোৎস্নাময়ীর মায়ের কড়াইয়ের মতো নয়। তিনি যদি তার মায়ের সব বাসনগুলো নিয়ে আসতে পারেন তাহলে ইন্দুবালাই বা পারবেন না কেন? লছমী তার চোখ গোল্লা পাকিয়ে বলেছিল “হাঁ ঠিকই তো লিয়ে আসলি না কেন ওইগুলা?” ইন্দুবালা হাসেন। “তখন কী করে জানবো এই এত্ত বড় ভাতের হোটেল হবে আমার?” লছমী বলে “এক মাছওয়ালী বন্ধু হবে”। “তিন তিনটে ছেলে মেয়ে নিয়ে অকালে বিধবা হব? আর কখনও কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না। এমনকি বাপের বাড়িও না”। থম মেরে বসে থাকেন ইন্দুবালা। কিন্তু আজ লছমীও বা কোথায়? তাঁর চারপাশে কেউ কোত্থাও নেই। আর যখনই মনে হয় কেউ নেই, তখন যেন আর শরীর চলে না ইন্দুবালার। কিন্তু ইন্দুবালার একজন ওপরওয়ালা আছেন। তিনি বাতাসের সাথে ভেসে ভেসে বেড়ান। গরম তেলের ওপর কালো জিরের ফোড়ন পড়তেই চড়বড় করে ওঠেন। রান্নার নানা রকমের সুবাস পাঠিয়ে লোক জড়ো করেন। ইন্দুবালার তখন আর একা থাকা হয় না। কিংশুক হোস্টেল উজিয়ে ছেলে মেয়ের দলকে তো নিয়ে এসেছেই, চিংড়ি মাছের হলুদ গালা ঝোল খেতে সেই কতদূর থেকে ডাক্তার হোস্টেলের ছেলে-মেয়েগুলোও আজ এসেছে। তাদের মধ্যে কলমী শাক বিক্রি করা বউটাও আছে। কাসুন্দি দিয়ে কলমি শাক মাখার সময় ইন্দুবালা তার চোখে জল দেখেছেন। আহা ওরও পুকুরের শখ ছিল গো ঠিক ইন্দুবালার মতোই। ওর যেন একটা বড় পুকুর হয় এই মনস্কামনা করার সাথে সাথে মেঘ ডেকে উঠলো। মুষল ধারায় বৃষ্টি নামলো। রেডিওতে এক ছোকরা জকি দু কলি গান শুনিয়ে বললো অবশেষে বর্ষা নামলো শহরে। ইন্দুবালা বিকেলের উঠোনে ঠায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজলেন। মনে হলো তাঁর সাথে যেন ভিজছে গ্রামের ভিটেখানাও। ভিজছে পুঁইয়ের মাচা, ডালিম গাছ, গন্ধরাজ লেবু, কালনার আতা, নারকেল গাছে জড়িয়ে ওঠা চুইঝাল। এখনও সেখানে জল থৈ থৈ করে কিনা কে জানে! গামছা দিয়ে কেউ কি আর চিংড়ি মাছ ধরে? তার হলুদ ঝোল হয়? বৃষ্টির জলে যেন ডুব দিতে থাকেন ইন্দুবালা অনবরত। মনে মনে প্রার্থনা করেন এই ডুবের যেন শেষ না হয় ঠাকুর, কোনো দিন শেষ না হয়।
৭. চন্দ্রপুলি
৭. চন্দ্রপুলি
ধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। দশ কেজি মতো চিনি। আরও অনেক কিছু। ইন্দুবালা ফর্দ করে দিয়েছিলেন। সেগুলো দেখে দেখে সে নিয়ে এসেছে। কিন্তু না নিয়ে আসা জিনিসও আছে তার মধ্যে অনেক। যেমন ইন্দুবালা ফর্দে লেখেননি ছোটো এলাচের কথা। সেটা মুখে বলে দিয়েছিলেন। ভুলে গেছে ধনঞ্জয়। জোয়ানের কথা বলেছিলেন। একবার নয়, অন্তত বার তিনেক–সেটাও আনেনি। একটু দাঁড়িয়ে গেলে এগুলোও সব লিখে দিতে পারতেন ইন্দুবালা। কিন্তু সে সময়টাও ধনঞ্জয় দেয়নি। তাড়াতাড়ি বাজারে বেরিয়েছে সে। নেশায় টান পড়েছে যে তার। আগের রাত থেকে গুড়াকু ফুরিয়েছে। কাজেই তখন তার প্রাণ সংশয়ের অবস্থা। দিনে অন্তত বার আষ্টেক গুড়াকু দিয়ে দাঁত না মাজলে মেজাজ ভালো থাকে না ধনঞ্জয়ের। সকালে উঠে কৌটো কেঁখে যেটুকু পেয়েছে তাতেই কাজ চালিয়েছে। কিন্তু যত বেলা বেড়েছে তত মনে হয়েছে হাত পা যেন চলতে চাইছে না আর। মাথা ঝিমঝিম করছে। এইসব কাটাতে ধনঞ্জয় তাই বার দুয়েক জর্দা খেয়েছে। উলটো দিকে ভুবনের পানের দোকান থেকে কাঁচা সুপারি খেয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। গুড়াকুর নেশা বেড়েছে বই কমেনি। তাই কোনো মতে সে মায়ের কাছ থেকে ফর্দ নিয়ে দৌড় লাগিয়েছে বাজারের দিকে। এদিকে ইন্দুবালা যে সমানে বলে চলেছেন আরও কী কী আনতে হবে, কী কী লেখা হয়নি খাতায় সেগুলো কিছুই প্রায় কানে ঢোকেনি ধনঞ্জয়ের। যেন হাওয়ায় ভেসে বেরিয়েছে সে। ফল হয়েছে মারাত্মক। ভুলে যাওয়া জিনিসপত্রের তালিকা অনেক। তার মধ্যে আছে ছোটো এলাচ, লবঙ্গ, জোয়ান, গোল মরিচ, আরও কত কী! এদিকে বয়েস বেড়েছে ধনঞ্জয়ের। ইন্দুবালারও ধিকি ধিকি করে অনেক। দুজনের বাক যুদ্ধ শুরু হলে থামানোর কেউ নেই। রান্নার কোনো জিনিস কিনে আনতে ভুলে গেলেই ইন্দুবালা প্রচণ্ড রেগে যান।
তাঁর হাতের কাছে সব ঠিকঠাক মতো থাকা চাই। রান্নার সময় এটা নেই ওটা নেই তিনি একদম সহ্য করতে পারেন না। এই নিয়ে সকালে ধনঞ্জয়ের সাথে একপ্রস্থ কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোটোখাটো ঝগড়াও। সপাটে ইন্দুবালা বলে দিয়েছিলেন “মুখের ওপর কথা বলবি না ধনা”। এটা যে কতবার দিনে বলেন আর কতবার যে নিজেই ধনঞ্জয়কে ডেকে কথা বলেন তার ইয়ত্তা নেই। প্রত্যেকদিন নিজে খেতে বসার আগে এখনও পর্যন্ত ধনঞ্জয়কে খাওয়ান। হ্যাঁ, নিজে বসে থেকে। সবার খাওয়া হলে তারপর ইন্দুবালা ভাত নিয়ে বসেন। আজকাল খাবারেও রুচি নেই। ভালো লাগে না কিছুই। সব কিছু ফেলে রেখে একদলা আচার দিয়ে কোনোমতে ভাতগুলো খান। এইসব ধনঞ্জয় জানে না। জানলে আর রক্ষে থাকবে না। ইন্দুবালার ভালো-মন্দ সব কিছুর ওপর প্রচণ্ড নজর ধনঞ্জয়ের। একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই ছেলেদের ফোন করে মাথা খারাপ করে দেবে। তারাও ধনাদা বলতে প্রাণ। এতকাল একটা লোকের থাকা মানে বাড়ির সাথে, বংশের সাথে শিকড় গজিয়ে যাওয়া। নিজের সন্তানদের থেকেও বেশি বিশ্বাস আর ভরসা করেন ইন্দুবালা তাকে। তবুও কথা কাটাকাটি, ঝগড়া, কথা বন্ধ হয় দিনে বেশ কয়েকবার। না
